আবু আজাদ, জাগো নিউজ:
কয়েক ঘণ্টা আগেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর সংবাদ পেল চট্টগ্রাম। এর আগে করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় রোগী শনাক্ত হয় নগরের চকবাজার থানার দামপাড়ায়। দ্বিতীয় দফায় হালিশহর, পাহাড়তলী থানার সাগরিকা ও সীতাকুণ্ড পৌর এলাকায় শনাক্ত হয় আরও তিনজন। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) তৃতীয় দফায় কোতোয়ালী থানার ফিরিঙ্গি বাজার, আকবর শাহ থানার ইস্পাহানী গেট ঝোলারহাট এলাকায় দুইজন ও পাহাড়তলী থানায় একজন। অর্থাৎ নগরের ১৬টি থানার মধ্যে ৭টি থানার এলাকাতেই করোনা রোগী পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এখনই যদি চট্টগ্রাম শহর লকডাউন না করা হয়, তাহলে আরও একটি নারায়ণগঞ্জ দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।’

তবে চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পর্যন্ত লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কেউ বলছেন, চট্টগ্রাম লকডাউনের এখতিয়ার তাদের নেই। অপরজন বলছেন, বিভাগীয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত তারা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নগরের অভ্যন্তরে বেশ দাপট দেখালেও প্রবেশ পথগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। আর এতেই প্রতিদিনই করোনা ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়েই হাজারো মানুষ বন্দরনগর ছাড়ছেন।

চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্তদের একজন সুপারশপের বিক্রয় প্রতিনিধি, একজন তরকারি বিক্রেতা, একজন কাঠ ব্যবসায়ী, একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, একজন পোশাক শ্রমিক, একজন বৃদ্ধ ও একজন গৃহবধূ। এদের চার জনের বয়স ২০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে, চার জনের বয়স ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ও অপর দুইজন ৫৬ ও ৬০ বছর বয়সী।

উপরের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, প্রতি মুহূর্তেই করোনার সামাজিক সংক্রমণের সংখ্যা, মাত্রা, পরিমাণ, পরিধি বাড়ছে। চট্টগ্রামে নতুন করে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে একজন বাদে আর কারও বিদেশ থেকে আগতদের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস নেই। সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের, ভিন্ন ভিন্ন বয়সের ও ভিন্ন ভিন্ন পেশার লোকজন করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়ার মানে হলো- চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে। সামাজিক সংক্রমণের এই বিস্তার খুব দ্রুতই ঘটছে।

নগরে এমন চার ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন যারা এর আগে হয়তো এই নগরের কয়েক হাজার মানুষর সংস্পর্শে গিয়েছেন। বিশেষ করে সবজি বিক্রেতা, পোশাক শ্রমিক, কাঠ ব্যবসায়ী ও সুপারশপের বিক্রয় প্রতিনিধি। এ অবস্থায় ওইসব ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা ও কোয়ারেন্টাইন বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইতোমধ্যেই বন্দরনগরে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় শহরের মানুষের গ্রামে ফেরা ঠেকানো না গেলে খুব দ্রুতই চট্টগ্রামের উপজেলাও আশপাশের জেলাগুলোতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে, চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে আরও একটি নারায়ণগঞ্জ।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরোপুরি না হলেও এই মুহূর্তে চট্টগ্রামকে আংশিক লকডাউন করা প্রয়োজন। অন্তত পক্ষে এলাকাভিত্তিক লকডাউন হতে পারে।’

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া মনে করেন, ‘করোনার বিস্তার বন্ধে এখনই চট্টগ্রাম মহানগরকে পুরোপুরি লকডাউন করতে হবে। এছাড়া লকডাউন চলাকালে শহরের বাসিন্দাদের খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এখনই যদি আমরা লকডাউনে না যাই তাহলে আগামী এক সপ্তাহ পর লকডাউন করার কোনো জায়গা বাকি থাকবে না। আর গ্রামে করোনার মতো মহামারি ছড়িয়ে গেলে দেশে কী ঘটবে তা আমি ভাবতেই শিউরে উঠছি।’

মূলত লকডাউনের সিদ্ধান্ত যারা নেবেন তারাই এখন করোনা পরিস্থিতি নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থায় আছেন। চট্টগ্রামে করোনা মোকাবিলায় রয়েছে তিনটি আলাদা কমিটি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির দায়িত্বে আছেন- সিটি করপোরেশনের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, জেলা কমিটির দায়িত্বে আছেন- চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন ও বিভাগীয় কমিটির দায়িত্বে আছেন- চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। কিন্তু এতসব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কেউ বলতে পারছেন না করোনার এই ভয়াল পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগর লকডাউন করা হবে কি না!

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর লকডাউন হবে কি না এ বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। আসলে নগর ছাড়াও আমাকে আরও ১১টা জেলার বিষয়ে দেখতে হয়। মূলত হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনার দিকটা আমি খেয়াল রাখছি। লগডাউনের বিষয়টিতো আইনশৃঙ্খলাবাহিনী দেখার কথা।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর লকডাউনের কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নেইনি। আর লকডাউন হবে কি না এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। এ সব বিষয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী দেখার কথা। আপনি মেয়র ও মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে কথা বলুন।’

এ বিষয়ে জানতে শনিবার দিনভর দফায় দফায় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুবর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ‍রিসিভ করেননি।

চট্টগ্রামের শীর্ষ কর্তাদের এই অবস্থা নিয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে আমাদের দায়িত্বশীলদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বলতে কিছু নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কোনো বিষয়ে বলবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজে থেকে কিছু করার প্রয়োজন অনুভব করেন না। নয়তো একটি নগর প্রতিমুহূর্তে যেখানে করোনার সেন্ট্রাল সেল হেয়ে উঠেছে, সেখানে এখনও কেন লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তারা।’

তিনি বলেন, ‘কৌশলগত কারণে এই নগরের অবিভাবক সিটি মেয়র। কিন্তু এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। জেলা প্রশাসকের প্রধান দায়িত্ব জেলার সুরক্ষা দেয়া। নগর থেকে মানুষ উপজেলায় গেলে কী হবে সেটা নিশ্চয় তিনি বোঝেন। তবুও কেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আইন মানানোর দায়িত্ব মেট্রোপলিন পুলিশের, কিন্তু তারা কীভাবে করোনা আক্রান্ত একটি শহরের মানুষকে শহর থেকে বের হয়ে যাওয়া অ্যালাউ করছেন তা কোনোভাবেই বুঝে আসছে না।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •