এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া
চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের মেয়ে নিগার সুলতানা ঝুমু ফেসবুক লাইভে পারিবারিক অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বাবার পৈত্রিক সহায় সম্পদ বেদখল ও নিজেদের জীবনচিত্রের করুনদশা তুলে ধরেন। মুর্হুতে তাঁর ফেসবুক লাইভটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। বিষয়টি স্থানীয় চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ জাফর আলম এবং জেলা প্রশাসন, চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। বিষয়টি জানতে পেরে পরদিন রবিবার মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের বাড়িতে ছুঁটে যান এমপি জাফর আলম। সঙ্গে ছিলেন চকরিয়ার ইউএনও নুরুদ্দিন মুহাম্মদ শিবলী নোমান, থানার ওসি মো.হাবিবুর রহমান। পরির্দশনকালে এমপি জাফর আলম তাৎক্ষনিক ঘোষনা দেন, নিজের ব্যক্তিগত তহবিলের অর্থায়নে জমি কিনে মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে একটি নতুন ঘর তৈরী করে দেবেন তিনি। সোমবার ৬ এপ্রিল সরেজমিনে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, প্রতিশ্রুতি মোকাবেক কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল রেখেছেন এমপি জাফর আলম। অবশেষে এমপি জাফর আলমের আর্থিক সহযোগিতায় সোমবার থেকে শুরু হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের পরিবারের জন্য নতুন বসতঘর নির্মাণ কাজ। গতকাল মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের বাড়ির কাজ পরিদর্শন করছেন এমপি জাফর আলম।

এমপির পিএস আমিন চৌধুরী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এমন খবর জানার পর নিজ অর্থায়নে জায়গা কিনে সেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম। তিনি ২০ শতাংশ জমি কিনে নতুন বাড়ি নির্মাণে আনুমানিক ব্যয় হবে ১৫ লক্ষ টাকা।

জানা গেছে, রবিবার এমপি জাফর আলম ঘটনাস্থলে পরির্দশনকালে প্রথমে চকরিয়া উপজেলা পরিষদ থেকে দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও ওই মুক্তিযোদ্ধার দখলে জায়গা না থাকায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে এমপি জাফর আলম মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরবে নিজ অর্থায়নে বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন যার কাজও শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের জমিদার পাড়ার মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার হুমায়ুন কবির (সাবেক নাম দিলীপ কুমার দাশ) একাধারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহচর, তারই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের দায়িত্বপালনকারী ও লাল পাসপোর্টধারী সাবেক বাকশাল নেতা। জমিদার পরিবারের সদস্য এবং রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কঠিন মানবেতর জীবন-যাপন করে আসছেন। প্রায় ২০ কানির মতো ভূ-সম্পত্তি থাকলেও সেই সম্পদ হয়ে গেছে হাতছাড়া।

এই অবস্থায় আরেকজনের ভাড়াবাসায় দিনাতিপাত করছিলেন পরিবার সদস্যরা। সেই মানবেতর জীবন-যাপনের চিত্র এবং বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে যেসব ডকুমেন্ট অর্জন করেছেন সেই ডকুমেন্টসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর করে গত শনিবার রাতে ফেসবুক লাইভে এসে তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধার মেঝ কন্যা নিগার সুলতানা ঝুমু। এ সময় মানবেতর জীবনাচারের চিত্র তুলে ধরে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

রবিবার দুপুরে সেই মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে ছুটে যান কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান।

এর আগে সকালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রী। খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয় থানার ওসির পক্ষ থেকেও। খাদ্যসহায়তা দেন যুবলীগ নেতা কাউছার উদ্দিন কছিরও।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ‘রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের পরিবার যে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তা জানার পর পরই খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। প্রথমে স্থানীয় চেয়ারম্যান মিরানের মাধ্যমে বাড়িতে পাঠানো হয় খাদ্যসহায়তা।’

ইউএনও বলেন, ‘দুপুরে সংসদ সদস্য জাফর আলমসহ সশরীরে বাড়িতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির, তার মেঝ কন্যা নিগার সুলতানা ঝুমুসহ পরিবার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি।’

ইউএনও শিবলী নোমান বলেন, ‘জেনেছি, এই মুক্তিযোদ্ধার অনেক সহায়-সম্পদ রয়েছে। সেই সম্পদ কেন বেদখল হয়েছে বা কারা বেদখল করলো সেই বিষয়টি তদন্ত শুরু হয়েছে। এছাড়া একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যে সরকারি তালিকায় নাম উঠেনি, সেই বিষয়টিও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য ও চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহচর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের অনুষ্ঠানে দায়িত্বপালনকারী রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধা যে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তা কোনোদিন আমার দৃষ্টিতে আনেননি কেউই। তাছাড়া তার পৈতৃক বাড়ি হচ্ছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কলাউজানে। তিনি কলাউজান গ্রামের প্রয়াত যতীশ চন্দ্র দাশের ছেলে। যুবক বয়সে তিনি থাকতেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায়। পরবর্তীতে তিনি ধর্মান্তরিত হন এবং বিয়ে করেন। চলে আসেন চকরিয়ার হারবাংয়ে। এখানে এসে তিনি হারবাং ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।’

এমপি জাফর আলম বলেন, ফেসবুক লাইভে ‘এই মুক্তিযোদ্ধার করুণ কাহিনী জানার পর তার বাড়িতে ছুটে যাই। এ সময় তার হাতে নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং একটি চালের বস্তা তুলে দিই। ইতোমধ্যে আমি উদ্যোগ নিয়েছি একটি নতুন বাড়ি করে দিতে (জায়গাসহ) যার কাজ রবিবার শুরু হয়ে গেছে। এতে জায়গা ক্রয়সহ আনুমানিক ব্যয় হবে ১৫ লক্ষ টাকা। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও যা যা সহযোগিতা করার প্রয়োজন পড়বে তা-ই করা হবে। বেদখল হওয়া সম্পত্তিগুলো উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ইতোমধ্যে ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার হুমায়ুন কবিরের (৭৬) পরিবারের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ছয়জন। তন্মধ্যে স্ত্রী উম্মে কুলসুম, বিবাহিত মেঝ কন্যা নিগার সুলতানা ঝুমু, অবিবাহিত দুই কন্যা নূরে শেফা ও কানিজ ফাতেমা এবং ছোট সন্তান ইংরেজিতে অনার্স পাস হাবিবুল্লাহ মিজবাহ রয়েছেন। বড় কন্যা তছলিমা খানম রাউজানে শ্বশুর বাড়িতে রয়েছেন। মেঝ কন্যাকে ফেনীতে বিয়ে দেওয়া হলেও বাবার জীবন বাঁচাতে থেকে যান সঙ্গে।

মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের লোক ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের অনুষ্ঠানেও দায়িত্ব পালন করেছি। বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন তখন আমি সাতকানিয়ায় বাকশালের নেতা ছিলাম। এ কারণে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আমাকে বার বার প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুক দেন এবং লাল পাসপোর্ট করিয়ে দেন যাতে আত্মরক্ষা করতে পারি।’

বঙ্গবন্ধুর এই সহচর বলেন, ‘জীবন সায়াহ্নে এসে আজ আমি বড়ই অসহায়। পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত অন্তত ২০ কানি জায়গা ভূমিদস্যুরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। এক শতাংশ জায়গাও আমার দখলে নেই। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আরেকজনের ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবন-যাপন করে চলেছি।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘আজ আমি সার্থক হয়েছি, এমপি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমার বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এমপির পক্ষ থেকে জায়গাসহ একটি নতুন বাড়িও পেতে যাচ্ছি যার কাজও শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সবশেষে আরো কিছু চাওয়া আছে আমার। তন্মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠানো, আমার দুই কন্যাকে যাতে বিয়ে দিতে পারি, ছোট ছেলের সরকারি চাকরি হয় এবং বেদখল হওয়া আমার পৈতৃক সম্পত্তি যাতে পুনরুদ্ধার হয় সেসব দাবি করছি। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •