রায়হান আজাদ

ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ ধর্ম। সমাজে ও দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ইসলামের অভীষ্ট লক্ষ্য। মানুষের কল্যাণ ও সুস্থতা নিশ্চিতকরণই ইসলামী আদর্শের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সঙ্গবদ্ধ জীবনই ইসলামী জীবন। রাষ্ট্রের সৎ ও যৌক্তিক আদেশ মান্য করা জনগণের জন্য অনিবার্য কর্তব্য। ইসলামে জননিরাপত্তা বিঘিœত করা সমম্পূর্ণরূপে হারাম। জনগণের শান্তি ও স্বস্তি বিধানে রাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপ মেনে চলা মুসলিম নাগরিকের জন্য ফরজে আইন-বাধ্যগত দায়িত্ব। এখানে রাষ্ট্রশক্তি ইসলামিক অথবা অনৈসলামিক সে প্রশ্ন তোলা অবান্তর। আমার উপরোক্ত বক্তব্যগুলোর সমর্থনে আল কুরআন ও আল হাদীসে শত শত দলীল-দস্তাবেজ রয়েছে এবং এসমস্ত আয়াত, মহানবীর বাণী ও রেফারেন্সসমূহ ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ন্যুনতম জ্ঞানের অধিকারী যে কেউ অবগত আছেন। সেজন্য আমি কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় সেসব এখানে উল্লেখ করছি না। এটি একটি কমনসেন্সের ব্যাপারও বটে যে রাষ্ট্রের যে আদেশের প্রেক্ষিতে আল কুরআনের সরাসরি নির্দেশ শুক্রবারের জুম‘আ বাতিল হয়ে যায় এবং যৌক্তিক কারণ আছে বিধায় দেশের আলিম সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তা মেনেও নেন এবং নিজ নিজ অবস্থানস্থলে ব্যক্তিগতভাবে যোহরের নামায আদায় করেন নির্দ্বিধায়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে আদেশে ফরজে আইন জুম‘আকে রহিত করে দেয় সে আদশের শরঈ তাৎপর্য কতটুকু হতে পারে তা সামান্য বিবেকবান মানুষের কাছেও অবোধগম্য নয়।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজ বিশ্বের সবচে ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ গভীর সংকটে নিপতিত। পার্লামেন্টের সদস্যগণ অঝরে কান্না করে তাওবা করেছেন। আজ দেশের অর্থনীতির চাকা স্তব্দ। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। মিল-কলকারখানা ও গার্মেন্টস সেক্টর বন্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ খাঁ খাঁ করছে। মহামারি করোনা সংক্রমণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। অপ্রতুল স্বাস্থ্য উপকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার হ-য-ব-র-ল অবস্থায় প্রমাদ গুণছেন ডাক্তার-নার্সরা। জীবন-মৃত্যুর দোলাচালে দোলছে স্বাস্থকর্মীগণ। দরিদ্র-দীন-হীন বেকার জনতা একবেলা খাবারের জন্য ত্রাহি ত্রাহি করছে পথে-প্রান্তরে। এমতাবস্থায় দায়িত্বশীল সরকার দেশী-বিদেশী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বাধ্য হয়ে দেশের জনগণকে বাঁচানোর বৃহত্তর স্বার্থে লকডাউনের মেয়াদ পর পর তিনবার বৃদ্ধি করেছে যেন জেনে বুঝে মুখে গরল তুলে নিয়েছে। এ লকডাউন আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর সুন্নাহ-পদ্ধতি। বেশির ভাগ মহামারিই সংক্রামক। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মহামারির সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিনদেরকে ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে নিজ নিজ অবস্থান স্থলে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫) সহিহ বুখারির বর্ণনায় পাওয়া যায়, শাম বর্তমান সিরিয়ায় মহামারি দেখা দিলে হযরত ওমর (রা.) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর স্থগিত করেন। কোন কোন হাদীসে মহামারিকালে নিজ বাসা-বাড়িতে অবস্থান করে মৃত্যু মুখে পতিত হলে তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে মর্মে উদ্ধৃত আছে। আর যদি সুস্থও থাকে তবু ইমাম তাবারীর মতে, “মহামারী চলাকালীন যে নিজ ঘরে অথবা নিজ এলাকায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্য্য ধরে অবস্থান করে, আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে শহীদের সমপরিমাণ সাওয়াব দেয়া হবে, যদিও সে মহামারীর সময় মৃত্যুবরণ করল না”।

এখন প্রশ্ন আসছে রাষ্ট্রের আইন মানা ফরজ,মহামারিতে লকডাউন তথা এদিক সেদিক ঘুরাফিরা না করে বাসায় অবস্থান করা অর্থ্যাৎ সামাজিক দুরত্ব মেনে চলার বিধানের প্রবর্তক মহানবী সা: আর এসব হুকম-আহকাম সবচেয়ে বেশী জানেন দেশের আলিম সমাজ। ফরজ লংঘনের কী গুনাহ সে সম্পর্কেও তারাই সম্যক অবগত আছেন আর তারাই যদি লকডাউন ভঙ্গ করেন তাহলে সেটি হবে অমার্জনীয় অপরাধ। ইসলামের দৃষ্টিতে জুম‘আ না পড়লে যে অপরাধ তারচে বড় অপরাধ। কারণ এই রাষ্ট্রীয় হুকমের কারণেই জুম‘আর নামাজ পড়া সম্ভব হয়নি। ইসলামে ফরজে আইনের উপর আর কোন শরঈ বাধ্যবাধকতার মাপকাঠি নেই।

আমাদের আলিমদের আত্মসম্মানবোধ থাকা চাই। তারা যদি আইন ভঙ্গের অপরাধে শাস্তির মুখোমুখি হন তাহলে এটি হবে চরম বেইজ্জতি;সাদা কাপড়ে দাগ লাগার মতো দৃশ্যমান হয় তাদের অপরাধ ও শাস্তি। ব্রাক্ষ¥ণবাড়িয়ায় একজন নামজাদা ওয়ায়েজ আলিমের জানাযায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছে। জানাযার আয়োজক কমিটি ও উক্ত এলাকার প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারেন না। এ মর্মে মরহুম শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের ছেলে মাওলানা মামুনুল হকের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি এ অনভিপ্রেত ঘটনা ও উপস্থিতির জন্য দু:খ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে এ সমাগমকে বৈধতা দেয়ার জন্য অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আ‘লীগ, বি.এন.পি ও জামা‘আতের নেতা-নেত্রীর মৃত্যু কিংবা মুক্তির বিষয়কে টেনে এনে কথা বলছেন। আসলে এসব একটি কাল্পনিক হিসাব-নিকাশ ও কথার প্রেক্ষিতে কথা। তর্কের নীচতম স্তর বৈ কি?

এক্ষেত্রে আমি মনে করি, যারা ইসলামী অনুশাসন ও রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারা মহামারির এ করুণ পরিস্থিতিতে পথে-প্রান্তরে জন সমাগম ঘটাতে পারেন না। আজকে গার্মেন্টসের সামনে বিক্ষোভ হচ্ছে,আওয়ামী লীগের নেতারা বাবা-মায়ের জানাযায় সমাগম করছে, কাঁচাবাজারে ধুমচে কেনাকাটা চলছে। আইন না মানার এসব উদাহরণ যখন আলিম-ওলামারা দেন তখন তাদের নিয়্যতের কলুষতা প্রমাণিত হয়, রাষ্ট্র ও শরঈ বিধান পালনে এটি তুলনা আর বাড়বাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। আর এ আশংকা ভর করে যে রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরার জন্য সাধারণ যুবকদের যেভাবে পুলিশ পিটুনি দিচ্ছে সেভাবে যদি জুব্বাধারী এসব আলিমদেরকেও উত্তম-মধ্যম দেয়া হয় তাহলে সেটি সবার কাছে ন্যায্যতা পেয়ে যাবে!

আমাদের দেশের কওমী আলিম সমাজের জন্য দুর্ভাগ্য ঐ জায়গায় তারা ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহর সিকুয়েন্স বুঝেন না, আবেগের জোশে চলেন। কোন মুসলিমের দাঁড়ি রাখার সুন্নাত পাওয়া না গেলে তারা তাকে মুনাফিক তকমা দিতেও দ্বিধা করেন না। অথচ ২০১৯ সালে এ ঘরানার ডজনের অধিক আলিম-হাফিজকে শিশু যৌন হয়রানির মামলায় গ্রেফতার হতে হয়। তাই অপরের সাথে তুলনা না দিয়ে ইসলামী জ্ঞানের রাহবার হয়ে একজন আলিম হিসেবে আপনি নিজে কতটুকু আমল করছেন-সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আর নিজেদের আনাড়িপনা দেশ-বিদেশের মিডিয়ার হাতে ইস্যু করে তুলে দেয়াও কোন বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের উচিত নয়। সুতরাং রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে পদক্ষেপ নেয়া সচেতন আলিম সমাজের কর্তব্য বলে সাব্যস্ত হয় যাতে আত্মসম্মান নিয়ে তারা সমাজে ও দেশে দাঈ ইলাল্লাহর মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। আয় আল্লাহ পাক! আমাদের আলিম সমাজকে হিকমতের সাথে দায়িত্ব পালনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট ,কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কলাতলী, কক্সাবাজার।

ই-মেইল: [email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •