মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বলবে, Stay home, তখন রাষ্ট্রকে নাগরিকদের জন্য অন্তত খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে। এটা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক, মৌলিক, জন্মগত ও রাষ্ট্রীয় আদেশের কারণে জন্মনেয়া অধিকার।

এ পর্যন্ত Stay home চলাবস্থায় খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা কি দেশের সব নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র সুনিশ্চিত করতে পেরেছে? যেখানে রাষ্ট্রীয় আদেশের বৈপরীত্যে, রাষ্ট্রের অবস্থান হবে, সেখানে আইনের প্রয়োগ প্রক্রিয়া আপনাআপনিই দুর্বল হয়ে যাবে। সরকার কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হবে।

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের হাত পা বেঁধে অথৈ পানিতে ফেলে দিয়ে বলবে, এবার সাঁতার কাটো। বলা হবে, এটা তোমার কল্যানের জন্য। কিন্তু সেটা কি কখনো সম্ভব?

সেজন্য পেটের দায়ে গৃহ ছেড়ে রাস্তায় বের হওয়া মানুষকে আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রহার করাকে রাষ্ট্রের কোন মানুষ মোটেও স্বাভাবিকভাবে নেননি।

আমি বিষয়টা কক্সবাজারের জনসংখ্যা নিয়ে একটু উদাহরণ দেই, তাহলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। কক্সবাজার জেলায় মোট জনসংখ্যা ২২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৯৯০ জন (রোহিঙ্গা শরনার্থী ব্যতীত)। যদি গড়ে প্রতি ৫ জনে একটি পরিবার ধরা হয়, তাহলে জেলায় মোট ৪ লক্ষ ৫৭ হাজার ৯৯৮ টি পরিবার রয়েছে। কক্সবাজারে যেসব পরিবার উচ্চ বিত্তের সীমারেখার উপরে আছেন, এরকম পরিবারের সংখ্যা সর্বোচ্চ ‘৫০% এর কম। তারপরও এর সংখ্যা ‘৫০% ধরলে তারা মোট ২২৮৯ পরিবারের বেশী নয়। যারা উচ্চ বিত্ত, তাদের সংখ্যা ৩% এর বেশী নয়। অর্থাৎ ১৩৭৪০ পরিবার। উচ্চ মধ্যবিত্ত যারা তাদের সংখ্যা ৬’৫০% এর বেশী নয়। অর্থাৎ ২৯৭৭০ টি পরিবার। উল্লেখিত ৩ ক্যাটাগরীর পরিবার মোট ৪৫৮০০ টি।

আর সবাই মধ্যবিত্ত, নিন্ম মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত এবং দুঃস্থ, নিন্ম আয়ের, ছিন্নমূল, ভবঘুরে পরিবার। অর্থাৎ এসবের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ন্যুনতম ৯০%। এদের পরিবারের মোট সংখ্যা ৪ লক্ষ ১২ হাজার ২০০ টি। কক্সবাজার জেলায় এই সব পরিবারই বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস জনিত আকস্মিক পরিস্থিতির শিকার। এখানে নিন্মবিত্ত, ছিন্নমূল ও নিন্ম আয়ের লোকজন কোন রকমে ত্রাণ সহায়তা সহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা পেলেও একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছেন, সমাজের বৃহৎ শ্রেণী মধ্যবিত্ত ও নিন্ম মধ্যবিত্তরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্ম মধ্য বিত্তের চরম দুর্ভোগ ও অসহায়ত্বের কথা প্রতিদিন ফুটে উঠছে অহরহ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও মধ্যবিত্ত ও নিম্ম মধ্যবিত্তের চরম দুর্ভোগের কথা ভিডিও কনফারেন্সে বলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র কি গত ১৯/২০ দিন সাধারণ ছুটি চলাকালীন এই ৪ লক্ষাধিক পরিবারের কাছে খাদ্য সহায়তা দিতে ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পেরেছে? কখনো পারেনি। সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে পুরো জেলায় এখনো সর্বোচ্চ ২৫ হাজার পরিবারকে হয়ত খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাও আবার মাত্র কয়েকদিনের জন্য। তার হিসাব ত্রাণ বিতরণের সমন্বয়কারী কার্যালয় হিসাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে নিশ্চয়ই আছে। আর চিকিৎসা সেবা, সেটা তো স্বাভাবিক অবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই করোনা ভাইরাস জনিত সংকটে নাগরিকদের জন্য এই চিকিৎসা সেবা পাওয়া একেবারে সোনার হরিণ।

একজন নাগরিকের ৫ টি মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। যেটা এখন আকস্মিক সাধারণ ছুটি জনিত আদেশগত অধিকারে পরিনত হয়েছে। অধিকার সমুহ হলো-যথাক্রমে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। তারমধ্যে আমি বস্ত্র, শিক্ষা ও বাসস্থানের কথা এখন বলছিনা। করোনা ভাইরাস জনিত মহাসংকটে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের জন্য শুধু খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার কথা বলছি। আমি বলছি না, Stay home বলার সাথে সাথে কানাডা, স্পেন, ইটালি, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বা অন্যান্য চলমান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বিশ্বের আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের মতো লকডাউন চলাবস্থায় বহুমুখী নাগরিক সুবিধা দিতেই হবে। নাগরিকদের জন্য কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানির ব্যবস্থা করতে হবে, এ কথাও বলছি না। আমি বলছি, কোন রকমে ‘ডাল-ভাত’, তাও না পারলে শুধু ‘নুন-ভাত’ এর ব্যবস্থা করতে।

ভয়াবহ করোনা ভাইরাস সংকট কাটাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছেন, সে অর্থের অধিকাংশই নাগরিকদের খাদ্য ও চিকিৎসা সেবায় ব্যয় করা যেতে পারে। নাগরিকদের কল্যানে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের কল্যানের জন্য নাগরিক নয়। নাগরিক বাঁচলেই রাষ্ট্র দরকার, নাগরিক না থাকলে রাষ্ট্র কিসের জন্য। নাগরিক বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের উন্নয়নে সবকিছু করা সম্ভব।

রাষ্ট্রের উচিত হবে, দেশের সকল কম গুরুত্বপূর্ণ, বিনোদনধর্মী, বিলাসী, একেবারে জরুরি নয় ও বিলম্বে বাস্তবায়ন করলে চলবে, এমন প্রকল্পের অর্থ কাটছাট করে করোনা ভাইরাস জনিত সাধারণ ছুটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। ফটোসেশন বা কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, মিডিয়ার শিরোনাম হওয়ার জন্য নয়। রাষ্ট্রের শতভাগ নাগরিকের বাড়িতে বাড়িতে খাদ্য পৌঁছান। তাহলেই Stay home এর সফলতা ও সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত হবে। তখন মানুষ নিজে বাঁচতে ও অপরকে বাঁচাতে বাড়ি-ঘরে অবস্থান করবে ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখবে। রাষ্ট্রের আইনের প্রয়োগ সহজ হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও নাগরিকদের কল্যানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিলম্ব করলে তার চরম মাশুল দিতে হতে পারে। ক্ষুধার যন্ত্রণা অসহ্য যন্ত্রণা। এই ক্ষুধার যন্ত্রণা দিনের পর দিন সইতে না পেরে, হয়ত মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে আসবে। তখন হাজার হাজার মানুষ ডাইনী করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মরতে থাকবে। কোথায় Stay home, কোথায় সামাজিক দূরত্ব, কোথায় আইন। সবকিছু ভেঙ্গে পড়বে। আর সেজন্য দোষারোপ করা হবে রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অব্যবস্থাপনাকে।

যার ন্যায্য হক, তার কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে উপকারভোগীর ছবি সহ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। নিঃসন্দেহে হীনমন্যতার বর্হিপ্রকাশ। নাগরিকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেকে জাহির করার এধরণের অসুস্থ ও ঘৃন্য প্রতিযোগিতা করার সময় এখন নয়।

সাধারণ ছুটি দিয়ে Stay home আগামী ২ মে পর্যন্ত আপাতত দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সুত্রে জেনেছি। এরপর আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাহলে এত দীর্ঘ সময় মানুষ গুলো কিভাবে বাঁচবে। রাষ্ট্রকে সেটা এখনই চিন্তা করতে হবে, সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে।

এখন রাষ্ট্র ত্রাণ সহয়াতার নামে যা করছে, সেটাতে মনে হচ্ছে, এটা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের এক ধরনের করুনা বা দয়া। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র কি জানেনা এটা নাগরিকদের মৌলিক, সাংবিধানিক ও আদেশগত অধিকার।

দিনের উপার্জন দিয়ে চলা রাষ্ট্রের প্রায় ৮৫% ভাগ নাগরিকই এখন Stay home এর আকষ্মিকতায় পরিস্থিতির শিকার হয়ে চরম অসহায়ত্বে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, তারা ভিক্ষুক নয়। পরিস্থিতির আকস্মিকতার শিকার।

সোজা কথা, চলমান করোনা ভাইরাস জনিত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে আরো অনেক বেশী মানবিক, উদার ও ত্যাগী হতে হবে। নাগরিক বান্ধব পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কঠিন হলেও নির্মম বাস্তবতাকে আরো স্বহৃদয়তার সাথে উপলব্ধি করতে হবে। মাঠ প্রশাসন কে তৃনমুলের প্রকৃত অবস্থা কেন্দ্রে জানাতে হবে নিঃসংকোচে, অকপটে। যাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা সময়োপযোগী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়। নতুবা সংকট আরো প্রকট থেকে প্রকট আকার ধারণ করবে। আল্লাহ না করুন, এমনটি হলে তখন চরম খেসারত দিতে হবে দেশ ও জাতিকে।

(লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।)

(এটা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর দায় দায়িত্ব সম্পূর্ণ লেখকের।-সিবিএন)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •