অধ্যাপক আকতার চৌধুরী

(৬ষ্ঠ পর্ব)

সামাজিক দুরত্ব আর হোম কোয়ারেন্টাইন নিয়ে বাংলাদেশ একটা চরম সংকটময় সময় পার করছে। এর মধ্যে গত একমাসের করোনা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ দিন আজ ৭ এপ্রিল ২০২০। নতুন শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীর সংখ্যা ৪১ জন । সর্বমোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬৪ জন । ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ৫ জন এবং আজ একজনও সুস্থ হয়ে ওঠেন নি । সর্বমোট মৃতের সংখ্যা ১৭ জন । তার মানে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার উর্ধ্বমুখী ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মাপকাঠিতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের যে ৪টি স্তরের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। চতুর্থ স্তরটি হলো ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চতুর্থ স্তরে প্রবেশ করার টিকেট আমরা পেয়ে গেছি। আর এ টিকেটটি ফ্রিতে কেটে দিয়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর। গত ৪ মার্চ দেখা গেল ঈদ শেষে ঢাকা ফেরার মত অবস্থা । দলে দলে মিছিলে মিছিলে ঢাকায় প্রবেশ করল গার্মেন্টস কর্মীরা । তাদের নাকি কাজে যোগদানের জন্য বলা হয়েছে। দেশে করোনা নিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইন আর সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার জন্য সরকার নির্দেশনা জারি করেছে। সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে। এর মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশ ! বেতন পাওয়ার আশায় আর চাকুরী হারানোর ভয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা দিল এর দায় দায়িত্ব কী মালিক পক্ষের উপর বর্তায় না ?  এই অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে বিশাল জনগোষ্টিতে  করোনা ভাইরাস ছড়ায়নি তা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন? বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই শুধূ মাত্র মাস্ক ও পিপিই উৎপাদনকারী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ছাড়া বাকীগুলো বন্ধ ঘোষণা দিতে হল। মানুষের প্রশ্ন – এত বড় স্পর্ধা গার্মেন্টস সেক্টর কোথায় পেল? সর্ষের মধ্যে ভূত নেই তো ! ১৭ কোটি মানুষের জীবনের চাইতে তাদের ব্যবসাই কী বড় ! এই ‘করোনা বোমা’র আঘাতে যদি মৃত্যু ঘটে তাহলে কী আগামী প্রজন্ম তাদের বিরুদ্ধে “গণ হত্যার” বিচার চাইতে পারবেনা ? তবে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা   থাকবে যেন ‘করোনা ভাইরাস, বোমা হয়ে ফিরে না আসে।

মাসের প্রথম সপ্তাহ হওয়ায় এ সপ্তাহটা যাচ্ছে বাড়িওয়ালা বনাম ভাড়াটিয়া দ্বন্ধে। এর মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর বিষয়ও আমরা জেনেছি। ভাড়া মওকুফ করার জন্য বলেছেন বলে একটা গুজবও উঠেছিল। মানবিক আবেদনও উঠেছিল ভাড়াটিয়াদের পক্ষ থেকে । কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়েছে বলে মনে হয়নি। বরঞ্চ মালিক ভাড়াটিয়া সম্পর্ক তিতিয়ে উঠেছে। এর ভেতরেও আমরা কক্সবাজারে কিছু মানবিক গৃহ মালিককে পেয়েছি। তাদের মধ্যে কক্সবাজারের বিশিষ্ট সাংবাদিক টেকপাড়ার অধিবাসী মাহবুবুর রহমান তার ভাড়াটিয়াদের গতমাসের ভাড়া মাফ করে দিয়েছেন। অপরজন হচ্ছেন উখিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজ সেবক মাহমুদুল হক চৌধুরীও তার দোকানের ভাড়া মাফ করে দিয়েছেন। ওনাদের এ মহানুভবতা করোনা পরবর্তী প্রজন্ম অবশ্যই স্মরণ করবে। তাদের পথ ধরে এ মহামারী সময়ে মালিকগণ অন্তত অর্ধেক ভাড়াও যদি মাফ করে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন তাহলে একটা মানবিক কক্সবাজার গড়ে উঠত।

গতকালের একটি বিষয় মনকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। করোনায় এ কেমন মৃত্যু ! স্বজনরা মৃত দেহ ছুঁয়ে কাঁদতেও পারে না ।দেখতেও পারে না ! দুদক পরিচালক জালাল সাইফুর রহমানের জানাযার কথাই বলছিলাম । তিনি গতকাল করোনায় মৃত্যু বরণ করেছেন।
এখানে আমাদের শিক্ষার বিষয় আছে। যে মৃত্যু স্বাভাবিক জানাযারও সুযোগ দেয়না , সেখানে আমরা কেন করোনাকে সেচ্ছায় গ্রহণ করে নিচ্ছি!করোনা ভাইরাসের কোন ঔষধ এখনো আবিস্কার হয় নাই । তাই তাকে ধরা না দেওয়াটার বড় ঔষধ আমাদের কাছেই আছে। আর সেটা হলো ‘স্বেচ্ছাবন্ধী’ বা সেল্প কোয়ারেন্টাইন । যেটা সরকার হোম কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করেছে। আপনি বাঁচতে না চান , কিন্তু আমাকে হত্যা করার অধিকারতো আপনাকে দেয়া হয়নি!

করোনাকে কেন্দ্র করে এ সপ্তাহে একটা মজার ব্যাপারও ঘটেছে । পাবনার চাটমোহরে সোলায়মান হোসেন নামের দুটি মামলায় ওয়ারেন্টভূক্ত আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। গ্রেপ্তারের মূহুর্তে আসামি নিজেকে করোনা রোগী বলে দাবি করতে থাকেন। পুলিশ কিছুটা ভড়কে যায়। পরে সাহস করে ঘরে ঢুকে দেখেন তিনি দিব্যি সুস্থ। পুলিশও শেষ পর্যন্ত সব ভয় ভীতি উপেক্ষা করে তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।

একটা বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ মাসটা আমাদের জন্য খুবই বিপদ জনক। করোনার প্রকোপ আর মৃত্যুর হার আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু সে দিক থেকে কক্সবাজার জেলা এখনো ভাল অবস্থা আছে। সংবাদে আসা ২ করোনা রোগীই নেগেটিভ । তাই বলছিলাম এখনো সময় আছে কক্সবাজারকে নিরাপদ রাখার । কক্সবাজারের সকল প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে।

ইতিমধ্যে পাড়ায় মহল্লায় স্ব-উদ্যোগে  লক ডাউন করা হচ্ছে। এমন ভাবে সব পাড়া মহল্লায় উদ্যোগ নেয়া উচিত । কিছু সংখ্যক যুবক ও শিক্ষার্থীরা এলাকার খাবার সরবরাহের দায়িত্ব নেবে । প্রতিঘরে তাদের মোবাইল নাম্বার পৌছে দেবে পাড়া মহল্লার হটলাইন হিসেবে। ইমাজেন্সি মুহুর্তে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করবে তারা ।প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করবে। এভাবে আমরা সমগ্র কক্সবাজারকে সফল হোম কোয়ারেন্টাইন ও লগ ডাউনের আওতায় আনতে পারি। এখনই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কক্সবাজারকে লক ডাউন ঘোষণা করার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •