মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

যে শহরে রাত দিনের কোন তফাৎ থাকতোনা, সিজন, আনসিজন বলে কোন কথা থাকতো না, সবসময় জনারন্যে কোলাহলে মুখর থাকতো। সই প্রিয় শহর কক্সবাজার, এখন বলতে গেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। কারণ গত এক সপ্তাহ ধরে কোন পর্যটক কক্সবাজারে আসতে দেওয়া হচ্ছেনা। অথচ ঈদ, কোরবান, পয়লা বৈশাখ, ৩১ ডিসেম্বর সহ প্রায় উৎসব পালন করতেও মানুষ এখন কক্সবাজার চলে আসে।

নীচু, মাঝারী, তারকামানের সহ কক্সবাজারের অর্ধ্ব সহস্রাধিক আবাসিক হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বীচে ও সমুদ্রে নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আসছেনা পিকনিকের গাড়ি, যাচ্ছেনা সেন্টমার্টিনের সারি সারি পর্যটকবাহী জাহাজ। পুরো পর্যটন শিল্প যেন অঘোষিত ‘লক ডাউন’ হয়ে গেছে। গত দু’দিন ধরে সন্ধ্যা হলেই মনে হয়, যেন কার্ফিউ জারী করা একটি শহর।

বিদায় করে দেওয়া হয়েছে আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট গুলোর লক্ষ লক্ষ কর্মকর্তা কর্মচারীদের। সরকারি নির্দেশনা মানাতে সিভিল আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ২৪ মার্চ বিকেল থেকে নামানো হয়েছে সেনা ফৌজ। একইদিন বিকেল থেকে বাড়িঘর হতে বের হতে পারছেন না স্থানীয় মানুষজন। চলছেনা গণ পরিবহন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওষুধ, অত্যাবশ্যকীয় পন্যের দোকান ছাড়া বাকী সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকান পাট। ২৫ মার্চ বিকেল থেকেই মনে হচ্ছে টানা ১০ দিনের কড়া হরতাল পালন করা হচ্ছে। মানুষের চেহারায় আতংক আর শংকা ভেসে উঠেছে। মানুষ প্রতি মুহুর্ত মনে করছে, এইতো বুঝি সেই বৈশ্বিক ভয়ংকর মহামারী করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত হলাম।

করোনা ভাইরাস নামক মহা আতংকের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ সহ অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। সন্ধ্যা থেকে মানুষ নিজ নিজ বাড়ি ঘরে আছে কিনা, নাকি কেউ এখনো বাইরে আছেন, তার জন্য নামানো হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে মোবাইল কোর্ট। এ অবস্থায় রাত্রিকালীন প্রিয় শহর কক্সবাজারে নেমে এসেছে শুনশান নীরবতা। শহরের উঁচু দালান থেকে কেউ উঁকি মেরে দেখলেই মনে এক আতংক জাগে। ভুতুড়ে এ পরিবেশ কেউ মেনে নিতে নাচাইলেও সর্বনাশা ডাইনী করোনা ভাইরাস রাজা বাদশা, উজির নাজির, ফকির মিসকিন কাউকে ছাড় দিতে রাজী নয়। করোনা ভাইরাসের এ ভয়াবহ তান্ডব আরো কতোদিন থাকবে তাও সুনির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেননা। আগ্রাসী এ তান্ডবতা যেন ক্রমান্বয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। ব্যাপকতা বাড়ছে আর বাড়ছে। কেড়ে নিয়েছে সামাজিক বন্ধন, তছনছ করে দিয়েছে করোনা ভাইরাসের হিংস্র থাবায় প্রিয় শহর কক্সবাজারের জৌলুশ। পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে গড়ে উঠা ক্ষুদ্র, ছিন্নমূল ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো ভেংগে চুরমার হয়ে গেছে। কেউ কাউকে মানবতা দেখানোর কোন সুযোগ নেই। যেন কেয়ামতের এক আলামত। বন্ধ হয়ে গেছে, বিমান ও নৌ চলাচল। বলতে গেলে নিজেরাই নিজেদেরকে বন্দী করে রেখেছি, বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস এর ভয়ে। কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে পারছেননা। এ্যামবুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, গণমাধ্যম, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ অত্যাবশ্যকীয় গাড়ি গুলো ছাড়া আর কোন গাড়ি চলছে না। এককথায় বিশ্ববাসীর শ্বশুর বাড়ি হিসাবে খ্যাত, বিনোদন ও অবকাশ যাপনের অন্যতম শহর আমাদের প্রিয় কক্সবাজার যেন আতংকময় এক ভুতুড়ে নগরী। আল্লাহ তুমি এ ভীবিষিকাময় দমবন্ধ হওয়া পরিবেশ থেকে আমাদের সুরক্ষা করো।

(ছবিঃ রাতের শহর কক্সবাজার, সাংবাদিক ইমরুল কায়েসের টাইমলাইন থেকে।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •