নোমান খান

কালের বিবর্তনে ব্যবসা-বাণিজ্যের চেহারা পাল্টেছে।পনেরো শতকের দিকে ইউরোপীয়রা মসলা,মরিচের ব্যবসার নাম দিয়ে এই বঙ্গে আসেন।সেই থেকে আমাদের ব্যবসার সাথে পরিচয়।একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন এক ব্যবসায় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে;তার নাম মানবতার ব্যবসা।
মানবতার ব্যবসা? সংকটকে জিইয়ে রাখার জন্য ভুক্তভোগীদের প্রণোদনা দিয়ে,অভাবাদী মোচন করে সাম্রাজ্যবাদের নিগুঢ় কায়েমী স্বার্থ রচনার ইতিহাসকে মানবতার ব্যবসায় বলে।
এই ব্যবসায়ে চারটি বিষয় মূখ্য হয়ে উঠে-ভূরাজনীতি,সংস্কৃতি,আধিপত্য ও স্বার্থ।দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মায়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলে রাখাইনে বসবাসকারী একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা।দীর্ঘ সংকট আর অত্যাচারীত ও নিপীড়িত জীবন রোহিঙ্গাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ বাহিনী সমগ্র বর্মার ওপরই নিজের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয় ও বর্মাকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে৷১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির সময় রোহিঙ্গারা পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তাদের এই কাজটা আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠিরা মেনে নিতে পারে নি। তাদের কপালে “বেঈমান” তকমা লেগে যায়। এদিকে জিন্নাহ রোহিঙ্গাদের প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান। তখন তারা নিজেরাই রোহিঙ্গা মুসলিম পার্টি গঠন করে আরাকান স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়।১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়।১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুইবার তাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।ধারাবাহিক ভাবে ২০০১,২০০৭,২০১১ সালে জাতিগত দাঙ্গায় আরোও ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়।২০১৬-১৭ সালে নতুন করে “অপারেশন ক্লিনজিং” নামে রোহিঙ্গা নিমূর্ল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাখাইনে হত্যাযজ্ঞ চালায়।দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিরুপায় হয়ে জল ও স্থলপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
ভূরাজনৈতিকভাবে রাখাইন ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্তম পথ হিসেবে রোহিঙ্গা নিধনে চীনের ইন্ধন থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ চীনা বিনিয়োগে রাখাইনে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি।অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কারণে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সবসময় সন্দেহের চোখে দেখে।সন্দেহের অন্যতম কারণ ৪৭’র ইতিহাস।আধিপত্যকামী মানসিকতার চরিত্র চিত্রায়ণে আমেরিকা ও চীনের পরস্পর বিরোধীতা, জাতিসংঘের সদিচ্ছার অভাবে সভ্যতার ভয়াবহ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের কোন ইতিহাস রচিত হচ্ছে না।মায়ানমার ও চীনের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের ভার ধুঁকেধুঁকে বয়ে চলেছে বাংলাদেশ।ঐতিহাসিক কাল থেকে রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নেতাদের ঐক্যমত্যের অভাব এবং স্বদেশের বিরুদ্ধে একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত বীজ বপন করে দিয়ে গেছেন দীর্ঘ সংকট ও যুদ্ধের।
বর্তমান সময়ে অনেক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ ইউরোপ ও আমেরিকায় বৈশ্বিক বিভিন্ন নীতি নির্ধারনী ফোরামে থাকা সত্ত্বেও তারা রাখাইনের স্বাধীনতা নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করে না।এরা আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সাথে তাল মিলিয়ে রাখাইনের স্বাধীনতার কথাকে রুদ্ধ করে সংকটে সভ্যতার মঞ্চে চালিয়ে যাচ্ছে মানবতার ব্যবসা।

– নোমান খান ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •