মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

ভয়াবহ করোনা ভাইরাস জনিত পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের জেলার কমবেশি সবাই খাদ্য সংকট সহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছে। এ সংকটে কক্সবাজারের সুপ্রিয় জেলা প্রশাসক তৃনমুল পর্যায়ে গিয়ে প্রায় সকল শ্রেণি পেশার মানুষের খবর নিচ্ছেন। প্রশাসনিক শত ব্যস্ততা সত্বেও অনেকক্ষেত্রে তিনি স্বশরীরে গিয়ে পেশাজীবীদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। তাঁর এ উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে সর্বত্র।

কিন্তু একটি পেশার মানুষ, যাদের এখনো খুব একটা কেউই খোঁজ খবর নিতে পারেননি। তারা হলেন, মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেম। তাঁরা সকলেই দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁরা প্রায় সকলেই ন্যুনতম বেতনে মসজিদ গুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার জানা, কয়েকটি মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেন ও খাদেমদের মাসিক বেতনের পরিমান বললে তা হাস্যকর হবে বলে বলছিনা। জেলার প্রায় ৯৭% ভাগ মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেন, খাদেমদের মাসিক বেতন প্রকাশ্যে বলতে না পারার মতো একেবারে ন্যুনতম। গত ২১/২২ দিন ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠান সমুহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় মসজিদের খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের বাড়তি কিছু নিয়মিত আয়ও বন্ধ রয়েছে। আরো কতদিন ডাইনী করোনা ভাইরাস জনিত ভয়াবহ সংকটে থাকতে হয়, সেটাও সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কিন্তু সারা দেশের মতো কক্সবাজারেও মসজিদ গুলো চালু থাকায় তাদের যথারীতি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে নিয়মিত।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস জনিত সংকটে মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেম গণ আকস্মিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাঁদের অনেকেই এখন অর্ধ্বাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁরা মসজিদের দায়িত্বশীল ও ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম হওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মতো লজ্জায় কারো কাছে হাত পাততে পারছেন না। লজ্জায় কাউকে তাঁদের পরিবারে চরম অভাবের কথা মুখ খুলে বলতে পারছেন না। চলমান করোনা ভাইরাস জনিত সংকটে কারো কাছে ঋন কর্জও চাইতে পারছেননা। সুদের মতো পাপ কাজেও জড়িত হতে পারছেন না তাঁরা। একজন দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত ওলামা হিসাবে বিত্তশালীদের কাছে ধর্ণাও দিতে পারছেন না। নিন্মবিত্তের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সহায়তাও নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় চরম খাদ্য সংকটে পড়ে মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেম গণ প্রায়ই অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অমানবিক আকস্মিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে। অথচ ধর্মীয় অনুশাসন মতে পরিশুদ্ধ সমাজ গঠনে মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেম গণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সমাজে শিষ্টাচার, সভ্যতা, সংস্কৃতির নান্দনিক বিকাশে তাঁদেরই অবদান সমাজে বেশী।

ভয়াবহ করোনা ভাইরাস জনিত সংকটে এর থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য সকলকেই মহান আল্লাহতায়লার কাছে বেশী বেশি করে দোয়া, এস্তেগফার, তাওবা, দরুদ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি ইবাদত করার জন্য শীর্ষ ওলামা মশায়েখ গণ দেশের সম্মানিত নাগরিকদের প্রতি বার বার আহবান জানাচ্ছেন। তারমধ্যে, মসজিদের দায়িত্বশীল এসব সম্মানিত আলেম ওলামাদের দোয়া দরুদের বিষয়টা এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন, কখন কার দোয়া তার দরবারে কবুল হয়।

একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সহ অন্যান্য ধর্মালম্বীদেরও মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাতে অনুরূপ উপাসনা করার জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় পন্ডিতগণ অনুরোধ করছেন বার বার।

কক্সবাজার পৌর এলাকার মসজিদ ভিত্তিক মক্তব গুলোর শিক্ষকদের পৌর কর্তৃপক্ষ মাসিক সামান্য সম্মানী ভাতা দিয়ে থাকেন। সাধারণত মসজিদের খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম, খাদেমেরাই এসব মসজিদ ভিত্তিক মক্তব গুলোর শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মাননীয় জেলা প্রশাসক, আপনি জেনে হয়ত বিস্মিত হবেন, গত ২০ মাস ধরে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মসজিদ ভিত্তিক মক্তব গুলোর শিক্ষকদের এ সম্মানী ভাতা বকেয়া রেখেছেন। হতে পারে হয়ত পৌর তহবিল সংকটের কারণে এ অবস্থা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জামে মসজিদ, এবাদত খানা ও অন্যান্য ধর্মের উপসনালয় গুলোর হালনাগাদ জরীপের তালিকা আছে বলে কক্সবাজার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও গণের কাছেও নিজ নিজ উপজেলার মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের তালিকা থাকতে পারে। কক্সবাজারে বেশ ক’টি ইমাম সমিতিও রয়েছে।
কক্সবাজার ইসলামিক ফাউন্ডেশন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ইমাম সমিতি গুলোর প্রতিনিধিদের সহায়তায় কক্সবাজারের মসজিদ গুলোর খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের একটি তালিকা তৈরী করে তাঁদের কাছে নিরবে মানবিক খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো যায়। যদি সরকারের সীমিত সম্পদের সুষম বন্ঠনের স্বার্থে প্রত্যেককে এ সহায়তা দিতে না পারলেও অন্তত প্রতিটি মসজিদে ও অন্যান্য উপাসনালয়ে অন্তত ২জনের পরিবারকে এ চরম দুর্দিনে মানবিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি সুবিবেচনা করার জন্য বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য স্কুল ‘অরুণোদয়’ এর প্রতিষ্ঠাতা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে বিনীত আবেদন করছি। সরকারিভাবে পুরোপুরি সম্ভব না হলেও ত্রান কার্যে নিয়োজিত এনজিও এর সহায়তায় হলেও প্রস্তাবটা ভেবে দেখার সবিনয় অনুরোধ থাকলো। আশাকরছি, উদার ও মানবিক গুনাবলী সম্পন্ন জেলা প্রশাসক মহোদয় বিষয়টা সহৃদয়তার সাথে ইতিবাচকভাবে গ্রহন করবেন। পাশাপাশি আমার এ লেখাটা সম্মানিত নাগরিকদের কাউকে সম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি না দিয়ে দেখে, এ সংকটে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখার জন্য অনুরোধ করছি।

(লেখক : এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •