প্রিয় দেশবাসী,
আমি ডাঃ এম মিজানুর রহমান বলছি। আমার সালাম ও শুভেচ্ছা নিবেন।
জানি, আপনারা এমন পরিস্থিতিতে ভালো নেই। চারদিকে উৎকন্ঠা!
সুনশান-নিস্তব্ধ রাস্তাঘাট, ছদ্মবেশী কারফিউ চারদিকে, পৃথিবীর সবকিছুই আজ স্থবির। বিমানের বদলে আকাশে উড়ছে পাখিরা! কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের হানা পাক্কা তিন দশক পর!
কলকারখানার বিদঘুটে শব্দ কানে বাজছে না। যুদ্ধের দামামার মত ভেসে আসছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন!
মনে হচ্ছে আরও একজন করোনা’র আঘাতে বশীভূত! সংখ্যাটা বাড়ছে,জ্যামিতিক হারে! করোনা’র তীরগুলোর নিশানা নিখুঁত হচ্ছে,অদৃশ্য শত্রুর এমন আক্রমণে আমাদের সামরিক ঘাঁটি গুলো আজ হতবিহ্বল। সময় এসেছে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে আক্রমণ প্রতিহত করার! সামাজিক দুরত্ব যেমন কোলাকুলি না করা ,হাতে হাত না মিলানো, পরস্পরের বাড়ি বাড়ি না যাওয়া এসবই আপনার অস্ত্র করোনা’র বিরুদ্ধে।
জানি, এমন বিচ্ছিন্নতায় পেটে ঠিকমত ভাত যাচ্ছে না। স্নায়ু গুলো কাজ করছে না।
বাচ্চাগুলো কান্না করছে, চকোলেট -চিপস ,পারছেন না দিতে।
আপনজন কে হারানোর ভয় পাচ্ছেন। যুদ্ধটা শেষ হোক। হাসিমুখে আমরা আবার উল্লাসে মেতে উঠবো!
বৈশাখের “মেলায় যায় রে “গান শুনবো উচ্চস্বরে।
আপনারা হয়ত,আমাদের গালি দিচ্ছেন, গালি দেওয়া ছাড়া উপায় ও নাই। আমাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো সমষ্টিগত ছিলো না। রাষ্ট্র চেষ্টা তো করেছে!
কিন্তু কৌশলী করোনা রাতের আধারে এই সোনার বাংলায় আক্রমণ করে ফেলেছে! পৃথিবী চষে বেড়িয়ে এখন বাংলার দিকে গোলাবারুদ থাক করছে।
এটা একটা যুদ্ধ অবস্থা, করোনা ভাইরাস সাংঘাতিক ভয়ংকর ছোঁয়াছে। নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায় প্রদশর্ন করছে।পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্পর্কও মুহুর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
আপনারা জানেন, ক্ষণে ক্ষণে তার কৌশল বদলাচ্ছে। আমরা ডাক্তার রা একেকটা যোদ্ধা। আমাদের সাথে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
যুদ্ধে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমরা মৃত্যু কে ভয় পাই না। আমরা আমাদের পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিছি। বৃদ্ধ-বাবা মাকে অনেকদিন সামনাসামনি দেখিনি। ছোট বোন টা এসএসসি পরীক্ষা দিলো,অনেক আবদার করছিলো,আমার কাছে সিলেটে বেড়াতে আসবে,আমি না করেছি। জানিনা আবদার রাখতে পারবে কিনা আদৌ!
আমরা জিততে চাই। দেশবাসীকে রক্ষা করতে চাই,যা আছে, তা দিয়েই।
১৯৭১ এ-র ইতিহাস আমরা বুকে ধারণ করেই সাহস পাই,সাহস সঞ্চার করি অবিরত। আমরা কাপুরুষ নই। বীরচিত্তে আমরা লড়াই করে যাবো। কোভিড-১৯ কে পরাজিত করতে হবে এ-ই আমার ব্রত!
এই যুদ্ধ টা শুধু বাঙালীর একার নই, সারা পৃথিবীর।
করোনা’ সারা পৃথিবীর মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করছে।
এখন শুধু শত্রুকে মোকাবিলা করার সময়। আমাদের শত্রু করোনা ভাইরাস । যে যেভাবে আছেন,শত্রুকে মোকাবিলা করেন। আমরা হারতে চাই না।
আমরা একটা বিন্দুও পিছপা হবো না,যতক্ষণ এই দেহে এক ফোঁটা রক্ত আছে।
করোনা বুদ্ধিমান, বেসামরিক লোককে বশে এনে হিপনোটাইজ করে,আমাদের শত্রু বানিয়ে দিচ্ছে।
সে মানবজাতির শত্রু, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিছু বুঝে না,মানুষ পাইলেই সে বড্ড খুশি।
আপনাদের বোকামির জন্যে ,তার কৌশলের ফাঁদ বুঝতে পারছেন না। রাস্তাঘাটে, আড্ডা দিচ্ছেন।
করোনা যুদ্ধে আমরা ডাক্তার রা সামরিক বাহিনীর মত। করোনা’র বোমার আঘাতে, সামরিক বেসামরিক উভয়ই আক্রান্ত হবো। আমরা আমাদের সহযোদ্ধাদের ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছি। আমাদের অনেকে যুদ্ধাহত হয়ে বেডে কাতরাচ্ছে। দেশের সকল সরকারী হাসপাতাল খোলা আছে।
ডাক্তার সৈন্যরা ধাপে ধাপে যুদ্ধ ঝাপিয়ে পড়ছে রোস্টার অনুযায়ী। সকল গ্রুপ একসাথে গেলে,শুন্যতা তৈরী হবে।
আমাদের বিজ্ঞ ডাক্তার রা কৌশল দিচ্ছেন,কীভাবে শত্রুকে মোকাবিলা করতে হবে,ওনারা বসে নেই,ওনারা পালিয়ে যায় নি! বিশ্ব সৈনিক রা প্রতিষেধক আবিষ্কারের নেশাই মত্ত। প্রতিনিয়ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি আমরা।
আপনারা ও আঘাতে জর্জরিত হবেন,এটা অনুমেয়। আমাদের দেশের সম্পদ অপ্রতুল, সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে না।
কীভাবে বুঝবেন ?
করোনা আক্রমণ করছে কিনা?-
করোনা আক্রমণ করে শ্বাসতন্ত্রে। একবার ঢুকতে পারলেই,অক্সিজেন -কার্বন ডাই অক্সাইড বিনিময় প্রক্রিয়া অকেজো করে দেয়। রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়,ল্যাকটিক মেটাবোলিজম বেড়ে যেতে যায়,যার কারণে মাংসপেশিতে ব্যাথা অনুভব হতে পারে।
আর আক্রমণের সাথে ২-১৪ দিনের মধ্যে শরীরের রাডার সিস্টেম সংকেত দেয় তাপমাত্রা বাড়িয়ে, যাকে জ্বর বলছি।
আর যাদের শরীরের এই রাডার সিস্টেম অকেজো,তাদের জ্বর নাও হবে পারে। সেক্ষেত্রে পাতলা পায়খানা দেখা দিতে পারে।
প্রিয় দেশবাসী,আপনারা আমাদের সাপোর্ট দিন, সহযোগীতা করুন। এটা পরস্পরের সমালোচনা নই,যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার সময়।
আমাদের মানসিক সাহস যোগান। কবি নজরুলের মত, জহির রায়হানের মত বিদ্রোহী কবিতা-গান লিখেন।
আপনাদের প্রতি অনুরোধ -শুধু ৪ টি নিয়ম মেনে আপনি এবং আপনার পরিবারকে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত রাখতে পারেনঃ এই যুদ্ধে জয়ী হতে-
(১) নাক, মুখ ও চোখে হাত দিবেন না
(২) প্রতি ঘন্টায় ১/২ বার ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধোন
(৩) অতি জরুরী কাজ ছাড়া সার্বক্ষণিক বাসায় থাকুন
(৪) বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পড়ুন। ঘরে থাকুন, ভাল থাকুন।

বাকি যুদ্ধটা আমরা সামলে নিবো।
মরি বাঁচি,যাই হোক,দেশটাকে বাঁচাবো। দেশের মানুষকে বাঁচাবো ইনশাআল্লাহ। সবাই বলি একসাথে- করোনা যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে।

লেখক-এম মিজানুর রহমান
ইন্টার্ণ ডাক্তার
এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •