রেজাউল করিম চৌধুরী:
করোনার সংক্রামণ ঠেকাতে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ লকডাউন আসলে সম্ভব কি না? সন্দেহ। আর্থিক সমস্ত কার্যক্রম, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ পুরো বন্ধ করে দিয়ে লকডাউন ইউরোপ আমেরিকার কিছু দেশে সম্ভব, ইউরোপের বাস্তবতা আর আমাদের বাস্তবতা এক নয়। ইউরোপের অনেক উন্নত দেশ এটা হয়তো করতে পারে, কারণ তাদের পর্যাপ্ত রিজার্ভ রয়েছে। নরওয়ে এবং সুইডেনের মতো দেশের এত পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে যে তারা ইচ্ছে করলে তাদের নাগরিকদের ১৫০ থেকে ২০০ বছর খাওয়াতে পারে, তাদের গড় আয় ৫০০০ ডলারেরও বেশি, আমাদের মাথাপিছু আয় সবেমাত্র ২০০০ ডলার ছুঁই ছুঁই করছে মাত্র। আর আমাদের জিডিপি ও করের অনুপাত ১০%, আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ বেশিরভাগ সময় কম ৮০% হয়। প্রায় ৪০% জনগণ মজুরি ভিত্তিক কর্মসংস্থানের উপর নির্ভরশীল, ২৩% অতি দরিদ্র, ৩০ থেকে ৪০% জনসংখ্যা শহুরে দরিদ্র। আমাদের সরকার চাইলেও সরকারি এবং বেসরকারি কর্মীদের সম্পূর্ণ লক ডাউন করে, নাগরিক ও শ্রমজীবী এবং দরিদ্র উদ্যোক্তাদের খাওয়ানো-পরানোর দায়িত্ব নিতে সক্ষম হবে কিনা সন্দেহ। কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত লক ডাউন হচ্ছে। দরিদ্র মানুষগুলোর কষ্টের কথা আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের পর্যালোচনা করে দেখতে হবে ইতিমধ্যে পণ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কিভাবে এক ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। মাইক্রো এবং ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্তরে লকডাউনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করতে হবে, যেহেতু আমাদের অনেক ভাল চিকিৎসক রয়েছে, তাদের পরামর্শ নিতে হবে। কিভাবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অতিপ্রয়োজনীয় খাতগুলো চালু রাখা যায়, কিভাবে আমাদের কৃষকরা কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারেন, কিভাবে ছোটখাট কারখানাগুলো-ব্যবসাগুলো চালু রাখা যায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসাগুলো কিভাবে চালু রাখা যায়- সে বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তর চিন্তা ভাবনা করে দেখা উচিৎ যাতে কৃষি এবং অকৃষি ক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদনের ক্ষতিটা যথাসম্ভব কমিয়ে রাখা যায়। পাশ্চাত্য অভিজ্ঞতা অন্ধভাবে অনুসরণ করলে হবে না। আমাদের নিজের পথটি, নিজের সিদ্ধান্তটি নিতে হবে নিজেদের বাস্তবতা বিবেচনা করে। আমাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষিকাজে (খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ভাত, গবাদি পশু, মাছে উদ্বৃত্ত উৎপাদন) ’ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র্যময় রফতানিতে” (কেবল পোশাক নয়, চিকিৎসা, চামড়া ইত্যাদিতেও) বাধা সৃষ্টি করার আগে শতবার চিন্তা করতে হবে। এই উৎপাদন ও সরবরাহের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমাদের আর্থিক পরিষেবাগুলিকে সর্বস্তরে ন্যূনতমভাবে বিঘ্নিত রাখতে হবে। আমি বিশ্বাস করি কম দামে বাড়িতে বা স্থানীয়ভাবে তৈরি জীবানুনাশক দিয়ে ট্রাক, পরিবহন, রাস্তাঘাট এবং মানুষজনকে জীবানুমুক্ত করে রাখা সম্ভব, যা ইতিমধ্যে মানুষই প্রমাণ করেছে। ৩ ফিট দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া এবং মাস্ক পরা, প্রতিদিন দু’বার গোসল করা, প্রতিদিন কাপড় ধুয়ে ফেলা, জুতো জীবাণুমুক্ত করার মতো অভ্যাসগুলো করতে হবে। শিশু এবং বয়স্কদের বিশেষ যত্নে রাখতে হবে। আমার ধারণা আগামী রমযান মসে, গরম এবং বর্ষা আবহাওয়া আমাদের এই সংকট থেকে মুক্তিতে সহায়তা করবে। সর্বোপরি আমাদের একটি সক্রিয় সরকার আছে এবং আমরা পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম একটি জাতি। গতকাল সরকারের পক্ষ থেকে যে সংবাদ সম্মেলন করে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ লকডাউন নয়। এটা হচ্ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ। বলা হয়েছে সীমিত আকারে হলেও ব্যাংক চলবে, পরিবহন চলবে, জরুরি পরিষেবাগুলো চরবে, কাঁচাবাজার এবং গণপরিবহন চলবে, স্বাস্থ্য আচরণ মেনে গার্মেন্টস চলবে। তবে সচেতন নাগরিক হিসেবে খুব জরুরি প্রযোজন না হলে আমরা কোনভাবেই ঘরের বাইরে যাব না।

রেজাউল করিম চৌধুরী
প্রধান নির্বাহী, কোস্ট ট্রাস্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •