সিবিএন ডেস্ক:

দেশজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কয়েকজন গবেষক স্বাধীনভাবে এই রোগটির গতি-প্রকৃতি নিয়ে দলবদ্ধভাবে গবেষণা করছেন। তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদন পাঠকদের জন্য তুলে ধরলো বাংলা ট্রিবিউন:

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ও লাখো মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ানো এই ভাইরাস নিয়েই এখন অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে গবেষক, নীতিনির্ধারক, রাষ্ট্রনায়ক সব মহলে চলছে আলোচনা। সঙ্গে পর্যালোচনা চলছে যে অন্য রাষ্ট্র থেকে আমরা কতখানি ভালো বা খারাপ অবস্থানে আছি । এ ধরনের তুলনায় নিজেদের অবস্থান জানার সুযোগ থাকায় তা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সহায়ক হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশে এর করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে এরূপ পর্যালোচনা সবাইকে আরও সচেতন করতে সহায়ক হতে পারে।

সমসাময়িক সময়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর তাই আমরা তুলনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই বেছে নিয়েছি।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯৪৮ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৮৫ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের। করোনাভাইরাসে প্রথম ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর থেকে গত ৪২ দিনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের আক্রান্ত প্রতিটি ব্যক্তি দ্বারা এ ভাইরাস সংক্রমণের হার যুক্তরাষ্ট্রর চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশে একজন সংক্রমিত মানুষ গড়ে তিন জন মানুষকে সংক্রমিত করছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ৪২ দিনে এই হার ছিল দুই জনেরও কম। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা প্রতি ৪ দশমিকে ৩ দিনে দ্বিগুণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে শুরুর ওই ৪২ দিনে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতো প্রতি ৮ দিন পর পর। ফলে বলা যায়, বাংলাদেশে সংক্রমণের হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। উল্লেখ্য, পরিসংখ্যানের হিসেবে এই ব্যবধান যত দেরিতে হবে ততই ভালো।

বিভিন্ন পরিমণ্ডলের অনেককেই বলতে শোনা গেছে যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রর চেয়ে ভালো। কিন্তু এই ৪২ দিনের উপাত্তগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণ খারাপ [গ্রাফ-১]। এদিকে কোভিড-১৯ এর বিশ্বজুড়ে দেওয়া দৈনিক তথ্য অনুযায়ী বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ। আরও বলা হচ্ছে দেশটি এখন ভাইরাসের এপিসেন্টার। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বেশি থাকায় তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ কী হবে তা নিয়ে এখনই জরুরিভিত্তিতে ভাবা উচিত।

কেন বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এতটা বিস্তার হলো এবং সূচকগুলো এত ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে এর কারণ অনুসন্ধানে তাকাতে হবে শুরুর দিনগুলোতে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে প্রথমে রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ এবং সংক্রমণের পর প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। এরপর থেকে যদি আমরা সময়গুলোকে তিনভাগে ভাগ করি তাহলে চিত্রটা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সময়ের ভাগগুলো এমন মার্চ ১৮ থেকে মার্চ ২৬ প্রথম ভাগ (হলুদ), ২৬ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল দ্বিতীয় ভাগ (সবুজ) এবং ৫ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল তৃতীয় ভাগ (লাল)। [গ্রাফ-২]।

এই সময় বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা প্রকৃত ও অনুমিত সংক্রমণের অনুপাতের হার পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে ২৬ মার্চের পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। তবে প্রকৃত ও অনুমিত সংক্রমণের অনুপাত এক এর নিচে চলে যায় ২৬ মার্চের পর থেকে (গ্রাফ-২)। উল্লেখ্য, এই অনুপাত এক এর নিচে থাকা মানে হচ্ছে সংক্রমণ পরিস্থিতি ভালোর দিকে আছে আর এক এর ওপরে থাকা মানে সংক্রমণ বাড়ছে। একই চিত্র থেকে আমরা দেখতে পাই, ৩১ মার্চ থেকে সূচকটির প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী যা ৬ এপ্রিল আবার এক এর ওপরে চলে যায়। এই তথ্য থেকে অনুমান করা যাচ্ছে যে প্রথম ভাগে অর্থাৎ ২৬ মার্চের আগের কিছু সিদ্ধান্ত সূচকের এমন নিম্নমুখী প্রবণতায় ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে ৩১ মার্চ থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায়ও ভূমিকা রাখতে পারে কিছু প্রভাবক। যেহেতু সংক্রামক মহামারি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্বটিই হচ্ছে বড় নিয়ামক, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে সামাজিক দূরত্বের কঠোরতার বিষয়টির একটি বড় যোগসূত্র রয়েছে সূচকের এই ওঠানামাতে।

প্রথম কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর পর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় ১৮ মার্চ, সেনা মোতায়েন করা হয় ২৪ মার্চ এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় ২৬ মার্চ। প্রকৃত ও অনুমিত সংক্রমণের অনুপাতের হার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৮ মার্চের স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করার ৮-১০ দিনের মাথায় সংক্রামণ কমে আসতে শুরু করে। তাই ধারণা করা যায় যে এই সিদ্ধান্তটির একটি প্রভাব থাকতেও পারে। যদিও এরপর সেনা মোতায়েন ও সরকারি ছুটি ঘোষণার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সূচকের গতিপথ বিপরীতমুখী লক্ষ করা যায়। যদিও প্রকৃত বিবেচনায় সংক্রমণ কমার কথা।

কঠোর পদক্ষেপের পরেও সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমূখী প্রবণতার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়ের ভূমিকা থাকতে পারে বলে অনুমান করা সম্ভব। এগুলো হচ্ছে–এক. ২১ মার্চে তিনটি আসনে উপনির্বাচন, দুই. ২৬ মার্চ ছুটি ঘোষণার পর মানুষের সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া এবং তিন. ৪ এপ্রিল গার্মেন্টস কর্মীদের ঢাকামুখী পদচারণা। যদিও এই প্রভাবকগুলোর কোনটির প্রভাব কতখানি বা আদৌ আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন।

একই সময়রেখাতে সংক্রমণ দ্বিগুণ হওয়ার সময় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৮ মার্চ–এই ১১ দিনে সংক্রমণ দ্বিগুণ হতে সময় লেগেছিল তিন দিনের মতো, এরপর সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ফলে সংক্রমণ দ্বিগুণ হওয়ার সময়কে ৫ দিনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে লকডাউনের নিয়ম মেনে চলায় অনীহার কারণে তা ধরে রাখা যায়নি। আর এ কারণেই সম্ভবত দেশ মোমেন্টাম হারিয়ে ফেলে, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও সর্বোচ্চ উপযোগ নিতে ব্যর্থ হয়। [গ্রাফ-৩]

বাংলাদেশে করোনা টেস্ট ও শনাক্তের সপ্তাহের গড় অনুপাত হিসেবেও দেখা যায় ৪ এপ্রিল থেকে টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। ৩ এপ্রিল এটি সর্বনিম্ন ১.১ শতাংশ ছিল এবং ২০ এপ্রিল এটি ১৩.৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ দেশে সংক্রমণের মাত্রা ক্রমে বেড়েই চলছে।

১৮ এপ্রিল বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার পেরিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। এই পর্যালোচনা প্রতিবেদনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষকে তথ্যের ভিত্তিতে দেখানো যে লকডাউনের শর্ত মেনে চললে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশ্বাস করা যেতে পারে, এখনও সময় আছে, আমাদের সবার প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে ঘরে থাকা উচিত। সংক্রামক মহামারির নিয়মই হচ্ছে শুরুতে কষ্ট করলে কষ্ট দীর্ঘ ও তীব্র হয় না।

১৯১৮’র বৈশ্বিক মহামারি স্প্যানিশ ফ্লু সম্পর্কে লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য গ্রেট ইনফ্লুয়েঞ্জা: দ্য স্টোরি অব দ্য ডেডলিয়েস্ট প্যান্ডেমিক ইন হিস্টোরি’র লেখক জন বেরি ১৭ মার্চ নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা একটি কলামে উল্লেখ করেন একটি বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এক. নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা, দুই. কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং তিন. গণমানুষের সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা। এই তিনটি ধাপের তৃতীয় ধাপটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি মানুষের হাতেই। মানুষ সচেতন না হলে যতই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন তা কাজ করবে না।

১৯১৮’র স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি শহরের তুলনা গবেষকরা প্রায়ই টেনে আনেন। ফিলাডেলফিয়া ও সেন্ট লুইস। স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম মানুষ মারা যায় ১৯১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, কিন্তু তারা হুমকিকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। বরং সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গে তুলনা করে প্যারেড থেকে শুরু করে সব ধরনের জনসমাগমকে স্বাগত জানায়। অপরদিকে সেন্ট লুইসে স্প্যানিশ ফ্লু থেকে প্রথম মৃত্যু হয় ৫ অক্টোবর ১৯১৮ সালে। এর পরপর ৭ অক্টোবর তারা সবকিছু বন্ধ করে দেয়। যার ফল আমরা চিত্র-৫ এ দেখতে পাই। ফিলাডেলফিয়ায় সহসাই মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়, গণকবর খুঁড়তে হয়। অপরদিকে সেন্ট লুইস কার্ভকে ফ্ল্যাট রেখে মৃত্যুর সংখ্যাকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। [চিত্র-৫]

আগামী দিনে আমাদের কার্যক্রম ঠিক করতে হবে আমরা সেন্ট লুইস হবো নাকি ফিলাডেলফিয়া। দুটিই নির্ভর করছে নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণের ওপর।

এই গবেষণার জন্য আইইডিসিআর (IEDCR), ইসিডিসি (ECDC*) এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। মহামারি গতি প্রাক্কলনের জন্য Exponential Growth model ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাক্কলিত Exponential model থেকে অন্যান্য তথ্য যেমন R0, doubling time প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাংলাদেশের COVID-19 অস্বাভাবিক গতি প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে exploratory data analysis এর মাধ্যমে। আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ এর জন্য গবেষণার এবং বিশদ তথ্যের প্রয়োজন। তবে, আপাত দৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত আমাদের ব্যাখ্যাসমূহ সুস্পষ্ট অর্থ বহন করে।

(আমরা একটি স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক গবেষক দল। যারা বর্তমানে বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণ নিয়ে কাজ করছি। আমাদের নিয়মিত পর্যালোচনা দেখুন https://jaynal.shinyapps.io/COVID19_BD/ এই ড্যাশবোর্ডে এবং আপনার মতামত দিন।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •