রাকিব হাসনাত

অরনির হঠাত্‍ ঘুম ভেঙ্গে যায় শেষ রাতের দিকে, মোবাইল টা খুজে নিয়ে স্ক্রীন এ সময় দেখল রাত তিনটে পঁচিশ, তড়িঘড়ি করে ফেবুতে লগইন করল সে। লগইন করেই কিছু একটা খুঁজতে লাগলো ইনবক্স আর নিজের টাইম লাইনে। তারপর দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে কি জানি ভাবতে লাগলো আনমনে।

তার আজ মনটা ভীষণ খারাপ, কিছুতেই আর ঘুম আসছেনা……
ঠিক কি করা উচিত্‍ কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা অরনি। মন খারাপ এর কারন আর কিছুই নয়, আজ তার জন্মদিন । সব বন্ধু -বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পরিচিতজন সবাই একের পর এক ফেবুতে, নিজের ফোন নাম্বার এ তাকে উইশ করেই যাচ্ছে। কিন্তু এইসবে তার তেমন কোন আগ্রহ নেই, কারন যে মানুষটার কাছে সে সবার আগে উইশ পাবে বলে আশা করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে। যে উইশ না করলে তার আজকের জন্মদিনের উদযাপনটা ই মাটি, সেই মানুষটির আর কোন খবর নাই।

অরনি আর অভিক এর সম্পর্কের পর অরনির এটাই প্রথম জন্মদিন, তাই তার আগ্রহটা একটু বেশিই। তাদের আট মাসের সম্পর্ক । এই আট মাসের সম্পর্কের মধ্যে অরনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়েছে অভিকের সাথে। তার জন্য ভালোবাসার কোন কিছুতেই কোন অপূর্ণতা রাখেনি অভিক। তার প্রতি সব চেয়ে বেশী টেককেয়ার নিত অভিক । তাই তাকে এতটা বেশী হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে অরনি। আর সেই ছেলেটিই কিনা আজ তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জন্মদিন ভুলে যেতে পারে দিব্যি.. তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা অরনি।

এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে সকাল হয়ে গেল বুঝতেই পারেনি সে । মনে মনে একবার ভাবে অভিক এর নাম্বার এ একটা ফোন করবে, আবার ভাবে না থাক, রাতেও একবার কিছুক্ষণ কথা হয়েছে ফোনে অভিক এর সাথে। কিন্তু তখনও সে খুব স্বাভাবিক, তার কাছে কিছুই প্রকাশ পায়নি আজকের এই বিশেষ দিনটির ব্যাপারে। অরনি ভাবছে হয়তো ক্যাম্পাসে গেলে সারপ্রাইজ করবে অভিক তাকে। বিশেষ বিশেষ মুহুর্তগুলো বেশিরভাগ সময়ই সে ভার্সিটি ক্যাম্পাসেই উদযাপন করে বন্ধুদের নিয়ে।

তাই সেই আশায় বুক বাঁধে অরনি। প্রস্তুতি নিতে লাগলো ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য। নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘন্টা আগেই বের হয়ে গেল আজ বাসা থেকে। যথারীতি ভার্সিটি তে গিয়ে পৌছাল অরনি। এখনো তেমন কেউ এসে পৌছায়নি ক্যাম্পাসে। অরনির মনটা কেমন জানি ছটপট করতে লাগলো। তার মধ্যে এক অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করছে প্রতিনিয়ত, এই বুঝি অভিক এসে গেল এবং তাকে অন্যরকম এক সারপ্রাইজ এ অভিভুত করল । এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে এদিক ওদিক পায়চারি করতে লাগলো অরনি।

এরই মধ্যে বন্ধুদের অনেকেই চলে এসেছে ক্যাম্পাসে। অনেকেই তাকে উইশ করতে লাগলো, একসময় সবাই এসে পৌছেছে এবং অরনির জন্মদিন কে ঘিরে তাকে নিয়ে সবাই অনেক আনন্দ খুঁনসুটিতে মেতে উঠল, অনেকেই ট্রিট চেয়ে অস্হির করে তুলছে বেচারিকে, আবার অনেকেই নানান কথা বলে অনেক মজা করছে তার সাথে। কিন্তু অরনির এইসবে কোন ধরনের আগ্রহ নাই, কারন একটাই… এখনো অভিক মানুষটার কোন খবর নাই। অরনি তাড়াতাড়ি অভিকের নাম্বারে ফোন করল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অভিকের ফোন সুইজ অফ!!

অরনির মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল, সে কি যে করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা। ক্লাশ শুরুর সময় হলে সবাই যার যার মত ক্লাসে চলে গেল। শত অনিচ্ছা স্বত্বেও অরনি তার নিজের ক্লাসে গিয়ে বসল। কিন্তু সে আজ কিছুতেই ক্লাসে মন বসাতে পারছেনা। তার শুধু বার বার অভিক এর কথাই মনে পড়ছে। তাদের রিলেশন এর আট মাসের মধ্যে আজ প্রথম অভিক তার সাথে এমন আচরন করছে, সে কিছুতেই মেলাতে পারছেনা আজ হঠাত্‍ অভিক কেন তার সাথে এমন করছে!

দুঃখে অপমানে তার এখন উচ্চস্বরে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। শত অনিচ্ছা স্বত্বেও অনেক কষ্টে অরনি নামমাত্র সবকটা ক্লাস শেষ করে বের হল। কিন্তু এই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তার কিছুতেই বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। তাই তার সবচেয়ে কাছের ফ্রেন্ড উর্মিলার সাথে অনেক্ষণ হাটল ক্যাম্পাসে, বসে গল্প করে সময় কাটাল কিছুক্ষণ, তখনো অভিক এর ফোন সুইস অফ, অবশেষে অনিচ্ছা স্বত্বেও বাসার দিকে পা বাড়াল অরনি, শহরের আবাসিকে একটা ফ্লাটে কাজিন এবং কিছু বন্ধুদের সাথে মেস করে থাকে অরনি।

বাসায় গিয়ে পৌছালে সবাই কেমন হাসি হাসি মুখ করে এক রহস্যজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে, তার এমনিতেই কিছু ভালো লাগছে না, তাই কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে গেল নিজের রুমে, রুমে ঢুকে তার পড়ার টেবিলে চোখ পড়তেই সে অবাক! একি কান্ড, তার পড়ার টেবিলে বেশ কিছু গোলাপ আর কয়েকটা রজনীগন্ধা, এর সাথে রঙ্গিন কাগজে মোড়ানো দুইটা গিফট এর বক্স সুন্দর করে সাজানো!!

অরনি প্রথমে দেখেই খুবই বিস্মিত হল, পরক্ষনেই তার ঘোর কাটল, এতক্ষণেই বুঝতে পারল তাকে দেখে রুমের অন্যরা সবাই এমন রহস্যদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল কেন, এবং বুঝতে পারল এইসব অভিক শয়তানটারই কাজ, অরনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে ফুল গুলো হাতে তোলে নিল এবং গিফট এর বক্স গুলো খুলে দেখতে লাগল, প্রথম বক্স এ দেখতে পেল তার পছন্দের অনেকগুলা রংবেরং এর চকোলেট। এবং দ্বিতীয় বক্স খুলেই সে আনন্দে আত্ম হারা হয়ে গেল, দেখল তার সবচেয়ে প্রিয় মডেল এর DSLR ক্যামেরাটি। তার সবচেয়ে আনন্দের বস্তুটি হাতে তোলে নিতেই, একটা ছোট্ট কাগজ নিচে পড়তে লক্ষ্য করল সে। অরনি সেটা তুলে নিতেই দেখল একটা চিরকুট, তাতে লিখা আছে… .

“শুভ জন্মদিন, অরনি! জানি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, সে জন্য আমি অনেক অনেক সরি!! কারো জন্য এটা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে সুখের এবং শ্রেষ্ঠ একটি জন্মদিন উদযাপন, এই বিশেষ দিনটিকে আমি আমার জীবনে গভীরভাবে স্মরণ করে রাখতে চেয়েছি এবং চেয়েছি তোমার কাছেও যেন স্মরনীয় হয়ে থাকে এই দিনটি। তাই আমার এই অদ্ভুত আয়োজন। অনেক অনেক বেশী শুভ কামনা তোমার জন্য, সুখের এমন শ্রান্ত ধারা বইয়ে যাক সারাটিজীবন ধরে তোমার হৃদয়ে.. . আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তোমার সেই প্রিয় জায়গাটিতে। চলে এসো সেখানে, যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়, এখানে আমার সাথে সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য, আজ এখানে অনেক আয়োজন শুধু তোমারি জন্য। তোমারই, “অভিক’।

সত্যি… অরনি চোখের জল ধরে রাখতে পারলনা আর। আনন্দে  আত্মহারা সে আজ…. এতটা সুখ সে সত্যি আশা করেনি। ভেবেছিল খুব সাধারণভাবে উদযাপন করবে আজ তার জন্মদিনটি অভিকের সাথে।
কিন্তু .. . ???

অরনি সবচেয়ে বেশী খুশি হয়েছে ক্যামেরাটি পেয়ে, কারণ ছবি তোলা যে তার সবচেয়ে প্রিয় সখ….!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •