কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার খোতবায় অধ্যক্ষ আল্লামা মাহমুদুল হক

মহামারী প্রসঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা

প্রকাশ: ২৭ মার্চ, ২০২০ ০৩:৫৯ , আপডেট: ২৭ মার্চ, ২০২০ ০৪:২১

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


সংবাদ বিজ্ঞপ্তি:
সকল প্রসংশা মহান আল্লাহর, যিনি আসমান-জমিনের মালিক, যিনি হায়াত মওতের মালিক। দরুদ সালাম সেই বিশ্বনবীর দরবারে যিনি প্রেরিত হয়েছিলন মানব জাতির মুক্তি সনদ হিসেবে, যার পরে আর কোন নবী-রসুল আসবেন না।

সম্মানিত মুসল্লি ভাইয়েরা!
আপনারা জানেন আমরা আজ এক মহা সংকট পার করছি। সেই মহা সংকটের নাম হলো করোনা ভাইরাস। করোনাভাইরাসে আজ থমকে গেছে সারা পৃথিবী। করোনা থাবায় সব খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা আতংকে সব কিছু স্থগিত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন একটাই আতংক করোনা ভাইরাস। চীনের ছোট্ট শহর থেকে বের হয়ে যেভাবে দ্রুত গতিতে বিশ্বকে ভয় দেখাচ্ছে । এতে সবই আতংকিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও এর বাইরে নয়। সব দেশ নিজের মত করে সতর্কতা অবলম্বন করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ রোগের ছোবল কম হলেও ৩৯ জন আক্রান্ত হয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন।

এই ভাইরাসে বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল কলেজ, মাদরাসা। বাচ্চা থেকে বুড়ো পর্যন্ত সকলেই গৃহবন্দি। আতংক গ্রাস করছে সকলকে। এখন আর কেউ দর্শক নয় প্রায় ১৯৬ টি রাষ্ট্র করোনায় আক্রান্ত। অবশিষ্ট রাষ্ট্র করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকায় বিপর্যস্ত। এই করোনা ডান-বাম-রাম-মন্ত্রী এমপি, আমলা, জজ, ব্যারিষ্টার, ধনী গরীব কাউকে চেনে না। সুতরাং এই ভাইরাস মানুষের জীবনের জন্যে বিরাট হুমকি স্বরূপ। তাই এই ব্যাপারে ব্যাপক সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভাইরাস ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। জেনে রাখতে হবে গণজমায়েত এই রোগ সংক্রমণের প্রধান কারণ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতেই নিজদিগকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না’। আল্লাহ আরও বলেন,অর্থাৎ ‘তোমরা নিজদিগকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড় দয়াবান’। এ আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,প্রত্যেককে জীবন নাশের কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। এছাড়া অনেকগুলো হাদিস আছে যদ্বারা মহামারি বিস্তৃতি লাভের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য বলে প্রমাণিত । যেমন রসুল (স:) এর হাদিস ‘রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের মধ্যে মিশাবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের কাছে না নিয়ে যায়’।

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কোন এলাকায় মহামারীর প্রাদুর্ভাবের কথা শোন তবে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় তোমাদের থাকা অবস্থায় মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না’।

বুখারী শরীফে প্লেগ রোগের পরিচ্ছেদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে হযরত উমর (রা.) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করছিলেন পথের মধ্যে তবুক পৌঁছলে তিনি জানতে পারলেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তখন হযরত উমর প্রবীন আনসার ও মুহাজিরদের থেকে পরামর্শ চাইলে অনেকেই তথায় না ঢুকার পরামর্শ দিলে তিনি সেখানে না ঢুকে ওখান থেকে ফেরৎ আসা আরম্ভ করলে তখন হযরত আবু উবাইদা ইবনে জররাহ ওমরকে বললেন,
আমরা আল্লাহর এক তকদীর থেকে অন্য তকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত তোমার কিছু উটকে যদি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও আর সেখানে আছে দুটি মাঠ তৎমধ্যে একটি হল সবুজ-শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী হয়েছে। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও তাহলে তাও আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী হয়েছে।

ওই মহামারীতে হযরত আবু উবাইদা মারা যান। তারপর হযরত মুয়ায ইবনে যবলকে গর্ভনর পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনিও সেই মহামারীতে মারা যান। এই মহামারীর নাম ছিল আমওয়াছ। তারপর তিনি হযরত আমর ইবনুল আসকে গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তখন তিনি কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি চালু করেন। তখন তিনি সিরিয়াবাসীকে বললেন, অ সিরিয়াবাসী মহামারী দাউ দাউ করা আগুনের মত আর সেই আগুনের লাকড়ি হলে তোমরা। সুতরাং তোমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও। যাতে করে তোমরা জ্বলতে না পার। অর্থাৎ আক্রান্ত হতে না পার। এ পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি সিরিয়া থেকে মহামারী দূরীভূত করছিলেন। হযরত ওমর একথা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন।

এই সকল হাদিস দ্বারা বুঝা গেল যে, (১) আক্রান্ত এলাকায় যেন কেউ না ঢুকে, আর কেউ যেন তা থেকে বের না হয়। যা স্বাস্থ্যসম্মত। সুতরাং আক্রান্ত ব্যক্তি যাথে জুমা জামাতে ও অন্যান্য সামাবেশে উপস্থিত না হয়। (২) কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সকিপ সম্প্রদায়ের এক কুষ্ঠ রোগী বায়আত করতে আসতে চাইলে রসুল (স.) বলেছিলেন, আমি তোমাকে বায়আত করালাম। যে আক্রান্ত হওয়ার ভয় করে অথবা অপরকে ক্ষতিতে নিমজ্জিত করার আশংকা পোষণ করে সে যেন, জুমা জামাত, সমাবেশে না আসে। রসুল (স:) বলেছেন, ‘সুতরাং জুমআর পরিবর্তে বাড়ীতে একাকিত্বে নামাজ পড়বে। রাসুল (স:) আরও বললেন, তোমরা কুষ্ঠরোগ থেকে এমনভাবে পলায়ন করো যেমনীভাবে সিংহ থেকে পলায়ন করে থাক।

এ ব্যাপারে শরীয়তের কতেক মূলনীতি হলোঃ
১। নিজের অথবা অন্যের কোন ক্ষতি করা যাবে না।
২। যতটা সম্ভব ক্ষয় ক্ষতি প্রতিহত করতে হবে।
৩। শারীরিক সুস্থতা ইবাদত বিশুদ্ধতার উপর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। অর্থাৎ যেই ইবাদাত করলে অসুস্থতার সম্ভাবনা থাকবে সেই ইবাদাত করা যাবে না। যেমন রোজা রাখা অবস্থায় রোগ বৃদ্ধি পেলে রোজা ভেঙ্গে ফেলা যাবে।

উপরোক্ত আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, প্রয়োজনে অবস্থা যদি ব্যাপক আকার ধারণ করে, মহামারী ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হতে থাকে তাহলে মসজিদে সকল ফরজ ও জুমার নামাজ বন্ধ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ। কেবল আযান দেয়াই যথেষ্ট । মসজিদের দরজাসমূহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। শুধু মাত্র আজান চালু থাকবে আর আজানকে সংক্ষেপ করা হবে। আর ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহর পর বলা হবে সাল্লো ফি বুওতিকুম (তোমরা বাড়িতেই নামাজ আদায় করে নাও)।

স্বয়ং রাসুল (স:) তার মুয়াজ্জিনকে এভাবে আজান দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, শীতের রাত/ বর্ষণ মুখর রাত /বাদলা রাত হলে রাসুল (স:) মুয়াজ্জিনকে একথা ঘোষণা করতে নির্দেশ দিতেন-(তোমরা বাড়ীতে নামায় আদায় কর) তোমরা নিজ অবস্থানস্থলে নামাজ পড়ে নাও।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস র. এক বৃষ্টিঝরা দিনে মুয়াজ্জিনকে বললেন। আজকের আজানে তুমি ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহর পর বলবে সাল্লো ফি রেহালিকুম (তোমরা বাড়িতেই নামাজ আদায় করে নাও)। এর পর আজানের বাকি শব্দ গুলো বলবে।

হাদিস বণর্নাকারী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস র. বললেন, এরূপ আজান দেয়া লোকজন অপছন্দ করলো বলে মনে হলো। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস র. বললেন তোমরা এই কাজকে আজগবি মনে করছ। অথচ যিনি আমার চেয়ে উত্তম তিনি এরুপ করেছেন। জুমআর নামায পড়া ওয়াজিব কিন্তু তোমরা কাদাযুক্ত পিচ্ছিল পথে কষ্ট করে চলবে। তা আমি পছন্দ করিনি।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম যে অতীব প্রয়োজনে ভয়াবহ পরিস্থিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জুমার নামাজ বাড়িতে পড়া যাবে। তবে জুমার নামাজ এবং জুমার নামাজের পরিবর্তে চার রাকাত যুহরের ফরজ নামাজ পড়তে হবে। বান্দার প্রতি আল্লাহর কত বড় অনুগ্রহ যে যৌক্তিক ওজরের কারণে কেউ যতি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামায জামাতে আদায় করতে সক্ষম না হয় তাতেও তাকে জামাতের সমতুল্য সওয়াব দান করা হবে। রসুল (স:) বলেছেন বান্দা যদি অসুস্থ হয় অথবা সফরে যায় তাহলে সে সুস্থ অবস্থায় যে আমল করত আল্লাহ তাঁকে তার সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন। (বুখারী)

সম্মানিত ভাইয়েরা, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা প্রতিরোধে সরকার কর্তৃক গৃহীত নির্দেশনাগুলো মেনে চলা সকলের উচিৎ। এছাড়া আল্লাহ আমাদেরকে আল্লাহর উপর ভরসা করার পর পার্থিব উপায় উপকরণ অবলম্বন করার যে নির্দেশ দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করাও শরীয়তের বিধান। আরবীতে একটি প্রবাদ আছে সতর্কতা চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। আল্লাহর নিকট দোয়া করি তিনি যেন আমাদের মাথার উপর থেকে এ মহাবিপদ উঠিয়ে নেন এবং আমাদের সবাইকে হেফাজত করেন।

আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ হেফাজতকারী ও সর্বাধিক দয়াশীল। পাশাপাশি আমরা সবাই তওবা করি, ক্ষমা প্রার্থনা করি।হযরত হুদ (আ:) তার সম্প্রদায়কে তওবা ও ইস্তেগফার এর নির্দেশ দিয়েছেন। সেইভাবে তওবা ও ইস্তেগফার করি।

হে আমার জাতির লোকেরা তোমাদের খোদার কাছে ক্ষমা চাও অতঃপর তার দিকে ফিরে এস। তিনি তোমাদের জন্য আকাশের দোয়ার খুলে দেবেন এবং তোমাদের বর্তমান শক্তি ও ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করে দিবেন। অপরাধী লোকদের মত বন্দেগী হতে মুখ ফিরিয়ে থাকনা।

সম্মানীত ইমানদার ভাইয়েরা!
নিঃসন্দেহে এই করোনা ইমানদার মানুষের জন্যে পরীক্ষা ও রাহমত স্বরূপ। এই রোগে কোন ইমানদার মানুষ মারা গেলে তিনি শহীদ হবেন আর এই করোনা অমুসলিমদের জন্যে গজব স্বরূপ। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ইমান এর পরীক্ষা নিচ্ছেন। বিপদ আসলে মুমিনকে অনুতপ্ত হতে হবে, নামাজ পড়তে হবে, নামাজ পড়ে পড়ে তওবা ও ইস্তেগফার করতে হবে। মুমিনের উচিৎ এই মুহুর্তে বেশী বেশী দোয়া ইউনুস পড়া এবং নিম্নের দোয়াগুলো বেশী বেশী করে পড়া।

রাসূল (স:) বলেছেন, কোন সম্প্রদায়ের মাঝে যখন বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে এবং তাদের মাঝে মহামারীও এমন রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। (ইবনে মাজা) তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি গোনাহ, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অন্যায়-অবিচার বর্জনের আহবানও আসা উচিৎ। সুতরাং এ মুহুর্তে আমাদের করণীয় হলো-
১। পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে এসে আদায় করা, তওবা করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
২। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের উচিৎ জনসমাগমে ও মসজিদে না আসা।
৩। প্রতি ঘরে নামায ও কোরআন তেলাওয়াত চালু করা।
৪। রেডিও ও টেলিভিশনে কুরআনের চ্যানেল চালু করা।
৫। গাড়ি, দোকানপাটে সর্বত্রই কোরআন তেলাওয়াত চালু করা।
৬। ওয়াজ মাহফিলের ক্যাসেট চালু করা।
৭। বেশী বেশী দোআয়ে ইউনুছ পাঠ করা।—–
৮। বেশী বেশী ইস্তেগফার করা। —-
৯। বেশী বেশী কোরাআন খতম চালু করা।
১০। বুখারী শরীফের খতম চালু করা।
১১। মসজিদে মসজিদে দুআ খানির ব্যবস্থা করা।
১২। মহল্লায় মহল্লায় যুবকদেরকে নামায পড়ার জন্য আহবান করা।
১৩। মহিলাদের বেহায়পনা রোধ করা।
১৪। আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা ও আল্লাহেকে বেশী বেশী ভয় করা।
১৫। আত্মসমালোচনা করা।
আল্লাহ আমাদেরকে মহামারীর ছোবল থেকে রক্ষা করুন। আমীন

অধ্যক্ষ আল্লামা মাহমুদুল হক
খতীব, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কক্সবাজার
মোবাইলঃ ০১৮১৪ ৭৭ ৪৮ ৬১

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •