ইউছুফ আরমান

স্পেনের ১৪৯২ সালের ইতিহাস খুব স্মরণীয়। ৭১২ সালে যে রাজ্যের বুনিয়াদ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তাহারই শোচনীয় পতন ৭৮০ বৎসর পরে ১৪৯২ সালে। স্পেনে এই সুদীর্ঘ সময়ের গ্রানাদা শাসনের সমাপ্তি ঘটে ফার্ডিনাগু ও ইসাবেলার গ্রানাদা অধিকারের ফলে। খ্রিস্টানদের গ্রানাদা দখল ও মুসলমানদের ভাগ্যে নামিয়া আসে করুন ও মর্মস্পর্শী বিপর্যয়। যে জাতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও কৃষ্টি দ্বারা একটি মহাদেশের জীবন যাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনিল, সেই জাতির দুর্ভাগ্যের করুন ইতিহাস সংক্ষিপ্ত নিম্ম আলোচিত হইল।

আজ জাগালের স্পেন ত্যাগের পর গ্রানাদা ও ইহার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি অঞ্চল ব্যতীত মুসলমানদের আর অবশিষ্ট কিছু ছিল না। আজ জাগালের পতনের পর বোয়াবদিল বিশেষ স্বস্তি লাভ করেন। তিনি মনে করেন যে, এইবার নির্বিঘ্ন গ্রানাদার সালতানাত তাহারই হইল। কিন্তু হতভাগার নির্বুদ্ধিতার ফসল অচিরেই ভোগরকরিত হইল। খ্রিস্টানদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকতার নজীর বোয়াবদিল কে গ্রানাদে সমর্পণ করিতে আদেশ দেন। কিন্তু বোয়াবদিল নগর ছাড়িতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিলে খ্রিস্টান সৈন্যরা ৪০,০০০হাজার পদাতিক ও ১০,০০০অশ্বরোহী লইয়া গ্রানাদার উপর আক্রমণ করে। মুসলমানগণ বিখ্যাত সেনাপতি মুসা বিন আবুল গাজানের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেন। কিন্তু খ্রিস্টান বাহিনীর নিকট মুসলমানগণ বেশিক্ষণ টিকিয়া থাকিতে পারেন নাই। ফলে বিজয়ী খ্রিস্টান বাহিনী গ্রানাদার বহির্ভাগে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। দশ বৎসর ধরিয়া যে মুসলিম বাহিনী খ্রিস্টানদের প্রতিহত ও বিতাড়িত করিবার জন্য সংগ্রাম করিয়াছেন তাহারা এখন একান্ত বাধ্য হইয়া খ্রিস্টানদের নিটক পরাজয় স্বীকার করিলেন। ফার্ডিনাগু নগরের মধ্যে সমস্ত সরবরাহ বন্ধ করিয়া নগরবাসী কে চরম দুর্ভিক্ষের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া আত্মসম্পর্ণ করিতে বাধ্য করেন। অতঃপর ৭৮০বৎসর ব্যাপী মুসলিম সভ্যতা অতি সযত্নে লালিত হইয়া ইউরোপ ভূখন্ডে অজ্ঞতার অন্ধকার বিদূরিত করিয়া জ্ঞানস্পর্শে খ্রিস্টানদিগকে সভ্য করিয়াছে, আজ সেই মুসলিম শক্তি কে খ্রিস্টানগণ অত্যন্ত নির্মমভাবে ধ্বংসের জন্য মাতিয়া উঠিল। মুসলিম স্পেনের শেষ আধার, শেষ শাসনের চিহ্ন গ্রানাদান পতন ঘটিল রবিউল আওয়াল মাসের ২ তারিখ ৮৯৭ হিজরীতে, ২রা জানুয়ারি ১৪৯২ সালে। খ্রিস্টানদের নিটক মুসলমানদের আত্মসর্ম্পণ করিতে হইল।

ধর্মের আবরনে আচ্ছাদিত ফার্ডিনাগু অথবা তাহার সাধ্বী ইসাবেলা কেহই মুসলমানদের সহিত স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তাবলী পালন করেন নাই। মুসলমানদের আত্মসর্ম্পণের কয়েকদিন পরই ফার্ডিনাগু তাহার ধর্মীয় আবরণ উন্মোচন করেন। তিনি আদেশ জারি করেন যে, ইসলাম ধর্ম স্পেনে নিষিদ্ধ। অতএব কেহ ইসলাম ধর্মের কোন প্রকার আচার-অনুষ্ঠান পালন করিতে পারিবে না। ফার্ডিনাগুনের এহেন কোন বিশ্বাসঘাতকতা মূলক আচরণে মুসলিম জন সাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভীষণ উত্তেজনা। আলবেজাতে বিদ্রোহের দাবানল জ্বলিয়া উঠে। প্রবল খ্রিস্টান শক্তির নিকট মুসলমানগণ জয়যুক্ত হইতে পারেন নাই। অবশেষ মুসলমানদের উপর নামিয়া আসে নির্যাতন ভয়ংকর রূপ। বিভিন্ন প্রকারের জুলুম ও যন্ত্রণা শুরু হয়। খ্রিস্টানদের হামলায় বহু জীবন বিনষ্ট হয়। অত্যাচারী বাহিনী আল পুক্সারাসের মুসলমানদের উপর ও ঝাঁপিয়া পড়ে। সেখানে অসংখ্য নারী-পুরুষ শিশু ও বৃদ্ধা কে হত্যা করে। যারা প্রাণ রক্ষার্থে মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করেন তাহাদিগকে ও রেহাই দেওয়া হয় নাই। প্রাণ সংহার করিয়া পাশবিক আচরণে ঘর-বাড়ী এবং মসজিদগুলি কে অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করা হয়। এত বর্বর নির্যাতন ও নিধনযজ্ঞের মুখে যাহারা আত্ম গোপন করিয়া জীবন রক্ষা কনিয়াছিলেন তাহারা তাহাদের ধর্মবিশ্বাসে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয় নাই। ১৪৯২ সাল হইতে শুরু করিয়া ১৬১০ সাল পর্যন্ত অন্যূন ত্রিশ লক্ষ মুসলমান কে স্পেন হইতে বিতাড়িত করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষের আগুনে জ্বেলে ইউরোপের সভ্যতার দিক নির্দেশক মুসলিমদের যে অমানবিক অত্যাচার, নৃশংস হত্যা এবং নজীরবিহীন ধ্বংসের দ্বারা মুর বিতাড়নের কাজ টি সেদিন যারা করেছিল তাতে তারা রক্তে হোলি খেলায় মেতে উঠেছিল। ১লা এপ্রিল ১৪৯২সালে মুসলিম বিতাড়নের দিন টি মূঢ় খ্রিস্টান শ্রেণীর নিকট এক কৌতুক উৎসব। যেন বোকা মুসলমানদের তাড়নের করুণ চিত্র তাদের নিকট খেলা তামাসার বিষয়। অথচ ঐ ১লা এপ্রিল আজ ও পশ্চিমা গোষ্ঠী অনবহিত মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে কৌতুক দিবস পালন করাচ্ছে তাদের পূর্বসুরীদের করুণ পরিণতির অজানা হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

লেখক ইউছুফ আরমান, কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, ফাজিল, কামিল, বি এ অনার্স, এম.এ, এলএল.বি।
[email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •