মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নির্মাণাধীন ১০ বেডের পরিপূর্ণ অত্যাধুনিক আইসিইউ (Intensive care unit) এবং ১০ বেডের এইচডিইউ (High dependency unit) আগামী ১২ মে’র মধ্যে চালু হচ্ছে। উভয় বেডে রোগীদের জন্য আধুনিক মেডিকেল ভেন্টিলেটর সুবিধা থাকবে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিশন (ইউএনএইচসিআর)-এর ৩৫ কোটি টাকার অধিক ব্যয়ে অত্যাধুনিক বহুমুখী সুবিধা সম্বলিত এই ২০ বেডের আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণ করছে। ইতিমধ্যে নির্মাণ কাজ প্রায় ৪০% সম্পন্ন হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মোঃ মহিউদ্দিন সিবিএন-কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

২০ বেডের আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণের বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাঃ শাজাহান আলি জানান, কক্সবাজারের স্থানীয় জনসাধারণের অত্যাধুনিক চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার কথা চিন্তা করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় ইউএনএইচসিআর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণে সম্মত হয়েছে। এবিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন আইসিইউ এবং এইসডিইউ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা ইউএনএইচসিআর-কে বুঝাতে তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সরকারিভাবে ইউএনএইচসিআর-কে ডিও লেটার দিয়েছেন। বিভিন্ন ভাবে ইউএনএইচসিআর-কে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এছাড়া, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন নিজেই উদ্যোগী হয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি এনে দিয়েছেন এবং ইউএনএইচসিআর-এর সাথে চুক্তি সম্পাদনে সহযোগিতা করেছেন। যেসব কাজে এডিএম মোহাঃ শাজাহান আলি নিজেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানান। এডিএম মোহাঃ শাজাহান আলি আরো বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের জোরালো ভূমিকা ছিলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সদর হাসপাতালে নির্মাণাধীন অত্যাধুনিক আইসিইউ এবং এইসডিইউ ভবিষ্যতে কক্সবাজারবাসীর জন্য একটা বিশাল সম্পদ হবে এবং জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ অনেক সমৃদ্ধ হবে বলে মন্তব্য করেন এডিএম মোহাঃ শাজাহান আলি। তিনি আরো বলেন, দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ও জেলা শহরেও এখনো এধরণের উন্নত স্বাস্থ্য সুবিধা নেই।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মোঃ মহিউদ্দিন জানান, গত ৭ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আইসিইউ এবং এইসডিইউ এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ভেন্টিলেটর সার্ভিসের জন্য অক্সিজেন প্ল্যান্টও একইসাথে নির্মান করা হচ্ছে। আগামী ৮ এপ্রিলের মধ্যে নির্মাণ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হতে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ২ দিন পরীক্ষামূলক ভাবে নতুন স্থাপিত আসিইউ এবং এইসডিইউ চালু করে আগমাী ১২ মে থেকে পুরোদমে এ ইউনিট ২ টি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তত্ববধায়ক ও উপ পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরো বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আগে কোন আইসিইউ ছিলোনা। শুধুমাত্র ২ বেডের অসম্পূর্ণ এইসডিইউ ছিলো। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আগে থেকেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন সুবিধা থাকায় আইসিইউ এবং এইসডিইউ এর নির্মাণ কাজ আরো গতিশীল হবে।

বিশ্বস্ত সুত্র মতে, নির্মাণাধীন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসিইউ এবং এইসডিইউ এর চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ক্লিনার, অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী সহ মাসিক ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। নির্মাণাধীন আইসিইউ এবং এইসডিইউ এর প্রতিমাসের এই অতিরিক্ত ব্যয়ও নিয়মিত ইউএনএইচসিআর কর্তৃপক্ষ বহন করবে। সুত্রমতে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসিইউ এবং এইসডিইউ এর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও আপডেট প্রযুক্তি সমৃদ্ধ যন্ত্রপাতি আমাদনী করা হচ্ছে। আগামী ২৮/২৯ এপ্রিলের মধ্যে আমদানীকৃত যন্ত্রপাতি কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছে যাবে বলে সুত্রটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ‘জাতিসংঘ সামগ্রী ও করোনা ভাইরাস রিলেটেড অগ্রাধিকার’ দিয়ে জরুরি কার্গোবিমানে যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারগণ সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। বেশি দ্রুত কাজ করতে গেলে আবার কোন ত্রুটি হলে, তা সারাতে অনেক সময় লাগবে বিধায় পরিকল্পিতভাবে সময় নিয়ে কাজ গুলো করা হচ্ছে। মেডিকেল স্থাপনা নির্মাণ কাজের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিজাইন, ড্রয়িং, স্পেসিপিকেশন অনুযায়ী প্রকৌশলীদের তত্বাবধানে কাজ করছে। দালানের অবকাঠামো আগে থেকেই করা থাকায় সেভাবে কাজ করতে গিয়ে একটু সময়ও ক্ষেপন হচ্ছে বলে সুত্রটি জানিয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মহিউদ্দিন জানান, সদর হাসপাতালের ৫ম তলায় এই আইসিইউ এবং এইসডিইউ নির্মাণ করা হচ্ছে। এরআগে কক্সবাজারের কোথাও পরিপূর্ণ আইসিইউ ছিলোনা।

একই বিষয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সিবিএন-কে বলেছেন, কক্সবাজারে কোন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আগে কোন ভেন্টিলেটর সুবিধা ছিলোনা। কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নির্মাণাধীন ১০ বেডের অত্যাধুনিক আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-Intensive care unit) ও ১০ বেডের এইসডিও (High dependency Unit) এর চলমান কাজ সম্পন্ন হলে সেখানে আধুনিক ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা থাকবে। আগামী ১২ মে’র মধ্যে এই ইউনিট ২টি চালুর টার্গেট রেখে নির্মাণ কাজ চলছে।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আরো জানান, ভেন্টিলেটর হচ্ছে-কোন গুরতর অসুস্থ রোগী নিজে নিজে অক্সিজেন নিতে না পারলে, সে রোগীকে কৃত্রিম উপায়ে ফুসফুসে যে প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন পৌঁছানো হয়, তার প্রক্রিয়ার মেশিনটির নাম মেডিকেল ভাষায় ‘ভেন্টিলেটর’। মুমূর্ষু রোগীর জন্য এ ভেন্টিলেটর প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত আইসিইউ, এইসডিইউ, সিসিইউ সহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ছাড়া হাসপাতালের অন্য কোন ইউনিটে এ মেডিকেল ভেন্টিলেটর এর ব্যবস্থা থাকেনা। এটা একটা খুবই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম। সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় রোগীর শ্বাস নালীতে করোনা ভাইরাস জমাট বেঁধে শক্ত আবরন সৃষ্টি করে। সে অবস্থায় করোনা আক্রান্ত রোগীর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুব বেশী দরকার হয়।

সিভিল সার্জন আরো বলেন, কেউ যদি কক্সবাজারে আগে থেকেই মেডিকেল ভেন্টিলেটর সমৃদ্ধ চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিলো বলে দাবি করে থাকেন, সে তথ্য মোটেও সঠিক নয়।

একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, ভেন্টিলেটর স্থাপনের সময় সুবিধা রাখা সাপেক্ষে এবং মানসম্পন্ন ভেন্টিলেটর হলে একটি ভেন্টিলেটর দিয়ে একসাথে একাধিক রোগীকে চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, ভেন্টিলেটর হচ্ছে, যে রোগী নিজে নিজে অক্সিজেন নিতে অক্ষম, সে রোগীকে যে যন্ত্রের মাধ্যমে ফুসফুসে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন পৌছানো হয়, সে ব্যবস্থা বা যন্ত্রের নামই ‘মেডিকেল ভেন্টিলেটর’।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •