মহামারি ভাইরাস করোনায় পুরো দুনিয়া আক্রান্ত। চীনের উহান রাজ্য থেকে উৎপত্তি হয়ে বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আঘাত হেনেছে এই ভয়ংকর ভাইরাসটি। তবে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই ভাইরাসে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ সবকটি উন্নত দেশেই এই ভাইরাসটি বেশি আঘাত করেছে। এতে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে বাড়ছে সংখ্যা। চীন থেকে উৎপত্তি হলেও চীন এখন নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে। বাংলাদেশেও আঘাত হানার পর দিন দিন করোনা রোগী আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে চলছে। এতে আশঙ্কা বেড়ে চলছে।

আমেরিকায় অবস্থান এবং একজন চিকিৎসক হিসেবে কক্সবাজারের স্বনামধ্যন স্বাস্থ্য সেবার প্রতিষ্ঠান হোপ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট, খ্যাতনামা চিকিৎসক ও দাতব্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব কক্সবাজারের কৃতিসন্তান ইফতিখার মাহমুদ মিনারের কাছ থেকে করোনা ভাইরাস নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। মহামারি এই ভাইরাস সম্পর্কে নিজের লব্ধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন বর্তমানে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পরিবার নিয়ে বাস এই চিকিৎসক। অনলাইনে তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কক্সবাজার নিউজ ডটকম-সিবিএন এর চীফ রিপোর্টার শাহেদ মিজান।

সিবিএন: আপনি এই মুহূর্তে করোনায় অধিক আক্রান্ত দেশে আমেরিকায় রয়েছেন। তাই আমাদের চেয়ে আপনারা বেশি ঝুঁকি রয়েছেন। সে সম্পর্কে বলুন।

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: আমি পরিবার নিয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডটা অঙ্গরাজ্যে বাস করি। বর্তমানে আমেরিকার অবস্থায় খুবই ভয়াবহ। আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি এবং তা বেড়েই চলছে। তবে ফ্লোরিডায় মৃত্যুহার বেশি নয়। গতকাল পর্যন্ত এখানে ২৫৪ জন মারা গেছে। নিউইউয়র্কের অবস্থা ভয়াবহ। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে দুই সপ্তাহ পর ফ্লোরিডাসহ অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে আরো ছড়াবে করোনা।

সিবিএন: আমেরিকার করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন।

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: আমেরিকা ধনী রাষ্ট্র, প্রযুক্তিতেও অনেক উন্নত। সে হিসেবে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। হাসপাতাল, ফিল্ড হাসপাতাল, ভ্রাম্যমান হাসপাতালে আক্রান্তদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পাশপাশি প্রচারণা, জনসাধারণকে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সাহায্য করা হচ্ছে। কিন্তু এতো কার্যক্রম এবং প্রস্তুতি সত্ত্বেও আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আগামী কয়েক মাসে আমেরিকায় একলাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞরা। এই আশঙ্কা নিয়ে জনগণ এবং সরকার বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ এতো উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার পরও প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে এতো আক্রান্ত এবং মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছে না।

সিবিএন: ইউরোপ ও আমেরিকায় কেন করোনা বেশি আক্রমণ করেছে সে সম্পর্কে একজন চিকিৎসক হিসেবে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?


ডা. ইফতিখার মাহমুদ:  চিকিৎসক হলেও করোনা নিয়ে আমরা আরো জানার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেননা আমেরিকা ও উন্নত দেশগুলোতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার এতো বেশি কেন। এই বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই নিয়ে গবেষণা চলছে। আমার মনে হয় এখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যাপারটা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাধারণত, অনুন্নত দেশগুলোর মানুষের সংক্রমণ রোগের প্রকোপ বেশি। তার কারণ সেখানে অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্নতা বেশি। কিন্তু সেগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে নিতে তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। তা কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মানুষের তা হয় না। সে কারণে আমেরিকা ও উন্নত দেশগুলোতে করোনা প্রকোপ বেশি হয়েছে।

সিবিএন: বাংলাদেশের করোনার বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং আসন্ন সময়টাকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: করোনার কারণে বাংলাদেশ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা লোকজনের ঘনত্বের কারণে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার বেশ আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বিশেষায়িত হাসপাতালে অভাব, অপ্রতুল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিও)। তার সাথে বিশ^জুড়ে করোনা আরো বিস্তার লাভ করছে। সে বিবেচনায় বাংলাদেশেও বিস্তার বাড়তে পারে। তবে সরকারের নির্দেশনা মতো পুরোপুরি লকডাউনসহ সাস্থ্য সম্পর্কিত সব নিয়মকানুন শতভাগ মেনে চললে প্রকোপ কমানো যেতে পারে।

প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের জন্য সাগ্রমিকভাবে দেশের জেলা পর্যায় থেকে মূল প্রস্তুতি কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক আলাদা করে লকডাউন করলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যাবে। একই সাথে জেলা পর্যায়ে বেশি সংখ্যক ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে সেখানে আইসোলেশন এবং কোয়ারাইন্টাইন ব্যবস্থা করা। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। সেগুলোকে ফিল্ড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। লোকজনকে ঘরে আবদ্ধ রাখা, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নির্দেশনাগুলো পালনে প্রশাসনিক কড়াকড়ি করতে হবে। জেল প্রশাসনের সাথে অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি ও দাতা সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের করোনার প্রকোপ কমানো যাবে বলে আমি আশা করছি।

আমার পর্যবেক্ষণ গত দুই দশকে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে আরো উন্নয়ন দরকার। বিশেষ করে আধুনিক যুগের সাথে তাল মিয়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে হবে।

সিবিএন: রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে কেমন ঝুঁকি রয়েছে?

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি। তবে পরিশ্রমী হিসেবে এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকবে। এছাড়া এই জনগোষ্ঠী যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে এবং শুধুমাত্র নির্দিষ্ট লোকজন তাদের সেবার জন্য ক্যাম্পে যেতে পারছে সেকারণে বলা যায় রোহিঙ্গার কারণে খুব বেশি ঝুঁকি নেই। তবে কোনো কারনে সংক্রমণ হলে পুরো বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপর্যয় হবে। এই আশঙ্কা হ্রাস করতে এই জনগোষ্ঠীর একজনও যেন কোথাও বের হতে না পারে সে জন্য অত্যন্ত কঠোর হতে হবে এবং যারা সেবা দিতে যাবেন তাদেরও সুরক্ষিত থাকতে হবে।

সিবিএন: করোনা রোধে আপনার প্রতিষ্ঠান হোপ ফাউন্ডেশন কি কি কার্যক্রম চালাচ্ছে?

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: করোনা প্রকোপের শুরু থেকেই হোপ ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করে। হোপ হসপিটাল এবং হোপ ফিল্ড হসপিটালে করোনার জন্য আলাদা ইউনিট তৈরি, সব কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, টেলি চিকিৎসা সেবা চালু, ২৪ ঘন্টার হটলাইন চালু, ভ্রাম্যমান মেডিকেল টিম গঠন করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান, রোগী ও জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সরঞ্জাম ও অসহায়দের জন্য খাদ্যপণ্য বিতরণ করছি।

সিবিএন: বিভিন্ন বিশ্ব মিডিয়া খবর প্রকাশ করেছে- করোনা ভাইরাসটি চীনের তৈরি জীবানু অস্ত্র, এটার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: মিডিয়ার খবরে আমিও জেনেছি করোনা ভাইরাস চীনের তৈরি জীবানু অস্ত্র। তবে বিশ^াসযোগ্য কোনো তথ্য বা সূত্র নেই এখন পর্যন্ত। আমি নিজেও কোনো সূত্র থেকে এর সত্যতা পাইনি। সুতরাং এ ব্যাপারে নিশ্চিত মন্তব্য করা যাবে না। যদি তা হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিত সে গোমর ফাঁস হবে। তবে এই মুহূর্তে আমদের করোনা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

সিবিএন: আপনাকে সিবিএন এর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

ডা. ইফতিখার মাহমুদ: এই দূরপ্রবাস থেকে আমার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা জন্য আমিও সিবিএনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সাথে আমার বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনেক শুভ কামনা। সবাই বাড়িতে থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10158420340705159&id=785025158

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •