অধ্যাপক আকতার চৌধুরী

(৭ম পর্ব)

৮ এপ্রিল কক্সবাজারকে ‘লক ডাউন’ ঘোষণা করেছেন জেলা প্রশাসক । কয়েকদিন যাবৎ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ‍ও নেটিজেনরা দাবী করে আসছিলেন ‘লক ডাউন’ ঘোষণার। লক ডাউন ঘোষণাতে জেলা প্রশাসক প্রশংসিতও হচ্ছেন। কক্সবাজারকে অনেকটা সুরক্ষিত মনে করা হচ্ছে। গতকাল রাতে ২জনকে করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ও বাড়ীঘর লক ডাউন করা হয়। এদের একজন কক্সবাজার শহরের বৈল্লা পাড়ার এমবিবিএস পড়ুয়া ছাত্র। মাত্র কদিন আগে ঢাকা থেকে বাড়ীতে এসেছে। অপরজন উপসর্গ নিয়ে  কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনার আবদুস শুক্কুর (৬৫) লুকিয়ে ছিলেন উখিয়ার জালিয়া পালং পান্যাসিয়ায়। সে বাড়িটাও লক ডাউন করা হয়। আজ ৯ এপ্রিল সকালে ১ শিশুকে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি করা হয় । তবে সুখের বিষয়যে গত ২৪ ঘন্টায় এই ৩জনসহ ২৭ জনের করোনা টেস্টে সবাই নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। গত ১ সপ্তাহে প্রায় ১০০ জনের টেস্ট করা হয় । সবাই নেগেটিভ। এতে আমরা আশার আলো দেখছি।

নতুন করে দেশে ১১২ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১ জন।এনিয়ে দেশে করোনা মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩০ জন আর করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২১ জন।

২৪ ঘণ্টায় আরও সাড়ে ছয় হাজার প্রাণ কেড়ে নিলো করোনা ভাইরাস। সারাবিশ্বে মৃতের সংখ্যা ৮৯ হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। প্রতি মিনিটে সংক্রমিত হচ্ছেন ৫৯ জন। গেলো কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় বুধবারও, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু দেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় । আমরা প্রতিদিন করোনার বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী রূপ দেখছি। এটা সবার উপরে একটা মানসিক প্রভাব পড়ছে। অনেকে দেখতে দেখতে মানসিক রোগে ভুগছে। সুস্থ মানুষগুলোও করোনা ভয়ে ভীত হচ্ছেন। এর থেকে পরিত্রাণে পরিবার কেন্দ্রীক সচেতনতা বাড়ানো দরকার । আত্ম বিশ্বাস বাড়ানো দরকার । যারা এসব দেখে এক ধরনের ফোবিয়ায় ভোগছেন তাদেরকে এসব দেখতে না দেয়া ভাল বলে মনে করি। আমাদের ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে অবশ্যই মানসিক শক্তিও অটুট রাখতে হবে। পরিবারগুলোতে শিশু ও মহিলাদের উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়ছে। তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এর থেকে সৃষ্টি হচ্ছে গুজব । গুজবের প্রধান শিকার মহিলারা । গতকাল শুনলাম সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজন মরিচ বাটার শীলা ও পোতা নিয়ে মেতে উঠেছে। যে ঘরে শীলার উপর পোতা দাড় করাতে পারবে সে ঘরে করোনা হানা দেবেনা এমন একটি ধারণা থেকে বাড়ির মহিলারা ট্রাই করে দেখতে মেতে উঠেছে। অনেকে সফল কামও হচ্ছে । তাদের মনে বিশ্বাসও জন্মেছে এরা করোনা মুক্ত থাকবে! তবে সুখের বিষয়যে সনাতনী সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও কুসংস্কারমুক্ত লোকজন এগিয়ে এসেছেন তাদের ভুল ভাঙ্গাতে।

গত ২৬ মার্চ ও এমন একটি কান্ড ঘটে গেল কক্সবাজারে। রাত ১১টায় শুনলাম আজান। বুঝতে পারছিলামনা হঠাৎ আজান কেন। আমার স্ত্রী এসে জানাল , তারা সবাই ৪ তলা থেকে নিচে নেমে খোলা জায়গায় চলে যাচ্ছে। ব্যাপারকি জানতে চাইলে বলল, রাত ১২টায় ভূমিকম্প হবে , তাই নেমে যাচ্ছে! আমি যাব কিনা জিজ্ঞেস করাতে বললাম, তোমরা যাও আমি পরে আসছি। রাত ১২টা পার করে বাড়ির মেয়েরা উপরে চলে আসল। কিন্তু ভূমিকম্প হলনা। বোকামীর জন্য নিজেরা লজ্জা পাচ্ছিল। বউকে বললাম ভূমিকম্প কাউকে বলে কয়ে আসে এমনটি কখনো দেখেছ? তারপরও তার উত্তর – সাবধান থাকতে ক্ষতি কী !

এদিকে আজান নিয়ে ফেসবুকে তোলপাড়। কেউ কেউ বলতে লাগল দেশ ব্যাপি সিদ্ধান্ত হয়েছে মহামারী তাড়াতে আজান হয়েছে। এরকম আগেও হয়েছে। কেউ কেউ রাতের বেলা নারিকেল গাছ দেখতে সাদা সাদা লাগছে এমন ছবিও ফেসবুকে পোষ্ট করল। ছত্রাক ধরে নারিকেল গাছ সাদা দেখাচ্ছে। এগুলো অশনি সংকেত হিসেবে মনে করল অনেকে! মহামারী হোক বা অন্য কিছু , মসজিদে ৫ ওয়াক্তের বাইরে অসময়ে আজান দিতে হলে ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্যে করা দরকার এবং মানুষকে এ বিষয়ে আগে থেকে জানানো দরকার। রাষ্ট্রেরও সম্মতি থাকা দরকার। নচেৎ গুজব থেকে আতংকের সৃষ্টি হয়ে যে কোন বিপদ ঘটে যেতে পারে।
ঐদিন যা হল অবশ্যই চিন্তার ব্যাপার। আজান কল্যাণের আহবান। মানুষকে আতংক সৃষ্টি করার মাধ্যম নয় । সবাই যদি জানত কল্যাণের আহবানে সাড়া দেয়ার সুযোগ ছিল। বিভ্রান্ত হত না । যারা আজানের প্ল্যান করেছে তারা হয়ত বিভ্রান্ত হয় নাই । কেউ কেউ মনে করেছে রাত ১২টায় ভূমিকম্প হবে তাই আগে আজান । যারা ঘুমে ছিল তাদের টেনে ঘর থেকে বের করে রাস্তায় নামাল। কেউ মনে করেছে নারিকেল গাছে সাদা সাদা দাগ পড়ায় অমঙ্গলের ছায়া থেকে মুক্তির আজান ।
টেকনাফে মসজিদে আজানের কারণ জানাল , কক্সবাজারে এক পরিবারে বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর পর কথা বলা শুরু করেছে। বলছে “আমি বেশি সময়ের জন্য আসিনি একটি খবর দিতে এসেছি মাত্র । খবরটি হলো মহামারী করোনা থেকে বাঁচার জন্য কোন ওষুধ আবিষ্কার হয়নি তাই সবাই যেন চিনি ও লবন ছাড়া চা পাতা দিয়ে রং চা খায়!

একই সময়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওলু ধ্বনি । আবার করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বাতি বন্ধ করে মোমবাতি জ্বালিয়ে পূজা করতে গিয়ে গেল ঘর পুড়ে। আরো কত কিছু ঘটে গেল এ থেকে। বিশ্বে করোনা থেকে বাচতে কেউ কেউ মদ,গো মুত্র,উটের মুত্রের পাশাপাশি দেশে রং চা , থানকুনি পাতা,কালি জিরা খাচ্ছে । করোনা ভাইরাসকে নিয়ে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে আরো কতধরনের গুজব সৃষ্টি হয় আল্লাহ ভাল জানেন । তবে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী যে কোন বিষয়কে গ্রহণ করার আগে ভালভাবে যাচাই বাছাই করা দরকার বলে মনে করি। এরকম বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বলতে ইচ্ছে হয় , করোনা ভাইরাসও গুজব ভাইরাসে আক্রান্ত! আল্লাহ আমাদের হেদায়েত করুন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •