•  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  

সিবিএন ডেস্ক

চীনের অন্যান্য অংশের মতো না হলেও ২৫ জানুয়ারি নিজেদের মতো করে নববর্ষ উদ্‌যাপনের অপেক্ষায় ছিলেন উহানের লোকজন। যদিও ১০ জানুয়ারি করোনাভাইরাসে প্রথম রোগীর মৃত্যু আর উহানকে ওই রোগ সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার পর লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল। সরকারের তরফে বারবার বলা হচ্ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে। ২৫ জানুয়ারি নতুন বছরের ঠিক দুদিন আগে উহানকে অবরুদ্ধ বা লকডাউনের সরকারি ঘোষণায় স্থানীয় লোকজন তো বটেই, সারা পৃথিবী চমকে উঠেছিল। রোগের দ্রুত বিস্তারের কারণে ১ কোটি ১০ লাখ লোকের শহরকে অবরুদ্ধ করা হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। লোকজনকে ঘরবন্দী বা কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে দিনের পর দিন। এ কী করে সম্ভব!

সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে উহান আর চীন সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আপাতত করোনাভাইরাস নামের সংক্রামক ব্যাধিকে প্রতিরোধ করতে পেরেছে। জানুয়ারি থেকে গড়ে প্রতিদিন যেখানে অন্তত হাজারখানেক লোক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতেন, সেটা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অথচ ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো এক দিনেই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। ওয়ার্ল্ডোমিটারের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৭ হাজার ১৭১ জন। মারা গেছেন ৩ হাজার ২৭৭ জন। আর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৭৩ হাজার ১৫৯ জন।

মৌলিক অধিকার বনাম ব্যাপক জনস্বার্থ
চীন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, তা কারও অজানা থাকার কথা নয়। চীনের পদক্ষেপ অত্যন্ত কঠোর আগ্রাসী বলে চিহ্নিত হয়েছিল। লোকজন ‘লকডাউন’ শব্দটা নতুন করে শিখেছেন। অবরুদ্ধতা ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতার লঙ্ঘন বলে প্রশ্নও তুলেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মৌলিক স্বাধীনতা কি জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

একটু পেছনে ফিরে তাকালে নাইন–ইলেভেনের বোমা হামলার পর পৃথিবীজুড়ে বিমানবন্দরগুলোয় যাত্রীদের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি আমাদের নিশ্চয় মনে থাকার কথা। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থার শুরু তখন থেকেই। প্রাথমিকভাবে লোকজন এটিকে বাড়াবাড়ি বলতে শুরু করেছিলেন। পরে প্রমাণিত হলো, বিমানবন্দর এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

উহানকে কোয়ারেন্টিন করার মধ্য দিয়ে চীন যে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপকতর এক আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছে, এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কঠোর পদক্ষেপগুলো লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যু আর আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

চীনের সাফল্যের পাঁচ মন্ত্র
চীনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন সিজিটিএন বা চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–বিষয়ক সম্পাদক মার্কো শানের মতে, এখন পর্যন্ত কোভিড–১৯ নিয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা চীনের, সেটা বলাই বাহুল্য। চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যেখানে প্রতিদিন এক শর নিচে নেমে এসেছে, সেখানে বাকি পৃথিবীকে নতুন এই ভাইরাস তাড়িয়ে ফিরছে।

৫ মার্চ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সিজিটিএন একটি জরিপ চালায়। জরিপে প্রশ্ন ছিল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চীন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে ছিল উহানকে অবরুদ্ধ করা, ১৪ দিনের ঘরবন্দী বা কোয়ারেন্টিন এবং বাড়িতে বসে প্রত্যেকের কাজ করার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৪ শতাংশ চীন সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন দেন। আর ২৬ শতাংশ জানান, তাঁরা ওই পদক্ষেপগুলোকে সমর্থন করেন না। অর্থাৎ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বলেছিলেন, চীনের পদক্ষেপগুলো যথার্থ ছিল।

চীনের হুবেই প্রদেশের মানুষ ফিরতে শুরু করেছে। ছবি: এএফপিচীনের হুবেই প্রদেশের মানুষ ফিরতে শুরু করেছে। ছবি: এএফপিমূলত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীন পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রথমত তিন দিনের মধ্যে উহানকে অবরুদ্ধ করে ফেলা। ২৩ জানুয়ারি চীন সরকার ঘোষণা করেছিল, শহর থেকে কারও যাওয়া এবং প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটি বেশ কঠিনই ছিল। কারণ, তখনই এটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, একে অপরের সান্নিধ্যে এলেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। এর ফলাফল কী হতে পারে, সেটাও কারও জানা ছিল না। মানচিত্রে চোখ রাখলেই দেখা যাবে, চীনের কেন্দ্রে হুবেই প্রদেশের অবস্থান। মনে রাখতে হবে, ২৫ জানুয়ারি ছিল চীনা নববর্ষ। ঠিক তার দুদিন আগে এক দিনের ঘোষণাতেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে উহান। প্রিয়জনের সঙ্গে নববর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য লোকজন তখন বাড়ি ফিরছিলেন। ভাবা যায়, ওই সময় উহানকে অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরিণতি কী হতে পারত!

চীনের রোগতত্ত্ববিশারদ ঝং নানশেন বলেন, ‘উহানকে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে লোকজন ভুল বুঝতে পারেন। আমি তো মনে করি, এর কোনো বিকল্পই ছিল না। এই সিদ্ধান্ত নিতে দুদিন দেরি হলেই করোনাভাইরাস উহান থেকে সমগ্র চীন আর চীন থেকে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ত।’

দ্বিতীয়ত, ১০ দিনের মধ্যে জরুরি হাসপাতাল নির্মাণ। শ্লথগতিতে কাজের জন্য চীনের দুর্নাম নতুন নয়। তবে সংকটের কালে চীন অতীতের দুর্নাম পুরোপুরি ঘুচিয়ে ফেলেছে। একেবারে শূন্য থেকে ১০ দিনের মধ্যে হাসপাতাল। রীতিমতো অবিশ্বাস্য! কারণ, উহানের সব কটি হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ভিড়ে উপচে পড়ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন হাসপাতাল খোলা ছাড়া কোনো পথ ছিল না। সাধারণত একটি হাসপাতাল তৈরিতে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ লাগে। আর এক হাজার শয্যা এবং ৩০টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের হাসপাতাল তৈরি হয়। সারা দেশ থেকে সেনাবাহিনীর সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উহানে নিয়ে এসে হাসপাতাল তৈরি ও পরিচালনার কাজে লাগায় চীন।

তৃতীয়ত, ১৪ দিনের ঘরবন্দী। হুবেই প্রদেশের কারও সঙ্গে যোগাযোগ থাকে, তবে তাকে ১৪ দিন বাড়িতে থাকতে হবে। কেউ শহরের বাইরে গিয়ে থাকলেও তাকে ১৪ দিন মানতে হবে। শহরের বাইরে গেছে, এমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে একই রুমে বসবাস করলে ১৪ দিনের সময়কাল মানতে হবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তির কাছাকাছি গিয়ে ১৪ দিনের শর্ত মানতে হবে। শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ১৪ দিনের ঘরবন্দী বা কোয়ারেন্টিনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওই সময়টা হচ্ছে ইনকিউবেটরের কাল কোভিড-১৯–এর জন্য।

চতুর্থত, জীবনাচারে পরিবর্তন আনা। যাঁরা বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আপাতত বাদ দিয়েছেন, যেখানে আছেন পরের ১৪ দিন সেখানেই থাকবেন—এ বিষয়গুলো কিন্তু সহজ ছিল না। মুভি থিয়েটার, পার্ক, আর্ট গ্যালারি, জাদুঘর বন্ধ ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ হাতে গোনা কয়েকটি রেস্তোরাঁ, সুপার স্টোর খোলা ছিল। ব্যবসায়িক কাজ হয়েছে কয়েক জায়গাতে। সেখানেও নেওয়া হয়েছিল বিশেষ ব্যবস্থা। ফেস মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক ছিল। বন্ধ কোনো জায়গায় আপনি পা ফেলতে পারবেন না শরীরের তাপমাত্রা মাপার আগে। কোন কোন এলাকায় ফরম পূরণ করতে হয়েছে। সেই ফরমে নাগরিকদের লিখতে হয়েছে তিনি কোথায় কোথায় গিয়েছেন, কী ধরনের যানবাহন ব্যবহার করেছেন। কাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে ইত্যাদি।

পঞ্চমত বাড়ি থেকে কাজের বিষয়টি নিশ্চিত করা। অপ্রত্যাশিত এক পরিস্থিতি থামিয়ে দিয়েছিল চীনের অর্থনীতির চাকা। কাজেই বাড়িতে বসে তো অলস সময় কাটানোর সুযোগ নেই। লোকজন বাড়িতে বসে শুধু কাজই করেছেন, তা নয়। অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন। খাবারের অর্ডার দিয়েছেন।

জরুরি এই পরিস্থিতির মুখে চীন দ্রুততার ওপর জোর দিয়েছিল। স্বল্পতম সময়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে এসব পদক্ষেপের বাস্তবায়ন হয়েছিল। সারা বিশ্বকে জন্য করোনাভাইরাস যখন বড় হুমকি সে সময়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের উহানে আবার কাজকর্ম শুরু হয়েছে। হুবেই, চীন, ২৪ মার্চ। ছবি: এএফপিচীনের উহানে আবার কাজকর্ম শুরু হয়েছে। হুবেই, চীন, ২৪ মার্চ। ছবি: এএফপিঅবরুদ্ধ সময়ের শুরুটা
সময়টা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের বেশ কিছু লোক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ হুয়ানান সিফুড হোলসেল মার্কেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেখানে বন্য প্রাণী বিক্রি করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, প্রাণী থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের বিজ্ঞানীরা তাৎক্ষণিকভাবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন বলে অভিহিত করেন।

নতুন ওই রোগে আক্রান্ত প্রথম রোগী মারা যান এ বছরের ১০ জানুয়ারি। সংক্রমণের শিকার হওয়া বাকি ৪৭ জনও একই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়। ১২ জানুয়ারির মধ্যে চীনের পড় প্রদেশগুলোয় সংক্রমিত হতে থাকে করোনাভাইরাস। তত দিনে ১৭ জন মারা যান। আর আক্রান্ত হন ৫৭১ জন। শুধু চীন নয়, হংকং, ম্যাকাউ, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

চীনের কর্তৃপক্ষ ২৩ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর উহানে বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজ ও ফেরি চলাচল সকাল ১০টা থেকে বন্ধের ঘোষণা দেয়। সরকারি আদেশের পরপরই বন্ধ হয়ে যায় উহান বিমানবন্দর, উহান রেলস্টেশন ও উহান মেট্রো। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া স্থানীয় লোকজনের উহান ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অবশ্য নির্দেশ জারির পরপরই লোকজনের উহান ছাড়ার ঢল নামে। চীনের গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টায় উহান অবরুদ্ধ বা লকডাউন হওয়ার আগেই অন্তত ৩ লাখ লোক উহান ছেড়ে যায়। দুপুরের মধ্যেই উহানের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। উহানকে অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয় চীনা নববর্ষের ঠিক দুদিন আগে। চীনের সবচেয়ে বড় উৎসবের এই সময়টা পর্যটনের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। চীনের লাখ লাখ লোকজন বছরের এই সময়টাতে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ান।

উহানের উপস্থিতি আর গুরুত্ব
মধ্য চীন তো বটেই, সমগ্র চীনের সবচেয়ে জনবহুল শহর উহান। এ মুহূর্তে চীনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান। শহরটি অনেকগুলো রেল, সড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে চীনের অন্য শহরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। উহানকে কখনো কখনো চীনের ‘শিকাগো’ বলা হয়ে থাকে। কয়েক দশক ধরে চীনের শিল্পোৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত উহান চীনের আধুনিক শিল্পের বিকাশক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে। শহরটিতে তিনটি জাতীয় শিল্পাঞ্চল, চারটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি উন্নয়ন পার্ক, ৩৫০ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ১ হাজার ৬৫৬টি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চীনের প্রধান মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডংফেং মোটর করপোরেশনের সদর দপ্তর উহানে। চীনের তৃতীয় শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উহান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে শহরটিতে। ২০১৭ সালে ইউনেসকো উহানকে ‘সৃজনশীল শহরের’ স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ইউরোপের শেখার আছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ইউরোপকে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে বলেছে। ডব্লিউএইচওর মতে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, কার্যকর ও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। অভাবনীয় এক ঝুঁকিকে সামনে রেখে চীনের জনগণসহ সবার অভিন্ন অঙ্গীকারের কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের পদক্ষেপ কাজে লেগেছে। তবে চীনের মডেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

তবে চীনের অনুসরণে ইউরোপের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ ও ডব্লিউএইচওর জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক লরেন্স গস্টিন বলেছেন, ‘যেসব সমাজে সামাজিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি নেই এবং বাড়াবাড়ি রকমের গোয়েন্দা নজরদারি অনুপস্থিত, সেখানে ওই মডেল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আমি সন্দিহান।’ তাঁর মতে, গণহারে লোকজনকে ঘরবন্দী করাটা অন্যায়। আর পশ্চিমের জনগণ চীনের কায়দায় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা নজরদারিকে বুড়ো আঙুল দেখাবে।

চীনের হুবেই প্রদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের জীবানুমুক্ত করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্সচীনের হুবেই প্রদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের জীবানুমুক্ত করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্সপ্রোপাগান্ডা লড়াইতে বিজয়ী
করোনাভাইরাস মোকাবিলার সময় চীনকে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ঝড়ও প্রতিনিয়ত সামলাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রোপাগান্ডা লড়াইতেও দেশটি জয়ী হয়েছে।

ব্রাসেলসভিত্তিক গণমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের প্রধান কৌশল ছিল সে দেশ থেকে সংক্রমিত ভাইরাস থেকে মানবতাকে সুরক্ষায় নেতৃত্বদান। চীন যে সময় সামনে এগিয়ে এসেছে, সে সময়টাতে ইউরোপ এক হয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। আর চীনের দিকে আঙুল তুলেই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র।

প্লেনবোঝাই মাস্ক, ভেন্টিলেটর আর চিকিৎসকদের পাঠিয়ে সারা বিশ্বের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। চীনা ধনকুবের জ্যাক মা লাখ লাখ মাস্ক আর টেস্টিং কিট পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপ, আফ্রিকাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে।

ইউরোপ তো বটেই, এ মুহূর্তে সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের ছোবলে পর্যুদস্ত ইতালি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইতালির রাষ্ট্রদূত মরিজিও মাসারি জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসামগ্রী সহায়তায় জোটের দেশগুলোর ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। পলিটিকোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মরিজিও মাসারি লিখেছেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে কমিশনের আহ্বানে ইইউর একটি দেশও সাড়া দেয়নি। একমাত্র চীন এগিয়ে এসেছে। ইউরোপের সংহতির দিক থেকে দেখলে এটি মোটেই ভালো লক্ষণ বলা যাবে না।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সহায়তার জন্য স্বাস্থ্যসামগ্রী ও চিকিৎসকদের বহনকারী চীনের উড়োজাহাজের ইতালি পৌঁছানোর খবর নিজের ফেসবুকে ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করেছেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইগি ডি মাইও।

যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে চীনের সাফল্যের পরও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সমালোচকদের মতে, করোনাভাইরাসে ব্যাপারে চীনের কর্তৃপক্ষ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সঠিক তথ্য প্রকাশ করেনি। কাজেই সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শুরুতে সার্সের মতো ভাইরাসের প্রকোপের বিষয়ে চীনের যেসব নাগরিক অন্যদের সতর্ক করেছিলেন, তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেটা কেউ জানে না। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির বিষয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করেছিলেন উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং। দেশে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে পৃথিবীজুড়ে হুইসেল ব্লোয়ারের খ্যাতি পাওয়া ওই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ‘মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছেন’ এই মুচলেকা দেওয়ার পর মুক্তি পান লি ওয়েনলিয়াং। অবশ্য রাত দিন রোগীদের সেবা দিনে ক্লান্ত লি শেষ পর্যন্ত করোনার ছোবলে ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। পরে এ বিষয়ে তদন্তে বের হয়ে এসেছে লির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক ছিল না।

চীনের জনগণের একাংশ আগ্রাসীভাবে লোকজনকে ঘরবন্দী করে রেখে নজরদারির কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, সংকটের শুরুতে পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দেয়নি। পাশাপাশি যত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করছে, আসলেই তা নেয়নি।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানের শিক্ষক হেইফ্যায় হুয়াং ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, তবে চীনের সরকারি প্রচারমাধ্যম তো ভাইরাসের সংক্রমণে যে বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে তো কিছু লেখেনি। লি ওয়েনলিয়াংয়ের মতো চিকিৎসকের কণ্ঠরোধসহ অবাধ তথ্য প্রবাহের ঘাটতি কতটা ছিল? করোনাভাইরাসকে পুরোপুরি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, শুধু সেটাই প্রচার করে গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য হচ্ছে, সফলভাবে সংক্রামক ব্যাধি দমনের মধ্য দিয়ে চীনের শীর্ষ নেতারা এটাই প্রমাণ করতে চাইছেন যে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তই যথার্থ। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ ক্রমে বেড়েই চলেছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকা
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ফেলো মো. শহীদুল হক মনে করেন, উহানকে অবরুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে চীন যেভাবে করোনাভাইরাসের ফলে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে সামাল দিয়েছে, তা বিশ্বের সবার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চীন সরকার তাদের সিদ্ধান্ত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে মানতে বাধ্য করেছে। কারণ, জানুয়ারিতে ওই পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণের বিস্তার ঘটতে পারত। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। নিজের দেশে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে চীন এখন ইতালিসহ বিশ্বের নানা দেশে স্বাস্থ্যসামগ্রী ও বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়ে সংকট কাটাতে ভূমিকা রাখছে। ইউরোপ নিজে যখন সংকটে ঐকমত্যে আসতে পারছে না, সেখানে চীনের এই ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। করোনাভাইরাস বিশ্বের রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন করে সামনে আনলে তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পাশাপাশি এত বড় ধাক্কার পর চীনের অর্থনীতি সচল হতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে আগামী দিনে চীনের ভূমিকা সারা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার আভাষ পাওয়া যাচ্ছে।

এখানেই লড়াইয়ের শেষ নয়
দুই মাস পর উহানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। লোকজন বাড়ি ছেড়ে কাজে ফিরছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালুর প্রস্তুতি চলছে। জনশূন্য সড়কগুলোয় মানুষের পদচারণ শুরু হয়েছে। কেটে যাচ্ছে লোকজনের ভীতি। এরপরও চীনের কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনই জয়ের ঘোষণা দিতে দ্বিধায় দুলছেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির উপপ্রধান চেন ইয়াংশিন বলেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।’


  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
 cbn