অধ্যাপক আকতার চৌধুরী

(করোনা ডায়েরী-৮ম পর্ব )

করোনাময় সময়ে বাংলা নববর্ষ হয়ে গেল। ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , মঙ্গলবার । ১৪ এপ্রিল ২০২০ সাল । ছিলনা কোন কোলাহল , পান্তা ইলিশ , রঙিন কাপড়ে বেড়াতে যাওয়া । নাগর দোলায় চড়া। অথবা আড্ডা । কোনটারই রেশ ছিলনা। তবে শুভেচ্ছাটা অন্তত দেয়ার চেষ্টা করেছেন অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

লক ডাউনে কক্সবাজার। হোম কোয়ারেন্টাইনে দেশ। একই ধারায় অব্যাহত রয়েছে ঘরে বসে নামাজ আদায় , ধর্মীয় কার্যক্রম । মসজিদে জুমায় ১০ জন আর ওয়াক্তের নামাজে ৫জন। সামনে রমজান । প্রশ্ন উঠেছিল তারাবির নামাজের কিহবে। সেটারও উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানালেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরামর্শ মোতাবেক ঘরেই তারাবিহ নামাজ আদায় করতে হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার পুরো বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর । মানে আরো বেশী ঝুকিপূর্ণ সময় আমাদের সামনে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ জায়গায় লক ডাউন ভেঙ্গে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। মানুষ খাদ্যান্বেষনে বের হয়ে পড়েছে। অনেকটা রোখা যাচ্ছে না । অনেকে মনে করছেন, করোনায় মরার আগে না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে দেশে! এদিকে রিলিফ বিতরণে দেশে চাল চুরি , তেল চুরির ঘটনাও ঘটছে।

করোনা পরিস্থিতির এহেন পরিবেশে কবি নজরুল ইসলামের একটি গান বার বার মনে পড়ছিল –

“খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে।।
শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে।”

হা । মহান সৃষ্টি কর্তা তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে খেলছেন । যেন একটা শিশু তার সামনে যা পাচ্ছে খেলার ছলে সব উলট পালট করে দিচ্ছে। মনের সুখে ছুড়ে মারছে । আবার টেনে নিচ্ছে কাছে।

ভাবছিলাম কতটুকু মারাত্মক করোনা ভাইরাস , কতটুকু সর্বগ্রাসী !

আমার কাছে মনে হয় , সৃষ্টিকর্তা একটু করুণা তো অবশ্যই করেছে। যদি ঘরে থাকলে নিরাপদ । সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখলে নিরাপদ । সাবান দিয়ে হাত ধুলে নিরাপদ , অপরিস্কার হাতে মুখ চোখ নাকে হাত না দিলে নিরাপদ। হাঁচি কাশি উন্মুক্তভাবে না করে টিস্যু বা কাপড় ব্যবহার করলে নিরাপদ।

যদি এমন হত ,বাড়িতে থাকলেই ভাইরাসটা আক্রমণ করবে! তখন কী আর বাড়িতে থাকতে পারতাম? রাস্তা ঘাটে শীত রোদ বৃষ্টি কাঁদা ময়লায় কাটাতে হলে কি অবস্থা হত?

তাহলে করোনা ভাইরাস সৃষ্টিকর্তার ইশারায় কিছুটা করুণা তো অবশ্যই করেছে। তবে সে সুযোগের ব্যবহারও আমরা করছিনা।

সাবেক র‌্যাব ডিজি (বর্তমান পুলিশের আইজিপি) বেনজির আহমেদ এর কথাটা আমার মনে ধরেছে “ঘরে না কবরে থাকবেন সিদ্ধান্ত আপনার।” কথাটা প্রথমে ধাক্কা লাগলেও এটাই বাস্তবতা। আমরা হোম কোয়ারেন্টাইন না মেনে সেচ্ছা মৃত্যুকে আহবান করছি ।

গত ১ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজে করোনা টেষ্ট শুরু হয় । ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১৯১ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সবই করোনা টেষ্ট নেগেটিভ ছিল। কক্সবাজারে মোটামুটি স্বস্থি । পাশাপাশি সন্দেহও দেখা দেয় ।

‘আগে মেশিন টেষ্ট করেন, সেটি ঠিক আছে কিনা ‘ এমন সব মন্তব্য ফেসবুকে ভরে যায় । অনেকে টেষ্ট রিপোর্টকে আস্থায় নিতে পারছিলনা। এটা আমাদের মানসিক দৈন্যতা ।

জানা গেছে, কক্সবাজার মেডিক্যাল ল্যাবের টেষ্টিং যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম। এগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য ইউএনএসসিআরের সহযোগিতায় করা হয়েছিল। পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতিতে এটা আমাদের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়া হয় । এর সুফল আমরা পাচ্ছি। ১৬ এপ্রিল মোট ৪১ জনের স্যাম্পল টেস্টে ৪০ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ , ১জনের করোনা পজেটিভ । এই প্রথম একজনের রিপোর্ট করোনা ভাইরাস পজেটিভ পাওয়া যায়।

পজেটিভ পাওয়া রোগী একজন পুরুষ এবং পাশ্ববর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জিরো পয়েন্টের লোক । তিনি তাবলীগের চিল্লা দিয়ে গত কয়েকদিন আগে বাড়ীতে আসলে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় । তবে এখনো কক্সবাজারের কেউ করোনা পজেটিভ না হলেও প্রতিবেশী উপজেলায় পাওয়াতে খুব বেশী আশাবাদী হওয়া ঠিক হবেনা।

এর মধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টায় সাগরে ২ মাস ভেসে ফেরত এল প্রায় ৪শত রোহিঙ্গা । অনেকে বলছে, আমাদের সীমান্তগুলো এতটা ন্যাংটো কেন। দেশ লক ডাউন, কিন্তু কেউ ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে না।

করোনায় বাড়ছে আক্রান্ত , বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। অদৃশ্য শত্রু করোনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। গতকাল দেশে নতুন করে আরও ৩৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ১০ জন। এ পযন্ত মারা গেছেন ৬০ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৭২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ২০১৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে নমুনা পরীক্ষার আওতায় যদি সবাই আসে তাহলে বিস্ফোরক পরিমাণ আক্রান্তের সংখ্যা দাড়াবে। জ্যামিতিক হারে বাড়ছে করোনার প্রকোপ।

কিন্তু করোনার দেশ চীন সচল। থেমে নাই তাদের জীবনযাত্রা । অর্থনৈতিক ভাবেও তারা বিশ্ব বাজার হাতের মুঠোয় রেখেছেন। এক মাসে ৪০০ কোটি মাস্ক বিক্রি করেছে চীন।মেডিক্যাল সামগ্রী বিক্রিতেও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। অন্য দিকে পুরো বিশ্ব অচল। থেমে গেছে জীবন যাত্রা । ব্যস্ত সবাই ,কার কখন মৃত্যুর ডাক আসে! মৃত্যুর হার বাড়লেও এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে লক ডাউন তুলে ফেলার ইংগিত দিল ট্রাম্প । আর আমরা ভেবেই কুল পাচ্ছিনা কতটা ভয়াবহ আমাদের ভবিষ্যত।

দেশে গত ১৫ এপ্রিল করোনায় মৃতদের মধ্যে একজন ডাক্তারও ছিল। সিলেটের ডা: মইন উদ্দিন। করোনা যুদ্ধের প্রথম বীর যোদ্ধা শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করল জাতি। প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করলেন । কিন্তু কক্সবাজারে তাঁকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস চরম ভাইরাল ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। কক্সবাজারের প্রবীন ও শ্রদ্ধেয় একজন সাংবাদিক ওনার স্ট্যাটাসে লিখেন “ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক সভাপতি ও সিলেট মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা: মঈন উদ্দিন করোনায় চিকিৎসকদের প্রথম বলি”

ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসকে ঘিরে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয় । এ বিতর্ক কক্সবাজারের গন্ডি ছেড়ে রাজধানীতেও ঝড় উঠে। কারো কারো মতে, এটা একজন মৃত ব্যক্তিকে শুধু অপমান নয় , তাঁর অবদানকে অপমান। করোনা মহামারী সময়ে সকল ডাক্তারকে করোনা চিকিৎসায় নিরোৎসাহিত করার নামান্তর । কারো মতে রাজনীতির সংকীর্ণ পথে হাটা। জাতীয় দুর্যোগে দলীয় পরিচয় টেনে এনে জাতীয় অনৈক্যের সৃষ্টির চেষ্টা।

কারো মতে , যেখানে অতীতে তার দলীয় পরিচয় কেউ জানত না সেটাকে সামনে টেনে তার অবদানকে দলীয় পরিচয়ে কোন রাজনৈতিক দলকে ফায়দা তুলে দেয়ার চেষ্টা। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও আক্রমন করেছেন, স্ট্যাটাসে , রিপ্লাইতে ।

আবার কারো কারো মতে , তিনি সত্যটাই তুলে ধরেছেন। এখানে অন্যায় কিছু হয়নি। সম্ভবত বিতর্কের কারণে বর্তমানে স্ট্যাটাসটি তুলে নেয়া হয়েছে।

তবে যাই হোক , করোনা তো হিন্দু , মুসলিম ,বৌদ্ধ , খ্রীষ্টান চিনে না । ধনী গরীব চিনে না । মহিলা , শিশু ,পুরুষ চিনে না ।গ্রাম পাড়া মহল্লা , জেলা , উপজেলা চিনেনা , দেশ , বিদেশ চিনে না । যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমাদের কমন শত্রু করোনা ভাইরাস। ডাক্তারদের পাশাপশি সমান লড়াই করে যাচ্ছে সাংবাদিক বন্ধুরা।  আমরা সবাই করোনার টার্গেট । শত্রু যদি বুহ্যভেদ করার সুযোগ পায় তাহলে কারো নিস্তার নাই।

সত্য যতই সুন্দর হোক তা প্রয়োগের সময় চিন্তা করা দরকার ।  নচেৎ সত্য বিব্রত হয় । যেখানে জাতি শোক বিহ্বল সেখানে শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত ছিল। ডা: মইন উদ্দিন একজন করোনা যোদ্ধা। তিনি কোন পরিস্থিতিতে মৃত্যু বরণ করেছেন? তাঁকে কেন অস্ত্র ছাড়া করোনা মাঠে লড়াই করতে হল ? রাষ্ট্র ডাক্তারদের কী কী নিরাপত্তা দিতে পেরেছে ? এখানে আমাদের ব্যর্থতা কী কী? আমাদের এ দৈন্যতাকে আগে তুলে ধরা দরকার।

এই যুদ্ধে সাংবাদিকের কলমও করোনা যুদ্ধের অস্ত্র। যুদ্ধ ক্ষেত্রে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে না পারলে সাংবাদিকদেরও আগামী প্রজন্ম ক্ষমা করবেনা।

জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে কোন দলীয় পরিচয় নয়। ডাক্তার ডাক্তারই , রোগী রোগীই । আসুন এই দু:সময়ে আমরা সবচেয়ে বড় পরিচয়ে পরিচিত হই , আমি একজন মানবিক মানুষ। আমি একজন করোনা বিরোধী যোদ্ধা। নিজেকে বাঁচতে হবে। জাতিকে বাঁচাতে হবে।

তাই বলতে চাই ‘ এ গানের কলিগুলোতে ভরসা পাই –

“দেশ মানে কেউ ভোরের স্লেটে লিখছে প্রথম নিজের নাম
হাওয়ার বুকে দোলছে ফসল একটু বেঁচে থাকার দাম।

সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তাঁরায় সত্যি হোক
আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক।”

(বি: দ্র: সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে পাশে থাকুন)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •