মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী 

সারা বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এযাবৎ কাল যত ছোঁয়াচে রোগ পৃথিবীতে এসেছে তারমধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর শক্তিশালী ছোঁয়াচে রোগ হলো COVID-19 অর্থাৎ করোনা ভাইরাস। এদেশের বাস্তবতার নিরিখে আমি বলছি, করোনা ভাইরাস (COVID-19) কোন অবস্থাতেই ছোঁয়াচে রোগ নয়, হতে পারেনা। সেটা আমি প্রামাণ্য ডকুমেন্টস এবং অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করবো ইনশাআল্লাহ।

সৌদী আরব থেকে উমরাহ হজ্জ করে আসা কক্সবাজারের খুটাখালীর দক্ষিণ পাড়ার মৃত রশিদ আহমদের সহধর্মিণী ৭৮ বছর বয়স্কা মুসলিমা খাতুনকে গত ১৮ মার্চ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি করানো হয়। গত ২২ মার্চ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা মহিলাটির শরীরের স্যাম্পল সংগ্রহ করে করোনা ভাইরাস টেস্টের জন্য ঢাকার আইইডিসিআর ল্যাবে পাঠিয়ে দেন। গত ২৪ মার্চ টেস্ট রিপোর্ট আসলে সেখানে তার শরীরে করোনা ভাইরাস জীবাণু ধরা পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মুসলিমা খাতুনের টেস্ট রিপোর্টে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ফলাফল ছিলো ‘পজেটিভ’।

এরপর মুসলিমা খাতুনকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আইসোলেশন বেডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২৯ মার্চ মুসলিমা খাতুনের শারীরিক অবস্থার একটু অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল রেফার করা হয়।

পরে এই রোগীর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত আরো ৯ জনের দেহের স্যাম্পল টেস্ট করতে দেওয়া হয়। তারা হলেন, মুসলিমা খাতুনের চিকিৎসায় প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত থাকা ৩ চিকিৎসক -ডা. মোহাম্মদ ইউনুস, ডা. আবু মোঃ শামসুদ্দিন ও ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান। মুসলিমা খাতুনের যে কন্যা গত ১৮ মার্চ থেকে একটানা ৩ এপ্রিল অর্থাৎ এখনো পর্যন্ত তার মায়ের সেবায় নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়োজিত আছেন, তিনি হচ্ছেন সাফিয়া বেগম। ১৮ মার্চের আগেও সাফিয়া বেগম তার মায়ের সাথে সময় কাটিয়েছেন। মুসলিমা খাতুনের সন্তান এডভোকেট হেফাজতুর রহমান ও তার সহধর্মিণী নার্গিস জান্নাত। এ ৬ জনের স্যাম্পল ঢাকার আইইডিসিআর ল্যাবে করোনা ভাইরাস টেস্ট করলে তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ পাওয়া যায়। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার পরিবারের ২ সদস্য কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে করোনা ভাইরাস টেস্ট করে, তাদের রিপোর্টও নেগেটিভ পাওয়া যায়। উক্ত মহিলার সফরসঙ্গী হিসাবে সৌদী আরব যাওয়া তার কনিষ্ঠ সন্তান ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হারুনর রশিদও এখন পুরোপুরি সুস্থ আছেন বলে তার পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে। এছাড়া মুসলিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসা তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও স্বজনেরা মাশাআল্লাহ এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তাহলে, দীর্ঘ ১৬ দিন মুসলিমা খাতুনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থেকে মায়ের সেবা করা তার কন্যা সাফিয়া বেগমের রিপোর্ট নেগেটিভ। মুসলিমা খাতুনের সাথে তার সন্তান ব্যাংকার হারুনর রশিদ গত ২৬ ফেব্রুয়ারী সৌদী আরবে উমরা হজ্জ করতে গিয়ে গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত তার মায়ের সাথে ছিলেন। সেই হারুনর রশিদ এখনো পুরোপুরি সুস্থ। মুসলিমা খাতুনেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গত ১৮ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে চিকিৎসা সেবা দেওয়া ৪ জন চিকিৎসক ও চিকিৎসক পরিবারের ২ সদস্যের করোন ভাইরাস টেস্ট রিপোর্টও নেগেটিভ।

তাহলে, এখন প্রশ্ন উঠেছে, করোনা ভাইরাস (COVID-19) ছোঁয়াচে রোগ হলে করোনা ভাইরাস রোগী মুসলিমা খাতুনের সরাসরি সংস্পর্শে যাওয়া উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের শরীরে করোনা ভাইরাস (COVID-19) জীবাণু এতদিনেও সংক্রামিত হলোনা কেন? কিংবা মুসলিমা খাতুনের সংস্পর্শে যাওয়া তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও স্বজনদের কোয়ারান্টাইন পিরিয়ড অতিবাহিত হওয়ার পরও তারা সম্পূর্ণ সুস্থ কেন? এতেই নির্দ্বিধায় প্রমাণিত হয়, বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস (COVID-19) কোন অবস্থাতেই ছোঁয়াচে রোগ নয়। আবার মুসলিমা খাতুন ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ৩১ মার্চ তার দেহের স্যাম্পল দ্বিতীয় বার পরীক্ষায় করোনা ভাইরাস টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। অর্থাৎ তার দেহে কোন করোনা ভাইরাস জীবাণু নেই। এক্ষেত্রে অনেকেই বলতে পারেন, ৫ দিন চিকিৎসার পর মুসলিমা খাতুনের করোনা ভাইরাস রোগ ভাল হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রেও আমি বলতে পারি, মুসলিমা খাতুন প্রকৃতপক্ষে করোনা ভাইরাস রোগী হলে এবং করোনা ভাইরাস সংক্রামক ব্যাধি হলে তার সংস্পর্শে আসা কেউই এতদিন কেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলো না?

আর যদি কোন চিকিৎসা বিজ্ঞানী বা অন্য কেউ বলতে চান, করোনা ভাইরাস (COVID-19) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো ছোঁয়াচে রোগ, একথাই প্রমাণিত সত্য। তাহলে আমি তাদের বলবো, মুসলিমা খাতুনের গত ২৪ মার্চ আইইডিসিআর ল্যাবে টেস্ট করা রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভুল ছিলো। অর্থাৎ হয়, করোনা ভাইরাস (COVID-19) রোগ সংক্রামক ব্যাধি নয়, অথবা মুসলিমা খাতুনের গত ২৪ মার্চ আইইডিসিআর ল্যাবে টেস্ট করা রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভুল। তার যেকোন একটা হতে হবে। দুটো একসাথে হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

যদি আমি মুসলিমা খাতুনের গত ২৪ মার্চে প্রদত্ত আইইডিসিআর ল্যাবে টেস্ট করা রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভুল বলি, সে ভুলের জন্য জন্য কক্সবাজার জেলাবাসী, চট্টগ্রামের আংশিক এলাকাবাসী, মুসলিমা খাতুনের বৃহত্তর পরিবার, স্বজন ও ২টি জেলার রাষ্ট্রযন্ত্রকে কত খেসারত দিতে হয়েছে, কত ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, তারা কতটা বেকায়দায় পড়েছিলেন, তা সবাই জানেন। কক্সবাজার শহর, খুটাখালী ও চট্টগ্রামে মোট ৫ টি বাড়ি এবং কক্সবাজার শহরের আংশিক এলাকা লকডাউন করা হয়। সেই ভুল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ৬ জন নার্স, ৩ ক্লিনার, মুসলিমা খাতুনের বৃহত্তর পুরো পরিবার, স্বজন সহ অর্ধ্ব শতাধিক মানুষকে বাধ্য হয়ে হোম কোয়ারান্টাইনে চলে যেতে হয়। করোনা ভাইরাস চিকিৎসা সংকটে একসাথে ৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে বাধ্য হয়ে হোম কোয়ারান্টাইনে চলে যাওয়া ছিলো কক্সবাজারবাসীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি দুর্ভাগ্যের বিষয়।

আবার ডা. মোহাম্মদ ইউনুসের সহধর্মিণী সাদিয়া আফরিন হচ্ছেন, নাইক্ষ্যংছড়ির ইউএনও। ইউএনও সাদিয়া আফরিনও ২৪ মার্চ পুরো নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাকে লকডাউন করে দিয়ে নিজেই হোম কোয়ারান্টাইনে চলে যান। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের একজন সহকারী কমিশনারকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত ইউএনও এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরকম আরো অনেকেই রয়েছেন।

এখান থেকে শুরু হয়, করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত কক্সবাজার জেলাবাসীর চরম অস্থিরতা। এনিয়ে গণমাধ্যম সরব হয়ে যায়। কথিত করোনা আক্রান্ত মহিলার বৃহত্তর পরিবার ও স্বজনদের মাঝে নেমে আসে অন্ধকারের ঘনঘটা। বুনিয়াদি এ পরিবারের স্বজনদের অনেকেই লজ্জায় ঢা ঢাকা দিতে থাকেন। এসব তৎপরতা নিয়ে কক্সবাজারে জনমনে চরম আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই ভাবতে থাকে, কখন জানি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছি।

২৪ মার্চ উক্ত মহিলার শরীরে করোনা ভাইরাস জীবাণু ধরা পড়ার খবরটা বিজলীর গতিতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি ছিলো সেদিনের “টক অব দ্যা কক্সবাজার”। কি যে আতংকিত হয়ে যায় প্রিয় কক্সবাজারবাসী, সেটা শুধু তারাই জানে, যারা এ ভয়ংকর পরিবেশ সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

উপরোক্ত যুক্তিতর্কে একটা বিষয় নিশ্চিত, সেটা হলো-করোনা ভাইরাস সংক্রামক ব্যাধি নয়। অথবা মুসলিমা খাতুনের গত ২৪ মার্চ আইইডিসিআর ল্যাবে টেস্ট করা রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভুল ছিলো। উপরোক্ত ২ টি বিষয় সঙ্গত কারণেই একসাথে হতে পারবে না।

যদি ধরে নেই, মুসলিমা খাতুনের গত ২৪ মার্চ ঢাকার আইইডিসিআর ল্যাবে টেস্ট করা রিপোর্টটিই ভুল ছিলো, তাহলে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত টেস্টের জন্য বাংলাদেশের
আর কোথাও কি নির্ভর করা যাবে? প্রতিদিন করোনা ভাইরাস (COVI-19) আপডেট পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ যে ব্রীফ ও অন্যান্য কার্যক্রম চালাচ্ছে, সাধারণ মানুষ এসবের উপর কি শতভাগ আস্থা রাখতে পারবে? কারণ ঢাকার আইইডিসিআর এর করোনা ভাইরাস টেস্ট রিপোর্ট যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে এদেশের মানুষ আর কোথায় যাবে? কেন আইইডিসিআর এত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলো, তা কার্যকরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। তারমাঝে আবার করোনা ভাইরাস স্যাম্পল টেস্ট করার ব্যবস্থাও দেশে একেবারে সীমিত। যা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালেও নয়। আবার টেস্ট কিট সহ অন্যান্য ল্যাব সরঞ্জামেরও রয়েছে প্রকট সংকট। টেস্ট করার প্রক্রিয়াও খুবই জটিল। আবার করোনা ভাইরাস টেস্ট করা ও টেস্ট রিপোর্টের কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

তাহলে, এ করোনা ভাইরাস জনিত এ মহাসংকটে ঢাকার আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ মানুষের সাথে এত তামাশা করলো কেন? এটাকি রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা নয়? যদি দেশের করোনা ভাইরাস জনিত পরিস্থিতি দেশে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন মানুষ তো পুরোপুরি অসহায় হয়ে যাবে। এপ্রশ্ন আজ কক্সবাজার জেলাবাসীর সবার মুখে মুখে। তাই সময় থাকতে মুসলিমা খাতুনকে নিয়ে এসব তুলকালাম কান্ড সুবিবেচনায় রেখে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

(লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •