ছবি আছে
করোনাকে আমরা আলিঙ্গণ করছি না তো!
মোঃ নেজাম উদ্দিন
গত ২১ মার্চ থেকে ঘরবন্ধী। এর মধ্যে এক দুবার বের হয়েছি মায়ের ওষুধ আর ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য। বিনা প্রয়োজনে বের হই নি আগের মতো। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। দেশের কিছু মানুষ ভয়ে দিনযাপন করছে আর কিছু মানুষ এটিকে উৎসব মুখর বা কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে ঠিক আগের মতো চলাফেরা করছে। সরকার এই ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারি বেসরকারি সব দপ্তর, প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হতে বারণ করছে বার বার। জনসচেতনতার জন্য প্রতি মহল্লায় মাইকিং করা হচ্ছে।

টহলরত আছে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। বাংলাদেশ সরকার চাইছে যদি কিছুদিন ঘরে থাকা যায় বা একে অন্যেও সংস্পর্শে না আসে তবে এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কিন্তু আমাদের দেশের কিছু মানুষ সরকারি ছুটির কারনে রাস্তাঘাট আগের চাইতে ফাঁকা থাকায় অতি উৎসাহে রাস্তা ঘুরতে বের হচ্ছে। আর তারাই পুরো বাঙ্গালী জাতিকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। গত কয়েকদিন আগে বাইক নিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাহারছড়া বাজারে গিয়েছিলাম। প্রথমে দূর থেকে যা নজরে আসলো তাতে মনে হলো করোনা ভাইরাস সম্পর্কে যারা বাজারে এসেছে তারা অবগত নন। বিক্রেতাগণ মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাবস ব্যবহার করছে না, ঠিক তেমনি কিছু ক্রেতাগণের মুখে মাস্ক দেখা গেলেও অনেক মানুষের মুখে মাস্ক নেই। দক্ষিন সাইটে একজন হ্যান্ড মাইক নিয়ে দুরত্ব বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যেতে অনুরোধ করে যাচ্ছেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা? আমি কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলাম একটু দূরে। দেখছি, বাজারে মানুষ কমে কিনা। কিন্তু দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। লোক সমাগম আরো বাড়তে শুরু করেছে। বাধ্য হয়ে আমার এক পরিচিত সবজি বিক্রেতাকে ফোন করে আমার যা প্রয়োজন তা অর্ডার করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তাকে বিকাশে মূল্য পরিশোধ করে তা নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
বাজার থেকে আসতে রাস্তায় যা দেখা গেলো- সেনাবাহিনীর গাড়ি। রাস্তায় ঘুরাফেরা করা মানুষগুলো সেনাবাহিনীর নজর এড়াতে লুকিয়ে পড়ছে। না হেসে পারলাম না। যে বিপদ থেকে রক্ষা করতে আজ সেনাবাহিনী, পুলিশ কাজ করছে। তাদেরকে ফাঁকি দিয়ে করোনা ভাইরাসকে আমরা আলিঙ্গন করছি!

আমরা বাঙ্গালীরা সেনাবাহিনী বা পুলিশ দেখতে পাচ্ছি কিন্তু করোনা ভাইরাস দেখতে পাচ্ছিনা বলে হয়তো বিশ^াস করতে পারছিনা করোনা ভাইরাস বলে কিছু আছে! যদি তা আমরা অবগত না হই অন্তত সরকার বলছে ঘরে থাকতে সরকারের এমন জরুরি অবস্থা জারি করা মানে কি এটা আমাদের বুঝতে হবে দেশে কিছু ঘটতে চলেছে। সারা বিশ্বের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে করোনা কত ভয়ংকর। এবং পাড়া মহল্লায় যারা শিক্ষিত যুবক আছে তাদের উচিৎ করোনা সম্পর্কে যারা জানেনা তাদের অবগত করা এবং ঘরে থাকার জন্য উৎসাহ প্রদান করা । চীন, ইটালি, বা ফান্সের মতো উন্নত দেশ। আমরা বাঙ্গালীরা তাদের করোনা’র ভয়াবহতা কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেও শংকিত নই। পুরো বিশ্বে আজকের রির্পোট বলছে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১২,৭৩,৮১০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৬৯,৪৫৯ জনের। তারমধ্যে ইটালি আক্রান্ত ১,২৮,৯৪৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৫,৮৮৭ জনের।স্পেনে আক্রান্ত হয়েছে ১,৩১,৬৪৬ জন মৃত্যু হয়েছে ১২৬৪১ জনের।ভারতে আক্রন্ত হয়েছে ৪,২৮৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের।আর বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৮৮জন আর মৃত্যু হয়েছে ৯জনের । এখানে বাংলাদেশ মৃত্যুার এর দিকে তাকালে দেখা য়ায় ২য় অবস্থানে আছে তার মানে যদি দেশে করোনা ভয়বহতা আকারে দেখা দিবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে হতে পারে। ফিলিপাইনে লকডাউন অমান্য করায় একজনকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে সম্প্রতি। তাতেও আমরা বুঝতে পারছিনে করোনা কতটা ভয়ংকর! সহকর্মীর সংবাদ ও ফেইসবুকের বদৌলতে জেলার বিভিন্ন এলাকার কথা জানতে পারি। গ্রামের দোকানে এখনো আমরা দলগতভাবে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছি। দুরত্ব বজায় না রেখে চলাফেরা করছি। বাজার নিয়ন্ত্রিত নয়। যে যার মতো বাইওে ঘুরাফেরা করছে। তাতে আমরা আগামীর জন্য কি প্রস্তুত? আমরা কি এই ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে পারবো?। যে দেশে একটি সভ্য জাতিকে সচেতন করতে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে তাতে প্রশ্ন উঠে আমরা কতটা সভ্য? যদি সভ্য জাতি হতাম তবে নিজ দায়িত্বে ঘরে অবস্থান করতাম এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতাম। এখন ঠিক আগের মতো বাইরে যাচ্ছি, ঘরে ফিরছি একবারও কি চিন্তা করেছি ঘরের মানুষ যারা আছে তারা আমার জন্য কতটা বিপদগ্রস্থ? বর্তমানে বাংলাদেশে ৮২ জন করোনা রোগী আছে। ঠিক একই রকম ভাবে আমেরিকা বা চীনে প্রথমে সংখ্যাটা এমন ছিলো। তারাও হয়তো অবহেলা করেছিলো এটি তেমন কিছু নয় বলে। কিন্তু যখন বাড়তে শুরু করলো তখন তাদের হুশ আসলো যে এটি মহামারি আকার ধারন করেছে।যদি ঠেকানো না যায় তবে দেশ বিলীন হয়ে যাবে। এমনি ভাবে আমেরিকা, ইটালি, ফান্সসহ স্পেন ভারতসহ বিশে^ও বেশকিছু রাষ্ট্র আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। সেই দেশগুলোর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশ একটি। আমরা জানি চীনের ভয়াবহতা তারপরেও আমরা অবহেলা করছি। বাইরে ঘুরাফেরা করছি নিজের মতো করে। বাজার করতে যাচ্ছি। সিগারেট ফুরিয়ে গেছে তা আনতে যাচ্ছি। ত্রান নিতে যাচ্ছি। যিনি ত্রান দিচ্ছেন তিনি তো প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন আপনার কি প্রস্তুতি কি আছে? হাতে হ্যান্ড গ্লাবস পড়েছেন? মুখে মাক্স পড়েছেন? চিন্তা করে দেখুন আপনি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন আপনি ঝুকিতে আছেন ঠিক তেমনি পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলছেন আপনি নিজে। আমাদের জীবন ব্যবস্থা সাময়িক থামাতে হবে। ঘরে যা আছে তা দিয়ে অল্প খেয়ে বাড়িতে অবস্থান করতে হবে। নয়তো আগামীর দিন আমাদের জন্য চরম ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে।

আরেকটি ব্যাপার এখন লক্ষ করা যাচ্ছে তা হলো ত্রান বিতরণ। সরকার বলছে ঘরে থাকার জন্য অথবা নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে চলার জন্য । বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে বারণ করা হয়েছে বার বার । কিন্তু এখন যে হারে ত্রান বিতরণ শুরু হয়েছে তাতে সরকারি নিষেধ অমান্য কার হচ্ছে। সব জয়গায় জনসমাগম হচ্ছে। কিছুদিন আগে দেখেছি জেলা প্রশাসন কক্সবাজার রাস্তায় রাস্তায় থাকা মানুষদের ত্রান বিতরণ করেছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়েও ত্রান দিয়ে এসেছে বলে খবর আছে। যখনই সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে জেলা প্রশাসন বা বিভিন্ন সংগঠন ত্রান বিতরণে নেমেছে। তখন খেটে খাওয়া মানুষগুলো বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে ত্রানের জন্য। ফলে করোনা ভাইরাস সংক্রমনের আশংকা বেশি রয়ে যায়। এই বিশেষ মুহুর্তে যারা ত্রান দিচ্ছেন তারা যদি জনসমাগম না ঘটিয়ে নিজেদের সুরক্ষা রেখে প্রতিটি ওয়ার্ড়ে ওয়ার্ড় প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে ঘরে ঘরে ত্রান বা খাদ্য সামগ্রী পৌছানো যায় তবে হয়তো আমরা এই ভাইরাসকে রুখতে সক্ষম হবো। এতে জনসমাগম হওয়ার আশংকা থাকে না ও নিজেকে সুরক্ষা রাখা যাবে বলে মনে করি। নয়তো চীন বা ইটালির মতো সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ।

আমরা যদি সচেতন না হয় তবে আমাদের সামনের সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ উন্নত অনেক দেশ আজ করোনা ভাইরাসে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। আমরা উন্নয়শীল দেশ হিসাবে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি। এই সময় আমরা সাধারণ মানুষ যারা আছি একটু নিজে থেকে দেশের জন্য কিছুটা সময় বিসর্জন দিয়ে দেশকে রক্ষা করতে পারি তবে সামনে আমাদের সুন্দর দিন অপেক্ষা করছে। ১৯৭১ সালে ৩০লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজানো এই বাংলাদেশ। আমরা বীর বাঙ্গালী। সরকার আমাদের যুদ্ধ করতে বলেনি। কয়েকদিন ঘরে অবস্থান করার পরামর্শ দিয়েছে। যেন আমরা নিরাপদে থাকতে পারি । আমরা কি পারি না নিজেকে নিরাপদ রাখতে কয়েকদিন ঘরে থাকতে? আসুন করোনা ভাইরাসকে রুখতে আমরা নিজ ঘরে অস্থান করি সরকারের কথা পালন করি, তবে আমরা উন্নত জাতি হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে পারবো সারাবিশ্বে।

মোঃ নেজাম উদ্দিন
সংবাদকর্মী
কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •