ঢাকার শাহবাগে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে যেহেতু এই ডায়াবেটিক রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দেয়া হয়, সাধারণ সময়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে এবং মূল ফটক ঘিরে শত শত রোগী থাকেন।

গত বৃহস্পতিবার সকালে দেখা গেল মূল ফটকের সামনে কয়েকজন রোগী হুইল চেয়ারে বসে রয়েছেন। তাদের সাথে হাসপাতালের ইউনিফর্ম পরা সেবাকর্মী এবং জিনিসপত্রের ব্যাগ দেখে ধারণা করা যায়, তারা হয় ভর্তি হতে এসেছেন, অথবা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

কিন্তু হাসপাতালে নিয়মিত চেকআপের জন্য আসা মানুষের ভিড় এখন একেবারেই নেই।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬শে মার্চ থেকে চলছে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি। যে কারণে পরিবহনসহ সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যদিও স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংক এবং গণমাধ্যমের মত কয়েকটি খাত চালু রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে সরকারি হাসপাতাল চালু আছে। বেসরকারি হাসপাতালের সমিতিরও দাবি তাদের হাসপাতাল চালু আছে।

কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরুরি বিভাগে ডাক্তার নার্স থাকলেও, যেহেতু হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বসছেন না এবং তাদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ রয়েছে, সে কারণে সাধারণ রোগ কিংবা ক্রনিক অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে কোন অসুস্থতায় ভোগা মানুষের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ রয়েছে। কিন্তু রোগবালাই তো থেমে নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

এমন পরিস্থিতিতে যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে ভুগছেন, তারা পড়েছেন বিপাকে।

কথা বলেছিলাম লিপিকা হীরার সঙ্গে, যার ৮০ বছর বয়েসী ডায়াবেটিক মা’র চিকিৎসা আটকে গেছে লকডাউনের কারণে,

“মার্চের ২১ তারিখে চেকআপের জন্য যাবার ডেট ছিল, কিন্তু করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর আর বের হবার সাহস করি নাই আমরা। কারণ ওখানে রোজ প্রচুর মানুষ আসে, আর যেহেতু বয়স্ক মানুষের ঝুঁকি বেশি তাই রিস্ক নেইনি আমরা, কারণ আমার মায়ের বয়স ৮০’র ওপরে।”

কিন্তু বারডেম জেনারেল হাসপাতাল পরিচালনা করে যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন তার প্রধান অধ্যাপক একে আজাদ খান, দাবি করেছেন হাসপাতাল খোলা, তবে তিনি বলেছেন রোগীরাই আসছেন না।

রোগীর বিপত্তি

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর অনেক হাসপাতালই অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে আসা রোগী ভর্তিতে আপত্তি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তা মোঃ জাকির হোসেন বলছিলেন, তার হৃদ-রোগাক্রান্ত মাকে নিয়ে ছয়টি হাসপাতাল ঘুরে সপ্তম হাসপাতালে ভর্তি করাতে সক্ষম হন।

মার্চের শুরুতে মি. হোসেনের মায়ের হার্টে রিং পরানো হয়েছিল, কিন্তু তিন সপ্তাহ পরে মুখে ঘা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মি. হোসেনের মা।

“আম্মাকে যখন ভর্তি করাতে নিলাম, সবাই বলে ইব্রাহিম কার্ডিয়াকে যেতে, ওখানেই আম্মার রিং পরানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের আগেই জানিয়েছে যে এখন কার্ডিয়াক ছাড়া অন্য সমস্যার জন্য ডাক্তার যে নিয়ে আসে ওরা সে এখন পারছে না।

ফলে অন্যখানে চেষ্টা করি। ছয়টা হাসপাতাল ঘোরার পর ঢাকার একটি হাসপাতাল তাকে ভর্তি করাতে রাজি হয়, কিন্তু তাদের শর্ত ছিল, আগে করোনা পরীক্ষা করে নেগেটিভ হলে ভর্তি করবে।”

“সেইমত পরীক্ষা করে, তার পর নেগেটিভ আসলে পরদিন তারা আম্মাকে ভর্তি করে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। ভর্তির পরদিনই আম্মার অবস্থা খারাপ হয় তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। সেখানে আম্মা মারা যান।”

সাধারণ এবং ক্রনিক রোগের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।

সেই সঙ্গে রোগ শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ এবং করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে সরকার।

কিন্তু বিশেষায়িত বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সেবা দেয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে।

যদিও কিছু বেসরকারি হাসপাতাল দাবি করছে তাদের কার্যক্রম চলছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।

এমনকি সরকারি হাসপাতালেও রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না।

বেশিরভাগেই জরুরী বিভাগে ডাক্তার-নার্স থাকেন, কিন্তু হাসপাতালের বহিঃর্বিভাগে কেউ থাকেন না।

সেবাদানকারী হিসেবে নার্সদের পিপিই এর প্রয়োজন।সেবাদানকারী হিসেবে নার্সদের পিপিই এর প্রয়োজন। (ফাইল ছবি)

সেক্ষেত্রে সাধারণ রোগ এবং ক্রনিক অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে কোন অসুস্থতায় ভোগা মানুষের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ রয়েছে।

কারণ যেমন ক্যান্সারে ভুগছেন কিংবা চোখ ও দাঁতের সমস্যা যাদের, তাদের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে?

ঢাকার একটি বেসরকারি ক্লিনিকের দন্ত-চিকিৎসক মাসুমা নাওয়ার বলছেন, এর ফলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন

“ধরেন, আমার এক রোগীর রুট-ক্যানাল করছি আমি। তার প্রথম পর্যায়ের কাজ করা হয়েছে, পরের দুই সপ্তাহে বাকি কাজ করার কথা। এখন তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তো সবকিছু বন্ধ। এখন সে যখন ফিরবে তখন হয়তো তার দাঁতটা বাঁচানোই মুশকিল হবে।”

“আবার আমার মত যারা চেম্বারের রোগী দেখে উপার্জন করেন, তাদের জন্যও এটা সমস্যা, সেই সঙ্গে যার চেম্বার তার রোজগারও বন্ধ।”

ডাক্তার-রোগী পাল্টাপাল্টি অবস্থান

বাংলাদেশে এমনিতেই জনসংখ্যার অনুপাতে ডাক্তার ও সেবাকর্মীর সংখ্যা অনেক কম। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ২ হাজার ৯২৭ জন। এছাড়া রেজিস্টার্ড নার্স রয়েছেন ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন।

ইনসাফ বারাকাহ কিডনী হাসপাতাল

যে কারণে স্বাভাবিক সময়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় সব সময়। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় সেবা নিয়ে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।

রোগীর অভিযোগ, হাসপাতালের জরুরী বিভাগেও তারা সেবা পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে বেসরকারি ক্লিনিক ও বহু হাসপাতাল বন্ধ রয়েছে।

আর, চিকিৎসক ও সেবাকর্মীদের অভিযোগ, অনেক সময় রোগীরা তথ্য গোপন করে হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন, যে কারণে তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন এমন ভীতি রয়েছে তাদের।

আমি বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা এমন ভীতি কথা আমাকে বলেছেন, কিন্তু তারা ‘অন-রেকর্ড’ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা

ক্যান্সারের মত রোগ ভুগছেন যারা, যাদের নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়, তাদের সংখ্যাও কমে গেছে। ঢাকার আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের রেজিস্টার ডা. নাহিদ সুলতানা বলছিলেন, একমাত্র যারা কেমোথেরাপি বা এমন ধারাবাহিক চিকিৎসার পর্যায়ে রয়েছেন তারাই আসছেন হাসপাতালে।

“আউটডোরে অন্য রোগী আসছেন না বলা যায়। ১৫ দিনে চার থেকে পাঁচজন রোগী এসেছেন। আর যারা আসছেন তারা বাধ্য হয়ে জটিল অবস্থায় পড়ে আসছেন”

ঢাকার বাইরের চিত্র

ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। চট্টগ্রাম, সিলেট এবং খুলনার মত বিভাগীয় শহরগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। উপজেলা শহরগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়।

হাসপাতাল
হাসপাতালের গেটে নোটিসে বলা হয়েছে চিকিৎসকেরা ফোনে সেবা দেবেন

খুলনার বেসরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ডা. তাহমিনা বেগম বলেছেন, শহরে সরকারি হাসপাতালের বাইরে তিনটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল খোলা রয়েছে।

এর বাইরে একশো’র বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকেই বন্ধ।

ফলে যারা যারা আশপাশের জেলা বা থানা থেকে চিকিৎসা নিতে আসতেন তারা আসতে পারছেন না।

টেলিমেডিসিন

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, টেলি-মেডিসিন এর একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

টেলিমেডিসিন হচ্ছে যেকোন অসুস্থতার জন্য সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবার একটি মাধ্যম, যেখানে টেলিফোন এবং ভার্চুয়াল মাধ্যম মানে কম্পিউটার ও মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সেবা নেবেন একজন রোগী।

পালস ডক্টরস ভার্চুয়াল চেম্বার নামে একটি টেলিমেডিসিন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা রুবাবা দৌলা ব্যাখ্যা করছিলেন, “এখানে রোগী টেলিফোনে বা অ্যাপস ব্যবহার করে ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেন, এরপর ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে ডাক্তারকে সমস্যা খুলে বলবেন এবং প্রয়োজনে পুরনো কাগজপত্র দেখাতে পারেন।

করোনাভাইরাসকরোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই এটা ঠেকাতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাই কার্যকর উপায়।

আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট হবার পর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থাৎ বিকাশ, রকেট বা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ডাক্তারের সম্মানী দিতে পারবেন।”

কিন্তু টেলিমেডিসিনের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে টেলিমেডিসিন ব্যাপারটি খুবই অপ্রচলিত এবং এভাবে চিকিৎসা নেয়ার বিষয়ে রোগীদের মনোভাব খুব একটা ইতিবাচক নয়।

তাছাড়া বাংলাদেশে টেলিমেডিসিন প্রতিষ্ঠান চালু আছে মাত্র ১৪টি।

সরকার কী বলছে?

সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর স্বাস্থ্য সেবার এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল মাসের শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, কোন হাসপাতাল যদি ইমার্জেন্সিতে আসা রোগীকে চিকিৎসা না দেয়, তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

পরে এপ্রিলের নয় তারিখে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বিএমএ-ভুক্ত ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা সব রোগের চিকিৎসা সেবা দেবে হবে বলে সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোঃ এনামুর রহমান, যিনি বাংলাদেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সমিতিরও একজন নেতা।

তবে এসব ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

এদিকে, রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যকার দ্বিমুখী অভিযোগের ব্যাপারটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বীকার করে নিয়েছে।

তবে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাবার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিকল্পনা করছে, সরকারি বেসরকারি সব হাসপাতালের সামর্থ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়া হবে।

সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাধারণ অসুস্থতার জন্য মানুষকে সরকারি হাসপাতালে যাবার পরামর্শ দেন।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে এখন বিশ্বজুড়ে যখন প্রতিদিনই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, তখন চিকিৎসক ও রোগী উভয়েই অপেক্ষা করছেন, কবে এই দুঃসময় শেষ হবে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুতেই যাতে অসুস্থ না হতে হয় এমন একটি চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •