রেজাউল করিম চৌধুরীঃ
এনজিও বন্ধুরা ঐক্যবদ্ধ থাকুন, নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-বিভক্তি ত্যাগ করুন, সরকারের সাথে কথা বলুন এবং স্থানীয় এনজিও/সিএসওগুলিকে রক্ষা করুন।
গতকাল আমি স্থানীয় একটি এনজিও নেতার ফোন পেয়েছি, তারা স্বল্প পরিসরে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে অধিপরামর্শমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।
সুশীল সমাজকে সংগঠিত করতেও প্রচুর কাজ করেন। সরকার ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার কারণে তিনি এপ্রিল মাসে তার কর্মীদের বেতন হয়ত দিতে পারবেন না।
আমি জানি যে, তিনি একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। তাঁর জীবন এখন ভয়াবহ অবস্থায় নিপতিত। তিনি সদস্যদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় বন্ধ রাখলেও তাকে তার পিকেএসএফ এবং ব্যাংকগুলি থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি ঠিকই পরিশোধ করতে হবে।
এমআরএ (মাইক্রো ফিনান্স রেগুলেটরি অথরিটি) এই সময়ে তাকে কিছু ত্রাণ কর্মসূচি করতে অনুরোধ করেছে। তিনি তার সর্বাত্মক চেষ্টাও করছেন। এমনকি তিনি এটা করছেন নিজের উদ্যোগেই ।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর স্বভাব, তিনি নিঃস্বার্থ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং দরিদ্রবান্ধব একজন মানুষ।
বাংলাদেশে এমন হাজার হাজার স্থানীয় এনজিও রয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে দিনরাত তারা পীড়িত মানুষের জন্য যে কাজ করছেন, সেগুলো আমি ফেসবুকে দেখেছি, দেখে আমি বিস্মিত হয়ে যাই! তবে, ছোট এসব স্থানীয় বেসরকারী সংস্থাগুলি, যারা একযোগে নানা দাতব্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অধিপরামর্শমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন, ঢাকা বা কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে খুব সম্ভবত কেউই চিন্তা করছেন না। সংস্থাগুলো বাঁচাতে সরকারের সাথে আলোচনা চালাতে প্রস্তুত এমন প্রায় কেউই নাই!
এই সংস্থাগুলোকে বাঁচাতে তাদের জন্য হয় বিশেষ ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেওয়া উচিত, নইলে তাদের এখন থেকেই ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত। দরিদ্র লোকদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে এবং উৎপাদন অব্যহত রাখতেও অর্থের প্রয়োজন হয়। আমাদের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই এটা করা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই স্থানীয় এনজিওগুলি COVID-19 প্রতিরোধমূলক সচেতনতার ক্ষেত্রে প্রচুর সৃজনশীল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। স্থানীয় এনজিওগুলিই ডিসি এবং ইউএনওর আহ্বানে দ্রুত এবং সবার আগে সাড়া দেয়। এই এনজিওগুলি কেন কণ্ঠ হারিয়েছে? কারণ এনজিও নেটওয়ার্কগুলিতে বিভ্রান্তি রয়েছে, বেশিরভাগ নেটওয়ার্কই কিছু বড় এনজিওর নেতৃত্বে রয়েছে। আমি দাতাসমূহ, জাতিসংঘের সংস্থাগুলি, আইএনজিওগুলিকে অনুরোধ করতে চাই- বাংলাদেশের এনজিও-সুশীল সমাজ বিকাশের অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে আপনারা কাজ করেছেন, বাংলাদেশের বড় এনজিওগুলিকে COVID-19 প্রকল্পে অর্থায়নের পরিবর্তে/পাশাপাশি দয়া করে তাদের বলুন যে, তারা যেন নিজেদের সঞ্চিবিত পুঁজির একটা অংশ নিয়ে দেরি না করে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
তাদেরকে এই খাতে দ্বন্দ্ব-বিভাজন পরিহার করতে বলুন। সবাইকে একত্রিত করতে তাঁদের শক্তি ও মেধাকে কাজে লাগাতে বলুন।
স্থানীয় এনজিওগুলিকে বাঁচাতে আমাদের সরকারের সাথে কার্যকর আলোচনা দেরি না করে শুরু করতে বলুন।
বৈচিত্র্যের জন্য, সহজাত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে, স্থানীয় মানুষ ও শক্তিগুলোর স্বতস্ফূর্ত উদ্যোগের জন্য এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং সমতা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় এনজিও-সুশীল সমাজের প্রয়োজন।
কাউকে বাদ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারবো না। আমাদের একসাথে বাঁচতে হবে, টিকে থাকতে হবে, কেউ একা থাকে না, কাঁচের ঘরে বসবাস আর নয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বড় বড় এনজিওগুলি যখন সমস্যায় পড়েছিল তখন স্থানীয়রাই তাদের/আমাদেরকে বাঁচিয়েছিল। কারণ তারাই স্থানীয়ভাবে স্থানীয় সমাজের নিকটতম নেতা।

রেজাউল করিম চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •