আবুল ইরফান আজিজুল হক

সাওম এর আভিধানিক অর্থ কোন জিনিস পরিত্যাগ করা এবং তা থেকে বিরত থাকা। তাই কথোপকথন পরিহারকারী Ñ সাকিত বা চুপ করে থাকা ব্যক্তিকেও সায়েম বলা হয়। এমনি ভাবে যে ঘোড়া আহার পরিত্যাগ করে, তাকেও সায়েম বলা হয়। ইসলামী পরিভাষায়, শরীয়তের বিধি-বিধান পালন করা যার উপর জরুরী, এমন ব্যক্তির পক্ষে সুবহে সাদেকের উদয় হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে পানাহার, স্ত্রী সহবাস এবং সব অবান্তর কাজ থেকে বিরত থাকার নামই সাওম বা রোযা। তবে সুবহে সাদেক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে একাধারে এভাবে বিরত থাকলেই রোযা বলে গণ্য হবে। সূর্যাস্তের এক মিনিট আগেও যদি কেউ কোন কিছু খেয়ে ফেলে বা পান করে, কিংবা সহবাস করে, তবে রোযা হবেনা। অনুরূপ ভাবে সব কিছু থেকে পূর্ণ দিবস বিরত থাকার পরও যদি কেউ রোযার নিয়্যত না করে, তবে তাও রোযা হবেনা। রোযার রয়েছে অপরিসীম ফযীলত। সাওম বা রোযা ইসলামের চতুর্থ রুকন বা স্তম্ভ।

সাওম বা রোযা ফরয হওয়া এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুরা বাকারার ৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’লা বলেন, يا ايها الذين آمنوا كتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون – اياما معدودات – হে মু’মিনগণ, তোমাদের জন্য রোযার বিধান দেওয়া হল নির্দিষ্ট কতিপয় দিন, যেমন বিধান তোমাদের র্পর্ববর্তীদের তে দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পার। পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, يريد الله بكم اليسر ولايريد بكم العسر ولتكملوا العدة و لتكبروا الله على ما هداكم و لعلكم تشكرون- অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ, তা চান, যা তোমাদের জন্য কষ্টকর, তা তিনি চাননা। এজন্য যে, তোমরা সংখ্যা বা রোযার নির্দিষ্ট দিন পূর্ণ করবে এবং তোমাদের সৎ পথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা গাইবে এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।

এ আয়াতগুলো থেকে জানা যায় যে, রোযার তিনটি বড় উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত: তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা, দ্বিতীয়ত: আল্লাহর মাহাত্ম্যের প্রতি বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহ তা’লার শোকর আদায় করা। মূলত রোযার সকল হিকমত বা অন্তর্নিহিত রহস্য ও ফযীলত এ উদ্দেশ্যগুলোর চতুষ্পার্শ্বেই আবর্তিত।

স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের মধ্যে পাশবিক প্রবণতা ও প্রবৃত্তির তাড়না বিদ্যমান থাকে। পানাহার ও কাম প্রবৃত্তিতে মগ্ন থাকা মানুষের পাশবিক প্রবণতাকে শক্তিশালী করে। রোযায় এসব পরিহার করতে হয় বলে তার ফলে মানুষের পাশবিক প্রবণতা হ্রাস পায় এবং প্রবৃত্তির উত্তেজনা নিস্তেজ হয়ে যায়। এক মাস পানাহার ও সহবাস নিয়ন্ত্রন করার ফলে মনুষের আত্মিক পূত: পবিত্রতা এবং নফস ও প্রবৃত্তির বিশুদ্ধতা অর্জিত হয়। যদি কেউ রমযানের রোযাসমুহ কুরআন-হাদীসে বর্ণিত নিয়মানুসারে যথাযথ ভাবে পালন করে, তাহলে বাস্তবিকই আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জিত হবে। ছোট-বড়, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় পাপ থেকে বেঁচে থাকা তার জন্য সহজ হবে। আর এটাই হচ্ছে মানুষের মুত্তাকী হওয়ার পরিচয়। আল-কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী এটাই রোযার প্রধানতম উদ্দেশ্য।

কোন কোন লোক এমন আছেন, যারা দিনের বেলা কিছু পানাহার করেন না। এটা তাদের অভ্যাস। আরে রোযাতেও পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। তাই কোন ব্যক্তির পানাহার না করাটা অভ্যাসের কারণে, না ইসলামের অন্যতম রুকন রোযা পালনের জন্য, তা নিয়্যাত ছাড়া স্পষ্ট হয়না বলে অভ্যাস ও ইবাদতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে রোযা আদায় শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়্যাত অন্যতম শর্ত। নিয়্যাত ছাড়া রোযা শুদ্ধ হবেনা। আমি আজ বা আগামী দিন রোযা রাখব, একথা মনে মনে সংকল্প করলেই রোযা হয়ে যাবে। আরবী বা বংলায় রোযার নিয়্যাত মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। তবে মুখে উচ্চারণ করাটা উত্তম এবং সুন্নাত।

রোযা রাখার উদ্দেশ্যে কেউ সাহরী খেয়েছে। কিন্তু রোযা রাখার কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি, মনে মনেও বলেনি। এমতাবস্থায় তার সাহরী খাওয়াটা নিয়্যাত হিসেবে গন্য হবে এবং তার এ দিনের রোযা হয়ে যাবে।

কেউ যদি ক্ষুধা না থাকার কারণে কিংবা প্রয়োজন না হওয়ায় সারা দিন কিছু না খেয়ে থাকে, বা রোযা বিনষ্টকারী কোন আচরণ না করে থাকে, কিন্তু রোযা রাখার কোন ইচ্ছা বা সংকল্প তার ছিলনা; তবে তার এ না খেয়ে থাকাটা রোযা হবেনা।

প্রত্যেক দিন রোযার জন্য আলাদা আলাদা নিয়্যাত করতে হবে। রোযার নিয়্যাত করার সময় হল আগের দিন সুর্যাস্তের পর থেকে রোযার দিন দ্বিপ্রহরের একঘন্টা আগে পর্যন্ত ।

রাতে রোযা রাখার নিয়্যাত ছিলনা, তবে সকাল থেকে যেকোন কারণে কিছু খাওয়া হয়নি, এমন অবস্থায় দ্বিপ্রহরের এক ঘন্টা আগে নিয়্যাত করলে রোযা হয়ে যাবে।

রমযানে বিশেষ ভাবে ফরয রোযা বা রমযানের রোযা বলে নিয়্যাত না করলেও, কেউ রাতে যদি মনে মনে এ সংকল্প করে থাকে যে আমি আগামী কাল রোযা রাখব অথবা রাতে রোযার সংকল্প ছিলনা বরং সকালে মনে মনে স্থির করেছে যে, আমি আজ রোজা রাখব, তাতেই রমযানের রোযা আদায় হয়ে যাবে।

সুবহে সাদেক থেকেই রোযা আরম্ভ হয়। তাই রাতে সাহরী খাওয়ার পর বা রোযার নিয়্যাত করার পরও সুবহে সাদেক না হওয়া পর্যন্ত কিছু খাওয়া কিংবা স্বামী-স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি জায়েয। তবে সুবহে সাদেক উদিত হয়ে যাওয়ার সন্দেহ থাকলে এসব না করাই উচিত।

* অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত), কক্সবাজার হাশেমিয়া কামিল মাদরাসা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •