সিবিএন ডেস্ক:

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী নতুন করোনাভাইরাস। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, যা এই ভাইরাসকে মারতে পারে অথবা কোনও ভ্যাকসিনও তৈরি হয়নি, যা মানুষকে রক্ষা করতে পারে। করোনার লড়াইয়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কার থেকে বিশ্ব কত দূরে রয়েছে; এখন সেই প্রশ্ন সর্বত্র।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন কখন পাওয়া যাবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরামহীন গবেষণা করে চলছেন বিজ্ঞানীরা। এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানার জন্য প্রাণীর দেহে পরীক্ষা বাদ দিয়ে সরাসরি মানুষের শরীরে একটি ভ্যাকসিনের প্রয়োগ ইতিমধ্যে হয়েছে।

অন্য বিজ্ঞানীরা প্রাণীর দেহে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানোর পর্যায়ে রয়েছেন। চলতি বছরের শেষ দিকে তারা এটি মানব শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা যদি চলতি বছরে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করে ফেলেনও তারপরও এটির গণ-উৎপাদনের জন্য আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে।

যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের আগে কোনও ভ্যাকসিন মানব দেহে প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। এসব কিছুই ঘটছে একটি অভূতপূর্ব অনির্ধারিত সময়কে ফ্রেমে বেঁধে। এমনকি নতুন নতুন অ্যাপ্রোচ মাথায় রেখে ভ্যাকসিন তৈরির এই প্রচেষ্টা জারি রয়েছে। তবে ভ্যাকসিন তৈরির সব প্রচেষ্টাই যে সফল হবে তার কোনও নিশ্চয়তাও নেই।

এখানে মনে রাখা দরকার, এখন পর্যন্ত মানবদেহে চার ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। এসবের প্রত্যেকটির সঙ্গে কমন সর্দিকাশি জড়িত এবং এর কোনোটিরই ভ্যাকসিন নেই।

সব বয়সীকে রক্ষা করবে?

প্রায় অনিবার্যভাবেই এই ভ্যাকসিন বয়স্কদের জন্য খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। এটা শুধুমাত্র ভ্যাকসিনের কারণে নয়; বরং শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখানে অনেকাংশে দায়ী, যা প্রত্যেক বছর ফ্লুবাহিত রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে?

সব ধরনের ওষুধ; এমনকি ব্যথানাশক ওষুধেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনের কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে তা জানা প্রায়ই অসম্ভব। এটা এমন একটি বিষয় যেখানে ভ্যাকসিনের আবিষ্কারকরা নিবিড় নজর রাখবেন।

কে পাবেন এই ভ্যাকসিন?

যদি একটি ভ্যাকসিন তৈরিও হয়; তারপর এর উৎপাদন হবে খুবই সীমিত। এক্ষেত্রে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্রাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বেশি।

আর এই অগ্রাধিকারের তালিকার শীর্ষে থাকবেন স্বাস্থ্যখাতের কর্মীরা; যারা কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন। এই রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী; যে কারণে এই বয়সীদের জন্য যদি ভ্যাকসিনটি কার্যকরী হয়, তাহলে স্বাস্থ্যকর্মীদের পর তারাই থাকবেন অগ্রাধিকারের দ্বিতীয় তালিকায়।

এছাড়া বয়স্কদের সঙ্গে যারা থাকেন অথবা দেখাশোনা করেন; তাদের ভ্যাকসিন দেয়াটাই হবে সর্বোত্তম।

ওষুধ কতদূর?

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে কিনা তা জানতে চিকিৎসকরা ইতোমধ্যে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধগুলো প্রয়োগ শুরু করেছেন। এর ফল যদি নিরাপদ হয়; তাহলে ওষুধ আবিষ্কারে গবেষণার গতি আরও ত্বরাণ্বিত হবে।

করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর হাসপাতালে ইতোমধ্যে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা চিকিৎসক ব্রুস অ্যায়িলওয়ার্ড বলেন, এখন কেবলমাত্র একটি ওষুধ রয়েছে; যেটির সত্যিকারের কার্যকারিতা থাকতে পারে বলে আমাদের ধারণা। আর সেটি হলো রেমদেসিভির।

‘ইবোলার ওষুধ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এটি বেশ কয়েক প্রজাতির ভাইরাসকে মেরে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে আমরা এখনও পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ফল জানার অপেক্ষা করছি। এছাড়া প্রাণঘাতী এইচআইভির চিকিৎসায় ব্যবহৃত একজোড়া ওষুধ লোপিনাভির এবং রিটোনাভির কার্যকরী হতে পারে বলে অনেক আশা ছিল। কিন্তু এর পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ফল একেবারে হতাশাজনক।’

‘এইচআইভির এই ওষুধ প্রয়োগের পর কোভিড-১৯ এর গুরুতর কোনও রোগী সুস্থ হননি; এমনকি সামান্য পরিমাণে মৃত্যুও কমায়নি। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের শরীরে এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছিল; কিন্তু তাদের প্রায় এক চুতুর্থাংশই মারা গেছেন। এমনও হয়ে থাকতে পারে যে, অনেক আগেই রোগীরা করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন; সেজন্য হয়তো ওষুধগুলো কাজ করেনি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই কর্মকর্তা বলেন, তবে ম্যালেরিয়ানিরোধী ওষুধ ক্লোরোকুইন এক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ওষুধটি ভাইরাসকে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু এখনও আমাদেরকে মানবদেহে প্রয়োগের ফল জানার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

ভ্যাকসিন কিংবা ওষুধ আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত কি করতে হবে?

ভ্যাকসিন সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এটি আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে ভালো স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।

আপনি যদি করোনা সংক্রমিত হয়ে থাকেন; অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে মৃদু উপসর্গ দেখা দেয় এবং বাসায় পূর্ণ-বিশ্রামে এটি থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব। পাশাপাশি প্যারাসিটামল এবং প্রচুর পরিমাণে তরল পান করতে হবে। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে, তাদেরকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে।

ভ্যাকসিন কীভাবে তৈরি হবে?

ক্ষতিকারক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া (বা তাদের ছোট অংশগুলো) মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাতে দেখা যায়। তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই ভাইরাসকে আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্ত করে এবং সেখানে এটির সঙ্গে কীভাবে লড়াই করতে হবে সেটি শিখে যায়। তখন বাস্তব পরিস্থিতিতে এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই শুরু করে; কারণ সে আগেই জেনে গেছে কীভাবে এটিকে লড়াই করে হারাতে হবে।

কয়েক দশক ধরে ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রধান পদ্ধতি হলো প্রকৃত ভাইরাসকে ব্যবহার করে এর প্রয়োগ করা। হাম, মাম্পস (লালাগ্রন্থির একধরনের ভাইরাস সংক্রমণে সৃষ্ট প্রদাহ) এবং রুবেলা (এমএমআর) ভ্যাকসিনগুলো সেই ভাইরাসের দুর্বল স্তরের ভাইরাসকে ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল; যে স্তরটি পুরোমাত্রায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। কিন্তু মৌসুমী ফ্লুর ক্ষেত্রে এই ফ্লুর প্রধান প্রজাতিটির ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়; যা এই ফ্লুকে একেবারে নিস্ক্রিয় করতে পারে।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির কাজ একেবারে নতুন এবং কম পরীক্ষিত উপায়ে করা হচ্ছে। এই উপায়টিকে বলা হচ্ছে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যে নতুন করোনাভাইরাস, সার্স-কোভ-২’র জেনেটিক কোড জানা গেছে এবং এই ভাইরাস তৈরির একটি অবিকল নকশাও পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

কিছু ভ্যাকসিন বিজ্ঞানী ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে তা নিরীহ প্রজাতির ভাইরাসের সঙ্গে রাখছেন। যেখানে নিরীহ প্রজাতির বাগের মাধ্যমে কাউকে সংক্রমণ করতে পারে এই ভাইরাস। এরপর তাত্ত্বিকভাবে সেখানে সংক্রমণের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

অন্যদিকে, কিছু বিজ্ঞানী করোনাভাইরাসের একেবারে ‘র জেনিটিক কোড’ (ডিএনএ অথবা আরএনএ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে) ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছেন। যা একবার মানবদেহে প্রয়োগ করা হলে তা ভাইরাল প্রোটিন উৎপাদনের কাজ শুরু করবে। ফলে এর মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আবারও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে শিখবে। বহুল প্রতীক্ষিত এই ভ্যাকসিন কবে আলোর মুখ দেখবে এখন সেদিকে চেয়ে আছে বিশ্বের কোটি প্রাণ।

বিবিসির স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিনিধি জেমস গ্যাল্লাঘারের প্রতিবেদন অবলম্বনে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •