আমরা কেন নিয়ম ভাঙি

প্রকাশ: ৬ এপ্রিল, ২০২০ ০২:০৪ , আপডেট: ৬ এপ্রিল, ২০২০ ০৩:৫৩

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


রোমেন রায়হান

জাপানিদের গল্প বলি। জাপান সরকার মাঝেমধ্যে তাঁদের জনগণের জন্য কিছু নির্দেশনা দেয়। যেমন হয়তো বলল, আমরা পাওয়ার সেভ করার জন্য সোম ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন লিফট ব্যবহার করব না। যে কয়দিন এই নিয়ম চালু রাখতে বলা, সেই কয়দিন স্থির নিশ্চিত জানবেন জাপানিরা সোম ও বৃহস্পতিবারগুলোয় লিফট ব্যবহার করছে না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করছে। একই ঘটনা সত্যি হবে, যখন জাপান সরকার জনগণকে বলবে অফিস বা বাসায় এয়ারকুলারের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখতে।

লম্বা সময় জাপান থাকার সময় এসব দেখে বিস্মিত আমি একবার আমার জাপানি বন্ধু হিদেকে কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমরা নিয়ম ভাঙো না?’ হিদে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ‘কী বলছ বুঝতে পারছি না। নিয়ম ভাঙব কেন? নিয়ম তো তৈরি করাই হয় মানার জন্য!’

করোনায় জেরবার বিশ্বের বড় দেশগুলো যেখানে লকডাউনের কড়াকড়ি দিয়ে লোকজনকে ঘরে রাখতে বাধ্য করছে, সেখানে জাপানে লকডাউন করা হয়নি, জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে যাঁদের প্রয়োজন নেই, তাঁরা যেন এই সময়ে ঘরেই থাকেন। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে বলে জাপানিরা লকডাউনে যায়নি। তবে আমার ধারণা, সরকারের নির্দেশনার ওপর জনগণের আস্থাকে পুঁজি করেই জাপান সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। কারণ, সরকার জানে তাঁদের জনগণকে কোনো নিয়ম মানতে বললে তারা তা নিঃসংকোচে পালন করবে। কারণ, জাপানিরা মনে করে, সরকার তাঁদের ভালোর জন্যই নিয়ম তৈরি করে। সংবাদপত্রের একটি জরিপে দেখা গেছে, জাপানি জনগণের ৮৩ শতাংশ এই সময়ে ঘরে থাকছে, যেখানে এক মাস আগে এই সংখ্যা ছিল ৪৩ শতাংশ। রাজধানীর রাস্তাঘাটগুলো ফাঁকা, লোকজন না যাওয়ার কারণে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। শপিং মলগুলোতেই ক্রেতার সংখ্যা হাতে গোনা।

আমাদের দেশের দিকে তাকান। এই যে ওপর মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছে করোনা থেকে নিজে বাঁচতে এবং বাকিদের বাঁচাতে ঘরে থাকতে, আমরা কি শুনছি? শুনছি না। কর্তাব্যক্তিরা সঠিকভাবে আমাদের শুধু করোনার ভয়াবহতা বোঝাতে পারেননি বলেই কি নিয়ম মানছি না! নাকি এর পেছনের একটা কারণ আমাদের মনের ভেতরে গভীরভাবে গেঁথে থাকা সন্দেহ আর অবিশ্বাস? আমরা কি আশপাশের মানুষজন দ্বারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হতে হতেই কাউকে সহজে বিশ্বাস করার অভ্যাস ত্যাগ করেছি?

সন্দেহ, অবিশ্বাসের একটা উদাহরণ দিই। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী অসংক্রামক রোগের কী কী ধরনের ঝুঁকিতে আছে, তা জানার জন্য বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকার একটি বস্তিতে গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছিলাম আমরা। গবেষণার একটি অংশ ছিল তাদের রক্ত পরীক্ষা করা। আমরা বস্তিটির কাছেই থাকা একটি স্বনামধন্য বড় হাসপাতালে বিভিন্ন শারীরিক পরিমাপের সঙ্গে পরীক্ষার জন্য রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিলাম। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গবেষণাটির উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলার পাশাপাশি ফ্রি রিপোর্ট এবং স্বাস্থ্য পরামর্শ, যাতায়াতের খরচ দিয়েছিলাম তখন। বড়সংখ্যক হাসপাতালটিতে এলেও বেশ কিছু মানুষ শেষ পর্যন্ত আর হাসপাতালটিতে আসেনি। আমরা পরে বস্তাটিতে গিয়ে না আসা লোকজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন তারা আসেনি। উত্তরগুলো ছিল মোটামুটি এ রকম

(ক) আমরা শুনেছি ওইখানে এক বালতি রক্ত রেখে দেয়!
(খ) শুনেছি আপনারা কিডনি খুলে রেখে দেন
(গ) শুনেছি আপনারা আমাদের রক্ত বেচে ব্যবসা করেন
(ঘ) শুনেছি আপনারা নাকি ইনজেকশন দিয়ে শরীরে এইডসের জীবাণু ঢুকিয়ে দেন!
(ঙ) আপনাদের হাসপাতালে আগেও গিয়েছি। অনেক খরচ। এইবার সব পরীক্ষা ফ্রি! আবার যাতায়াত ভাড়াও দিচ্ছেন! নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা আছে!

উত্তরগুলো পেয়ে বুঝেছি মূল সমস্যা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে না পারা। যেকোনো তথ্য বিশ্বাস করানোর পূর্বশর্ত হচ্ছে আস্থার পরিবেশ করা। উন্নত দেশে যেখানে কোনো তথ্য বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সরকারি লোগো ব্যবহার করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে সরকারি নির্দেশনা দিলে লোকজন মানতে চায় না কেন? সরকারি যোগাযোগমাধ্যমগুলো কেন আস্থা অর্জন করতে পারছে না! আমাদের প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, করেন, করতে বলেন, তার ওপর জনগণ যতটা আস্থা রাখতে পারেন, তার কাছাকাছি আস্থা কেন মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের ওপর রাখতে পারেন না, তা ভাবার সময় হয়েছে।
যদি আস্থা রাখতে না পারার কারণে নিয়ম ভাঙে, তাহলে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কী করতে হবে, তা ভাবা দরকার।

নৃতাত্ত্বিকেরা ভালো বলতে পারবেন, আমরা জাতিগতভাবেই নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করি কি না, কেন আমরা যেন পণ করে বসেই থাকি আমাদের যা করতে বলা হবে আমরা তার উল্টোটাই করব, নিয়ম ভাঙব এবং তা আমরা গর্ব করে বাকিদের বলব। আমার এক বন্ধু রসিকতা করে বলেছে, আমাদের কর্তাব্যক্তিরা একটা বড় ভুল করে ফেলেছে আমাদের অন্য দেশের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। যদি বলত, করোনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরে থাকা যাবে না, ঘরের বাইরে থাকাই নিয়ম। তাহলে হয়তো নিয়ম ভাঙার জন্য হলেই আমরা খিল এঁটে ঘরে বসে থাকতাম।

রোমেন রায়হান: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
[email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •