শিপ্ত বড়ুয়া

কেমন আছেন আপনারা? নিশ্চয় ভালো নেই, বিশ্বমহামারি করোনা মোকাবেলায় আজ দীর্ঘ একমাসের বেশি সময় ধরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। অবশ্য পরিবর্তন প্রকৃতির খেলা। এতসবের পরেও কখনো কি প্রশ্ন জেগেছে কেমন আছে ২০১৭ সালে মায়ানমার হতে বিতাড়িত কক্সবাজারের বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি? সর্বশেষ ৩১শে মার্চ ২০২০ সালের বিশ্ব অভিবাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর তথ্যমতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাস করছে ১,৮৭,৮৪৪ (এক লক্ষ সাতাশি হাজার আটশো চুয়াল্লিশ) টি পরিবার এবং ৮,৫৯,৮০৮ (আট লক্ষ ঊনষাট হাজার আটশো আট) জন মানুষ প্রকৃতপক্ষে এর চেয়েও বেশি। দেশের নাগরিক এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি মিলে বাংলাদেশ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কতোটা মুখ থুবডে পড়তে পারে তা নিশ্চয় একটু-আধটু আন্দাজ করা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হুড়মুড়িয়ে বাড়ছে করোনা সনাক্ত রোগী এবং মৃত্যুর হার। সর্বশেষ ২২শে এপ্রিল রাত ১২ টা এ.এম পর্যন্ত সরকারি তথ্যমতে বাংলাদেশের মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩,৩৮২ জন। যেখানে ১৪ই এপ্রিলও আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো মাত্র ১০১২ জন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৩৭০ জন করোনা আক্রান্ত বেড়েছে। তাছাড়া দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরের অবস্থান কক্সবাজারের কুতুপালং-বালুখালীতে। তাদের জীবনযাত্রা এখানে মোটেও স্বাভাবিক ও সহজ নয়। নানান স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নয় লাখ জনগোষ্ঠি বসবাস করছে, তাদের নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ইউএনএইচসিআর এর গবেষণামতে সারাবিশ্বে দেশত্যাগে বাধ্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাত্র ৩% এরও কম নিজ দেশে ফিরে যায় বা যেতে পারে। জনস হোপকিনস ব্লোমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং হিউমেন্টেরিয়ান হেলথ এর ১৮ই মার্চ ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ৪৬০০০ জনের বেশি, যা খুবই কম সংখ্যক জায়গা যদি করোনভাইরাস প্রতিরোধে শারীরিক দুরত্ব মেনে চলতে হয়। কুতুপালং-বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে বিভিন্ন বিদেশী এনজিও সংস্থা দ্বারা স্থাপিত হাসপাতালগুলোতে মোট ৩৪২ টি বেড আছে মানে ৫.৭ টি বেড প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য। তারপরেও খুব বেশি করে হলে ৬৩০ শয্যায় উন্নীত করা যায় এই ক্যাম্পের হাসপাতালগুলো। তখন প্রতি ১০,০০০ জন ব্যক্তির জন্য ১০.৫ টি বেড থাকে। এসব তথ্য আগে থেকেই দেখে নিতে হচ্ছে কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলে কেমন অবস্থা দাঁড়াতে পারে তার মোটামুটি উপলব্দির জন্য। এবার রোহিঙ্গা শিবিরসহ কক্সবাজার জেলার হাসপাতাল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র দেখা যাক।

কুতুপালং এবং বালুখালী ক্যাম্পে রয়েছে ২৪ টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসাকেন্দ্র। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে নয় কোটির বেশি জনসংখ্যাপূর্ণ এলাকায় এতো কম হাসপাতাল এবং শয্যায় কিভাবে তাদের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয়। ঘটনাচক্র এখানে শেষ হলে বেশ ভালো হতো কিন্তু এখানে শেষ নয়। রোহিঙ্গা শিবিরের জরুরী রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য যায় কক্সবাজারের স্থানীয় সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে। সেকারণে বর্তমানে জেলা ২৫০ শয্যার কক্সবাজার হাসপাতাল অনেকটা এনজিওর ব্যবস্থাপনায় চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে কক্সবাজার জেলার মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ২৬,৫৫,০০০ (ছাব্বিশ লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার) এবং জেলার চিকিৎসা সেবায় সরকারি-বেসরকারী হাসপাতাল মিলে রোগী ধারণ ক্ষমতা আছে ৯১০ শয্যা। নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) আছে মাত্র ৬টি তাও সবগুলো কার্যক্রর কিনা তা নিয়ে আছে প্রশ্ন। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্স লোকবলের সংখ্যা অনুযায়ী ০.৩১ ডাক্তার এবং ০.১২ নার্স আছে প্রতি ১০০০ জন রোগীর জন্য। সাধারণ পরিস্থিতিতে দৈনিক ৪০০-৬০০ রোগী সেবা নেয় (প্রাপ্তবয়স্ক রোগী, প্রসেসট্রিক এবং পেডিয়াট্রিক শয্যা অন্তর্ভুক্ত) এছাড়া দৈনিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ৫০-৬০ জন রোগী জেলা হাসপাতালে আসে। সাধারণ পরিস্থিতিতেও স্থানীয় জনসংখ্যার জন্য এত কম পরিমাণ শয্যা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো বর্তমানে চলমান করোনা পরিস্থিতি কক্সবাজারের স্থানীয় জণগণ এবং নয় লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির করোনা অবস্থার অবনতি হলে সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ সামাল দিতে পারবেন কি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতি এক হাজারে ৪.৫ জন করে চিকিৎসকের প্রয়োজন বলে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু সে আগে থেকেই গাদাগাদি করে চলছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। তারমধ্যে অধিক অবহেলায় কক্সবাজারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জন্য ভয়ভয় বিপদের সংকেত এইযে, ইউএনএইচসিআর (UNHCR) ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় কর্তৃক তৈরিকৃত জরিপে সামগ্রিক ক্যম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে জনসংখ্যার ৫৫% শিশু ও ৩% বৃদ্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তিদের উপর চালানো জরিপে দেখা গেছে শিশু এবং বৃদ্ধদের ভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণের ঝুঁকি বেশি। স্থানীয় কক্সবাজারের জনগণ হয়তো এখনো নিজ অবস্থান থেকে অনেকাংশে সচেতন আছে এবং নিজেরা নিজেদের কোনোমতে করোনাভাইরাস মোকাবেলার যুদ্ধে জয়ী করতে পারবে কিন্তু আত্মবিধ্বংসী নিরক্ষর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির কি হবে তা কি ভেবেছেন? বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত কয়েকজনের সাথে কথা বলে জেনেছি ক্যম্পের ভেতরের অবস্থা অতটা ভালো নয়। নেই কোন জনসচেতনতা, আর তথাকথিত জনসচেতনতা থাকলেও তাদের অশিক্ষার কারণে কোনো কিছুই তারা মানছেন না।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির একটা অংশ নিরক্ষর, মায়ানমার থাকতে তারা শিক্ষা, চিকিৎসা কোনো কিছুই পায়নি। সে রেশ এখনো কাটেনি, তারা ব্যাপক পরিমাণে কু-সংস্কারছন্ন এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যয় নিমজ্জিত। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রের রিপোর্টে দেখেছি তারা বলেছেন, করোনাভাইরাস কি? আমাদের বাঁচার-মারার মালিক আল্লাহ্। তাদেরকে বেশিবেশি হাত ধোয়ার কথা বললেও তা মানছেন না, শারীরিক দুরত্বের জায়গা তো ওখানে নেই এটার কথা বাদ দেয়া যাক। এখন থেকে তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে এবং করোনাভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান বিতরণে সরকার কর্তৃক সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিৎ, তা দেওয়া না হলে করোনাভাইরাস ব্যপক আকারে ছড়িয়ে পড়বে এবং তা কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সারা বিশ্বের এমন কঠিন সময়ে নয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রতি ঘৃণা এবং অবহেলা প্রদর্শন এই সময়ে কাম্য নয়, ভুলে গেলে চলবে না আমরা তাদের মানবিকতা, ধর্মীয় ভাই-ব্রাদার ডেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে মাথা গুঁজার ঠাঁই দিয়েছি। তাই বর্তমান সময়ে তাদের নিরাপদ রাখা আমাদের উপর দায়িত্ব হিসেবে বর্তায় এবং আন্তর্জাতিক আইন তাই বলে। বর্তমান সময়ে নদীর মাঝখানে বৈঠাহীন নৌকায় কক্সবাজারবাসী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ভাসছে, কোনো তীরে যাবে কিনা জানি না! উপরের জরিপ পর্যালোচনা করে হয়তো নৌকা তীরে ফেরা কিংবা ভরাডুবির হিসেব নিজেরাই কষতে পারবেন। তবে এতটুকু নিশ্চিত, বাংলাদেশসহ কক্সবাজারের স্থানীয় এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জন্য ভয়াভয় বিপদ আসন্ন যদিনা এখন থেকে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা না যায়।

লেখক: শিপ্ত বড়ুয়া, ছা্ত্র, আইন বিভাগ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

[email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •