মো. নুরুল করিম আরমান, লামা প্রতিনিধি :

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমন আতঙ্কে প্রায় সকল পেশার মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে গৃহে অবস্থান করছে, ঠিক তখনি প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দেশের এই ক্রান্তিকালে ঝুঁকি নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন পার্বত্য জেলা বান্দরবানের ইউনিয়ন পরিষদ সচিবরা। স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই তারা দিন-রাত মাঠে প্রান্তরে ছুটে চলেছেন সাধারণ জনগণের দৌঁর গৌড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে। কিন্তু তাদের সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে তেমন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি করোনা ভাইরাস ঝুঁকিতে রয়েছেন এসব সচিবরা। চলমান পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত চিকিৎসকদের ন্যায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও যাতায়াতের সহযোগিতাসহ সরকারের ঘোষিত ইনস্যুরেন্সের আওতায় আনার জন্য জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ইউপি সচিবরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, বান্দরবান জেলার ৭টি উপজেলার ৩৩ ইউনিয়ন পরিষদে ৩৩জন সচিব থাকার কথা থাকলেও সম্প্রতি থানচি ও রুমা উপজেলার দুই ইউপি’র সচিব অবসরে যাওয়ার কারণে বর্তমানে ৩১ জন সচিব কর্মরত আছেন। এসব সচিবরা সকল প্রকার দাপ্তরিক কাজের রিপোর্ট প্রদান, চলমান করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কমিটি গঠন, প্রবাসী ও দেশের বিভিন্ন স্থান হতে আগত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাসহ জরুরী ক্ষেত্রে লকডাউনের আওতায় আনা, দিনমজুর, ভিক্ষুক, রিক্সাচালক, ভ্যানগাড়ি চালক, ফেরীওয়ালা, নিম্নআয়ের পেশাজীবী ব্যক্তি যারা লাইনে দাঁড়িয়ে লোকলজ্জার কারণে ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করতে পারেনা- তাদের তালিকা প্রস্তুুত করা, ঘরে ঘরে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, মুদি, ওষুধ, সার-কীটনাশকের দোকানের সামনে নিরাপদ/ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ গণজমায়েত হতে বিরত থাকার জন্য এলাকাবাসীকে সচেতন করা, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকা, জি আর, ১০ টাকা কেজি চাল, ভিজিডিসহ বিভিন্ন কাজ করছেন। এছাড়া মন্ত্রণালয়, জেলা, উপজেলা প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট প্রদান ও যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি সকল কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। মোট কথা, যে কোন দুর্যোগে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির সাথে সার্বক্ষনিক যারা দায়িত্ব পালন করে তারা হলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সচিবগণ। কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে অন্যান্য বিভাগ সরকারিভাবে নিরাপত্তা সামগ্রী পেলেও ইউপি সচিবগণ তা পায়নি। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিত্যদিন জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। সূত্র আরো জানায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হলো, করোনায় ঝঁকি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের পুরস্কারসহ স্বাস্থ্যবীমা প্রদান। ইউপি সচিবরা করোনা যুদ্ধে কোনো রকম সুরক্ষা ছাড়াই সকলের সামনে থেকে যুদ্ধ করছেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদুল হক বলেন, সচিবরা যেভাবে জনগনের সংস্পর্শে যাচ্ছেন, এতে তারা করোনা ভাইরাস সংক্রমন ঝুঁকিতে আছেন।

সরজমিনে জানা যায়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সচিবগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছেন। অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কর্মচারীরা নিজ বাসায় অবস্থান করলেও ঝুঁকি নিয়ে সরকারের প্রশাসন, বিভিন্ন দপ্তর, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং জনসাধারণের সাথে সু-সম্পর্ক রেখে লামা উপজেলাসহ বান্দরবানের ৭টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের সচিবরা কাজ করে যাচ্ছেন। সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্র ও শনিবারসহ প্রতিদিনই সচিবরা কাজ করছেন দিনেরাতে।

এ বিষযে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি ইউপি সচিব মো. মছিহুদ দৌল্লাহ, লামা উপজেলার রুপসীপাড়া ইউপি সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব, ফাঁসিয়াখালী ইউপি সচিব শহীদুল ইসলাম ও আজিজনগর ইউপি’র সচিব আবু হানিফ রাজু এক সুরে বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ কাজ করে চলেছে। এক্ষেত্রে দেশের অনেক সরকারি দপ্তরে ছুটি থাকলেও আমরা ইউনিয়ন পরিষদ সচিবরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি। এ অবস্থায় সচিবদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত স্বাস্থ্যবীমা ও বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের দাবি জানাই।

বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ সচিব সমিতির বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি ও সদর ইউপি সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারিতে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি আমরা সচিবরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। প্রায় একই ধরনের সেবায় যুক্ত থেকেও আমরা উপেক্ষিত। তাই স্বাস্থ্য বিভাগের মতো আমাদেরকেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, যাতায়াত ও বীমা সুবিধাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে লামা উপজেলার রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেযারম্যান ছাচিংপ্রু মার্মা ও আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফেরদৌস রহমান বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তারা দায়িত্ব পালনে কোনো প্রকার গাফিলতি করছেন না। তাদের সুরক্ষার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

জানতে চাইলে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচিবদেরকে মাক্সস ও হেক্সিসল হ্যান্ড রাব দেয়া দেয়া হয়েছিল। তবে সচিবরা যেভাবে জনসংস্পর্শে কাজ করছেন, তাতে করে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রী দরকার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •