হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

মি’রাজ রাসূল (স.) এর জীবনের ঐতিহাসিক ঘটনা এবং বিস্ময়কর মু’জিয়া। মি’রাজের আভিধানিক অর্থ উর্দ্ধারোহন, সিড়ি বা সোপান, আকাশ ভ্রমন ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন পূর্বক তথা হতে সপ্তাকাশে ভ্রমন করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ঘটনাই মি’রাজ নামে অভিহিত। যা রাসুল (স.) এর মদীনায় হিজরতের এক বছর আগে তথা নবুওয়াতের দশম বছরে সংঘটিত হয়েছিল । মি’রাজের স্বীকৃতি স্বরূপ মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- পবিত্র ও মহিমাময় সত্ত্বা তিনি, যিনি তাঁর বান্দাহ্কে (হযরত মোহাম্মদ স.) রাত্রি বেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্বসা পর্যন্ত ভ্রমন করিয়েছিলেন। যার চারদিকে আমি পর্যন্ত বরকত দান করেছি। তাঁকে আমার নিদর্শন সমূহ দেখানোর জন্য । নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সূরা বনী ইসরাঈল আয়াত নং- ০১)

আল্লাহতায়ালার অপূর্ব নিদর্শন সমূহ স্বচক্ষে প্রিয় হবীবকে প্রত্যক্ষ করানোই ছিল মি’রাজের প্রধানতম উদ্দেশ্য। যাতে করে তিনি উম্মতকে এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে পারেন। উল্লেখিত আয়াতের অংশ বিশেষ ‘লি-নুরিয়াহু মিন আয়াতিনা’ (আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য) দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, মি’রাজের তাৎপর্য অত্যন্ত সুগভীর এবং এর ফলাফল সুদুর প্রসারী । মি’রাজ দুনিয়া ও আখিরাতের উন্নতির সোপান। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, মি’রাজ শুধু মাত্র একটি বিস্ময়কর ঘটনা নয়; বরং এতে নিহিত রয়েছে মানব জাতির জন্য কল্যাণময় অনেক শিক্ষা। নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে এ সম্পর্কে আলোচনার প্রয়াস পাচ্ছি। মি’রাজের মহানবী (স.) যা প্রত্যক্ষ করেন :- নবীজী (স.) ঐতিহাসিক মি’রাজের মাধ্যমে আসমান-জমীনে আল্লাহর বাদশাহী প্রত্যক্ষ করেন এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সৌভাগ্য অর্জন করেন। জান্নাত, জাহান্নাম ও হাউজে কাওসার পরিদর্শন করেন এবং সেখানে এমন কিছু খন্ডচিত্র প্রত্যক্ষ করেন যা থেকে শিক্ষা নেওয়া আমাদের জন্য অপরিহার্য । হাদিছের কিতাব সমূহে এর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

মি’রাজের শিক্ষা :

এক. মা’রিফাতের নামে দ্বীন ও দুনিয়া বিমুখ না হওয়া: মহানবী (স.) মি’রাজের মাধ্যমে আল্লাহর দিদার ও সান্নিধ্য অর্জন করে মা’রিফাতের শীর্ষে অসীন হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশাল সফলতা ও সৌভাগ্য অর্জন করেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় হল, চরম উৎকর্ষ সাধনের পরও মহানবী (স.) দ্বীন ও দুনিয়া বিমুখ হননি। অথচ বর্তমানে এক শ্রেণীর ভ্রান্ত লোক পবিত্র নামাজসহ প্রকৃত ইবাদত-বন্দেগী ছেড়ে দিয়ে মা’রিফাত লাভ ও চর্চার নামে মনগড়া গর্হিত আচার অনুষ্ঠানে মগ্ন হয়ে পড়ে। আরেক শ্রেণীর লোক মা’রিফাতের নামে একেবারেই দুনিয়া বিমূখ হয়ে যায়। যা কখনো শরিয়ত সমর্থন করে না।

দুই. সমাজ সচেতন হওয়া: আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভই একজন মু’মিন বান্দাহর চাওয়া-পাওয়ার চূড়ান্ত সীমা। এর পর আর কোন আশা-প্রত্যাশা থাকার কথা নয়। কিন্তু মি’রাজের পর রাসুল (স.) এর সমাজ চেতনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলশ্রুতিতে তিনি পৃথীবিতে ফিরে এসে কল্যাণময় রাষ্ট্র ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন এবং মদীনায় একটি সার্বজনীন সফল ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন।

তিন. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা : পবিত্র নামাজ মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট অতীব মর্যাদপূর্ণ ইবাদত। বিধায় অন্য সব হুকুম-আহকাম জিব্রাইল (আ.) এর মারফতে দুনিয়াতে নাজিল করলেও পবিত্র নামাজের বিধান রাসূল (স.) কে সরাসরি আল্লাহর সান্নিধ্যে আমন্ত্রন পূর্বক মি’রাজের মত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় উম্মাতের জন্য হাদিয়া স্বরূপ দান করেন। যা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নির্ধারণ করা হলেও পরে পাঁচ ওয়াক্তে সকল ঈমানদারগণের উপর ফরজ করা হয়। অন্য ইবাদতের তুলনায় যেহেতু নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর তায়ালার অধিকতর নৈকট্য অর্জন সম্ভব সেহেতু নামাজকে মুমিনের মি’রাজ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে রাসূল (স.) ইরশাদ করেন ‘আসসালাতু মি’রাজুল মুমিনীন’ অর্থাৎ নামাজ মুমিনের মি’রাজ। নামাজ আদায়ের পবিত্র স্থান মসজিদ কেন্দ্র করে মি’রাজের সূচনা ও সমাপ্তি থেকে প্রতিয়মান হয় যে, মি’রাজের সাথে নামাজের কি গভীর সম্পর্ক। এই পবিত্র ইবাদত যদি প্রতিষ্ঠা লাভ করে, সারা বিশ্বে শান্তির ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে।

চার, আল্লাহর কুদরতে বিশ্বাস স্থাপন করা : মি’রাজের মত বিস্ময়কর ঘটনাবলী একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কুদরতেই সংঘঠিত হওয়া সম্ভব, এই মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করাও মি’রাজের অন্যতম শিক্ষা। উল্লেখ্য যে, রাসুল (স.) এর মি’রাজ জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে হয়েছিল বিধায় মক্কার কাফেরগন তাতে বিশ্বাস স্থাপনে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। স্বপ্ন যোগে হলে এটি তাদের মধ্যে তেমন আলোচিত হতো না। এ ছাড়াও স্বশরীরে রাসুল (স.) এর মি’রাজের সত্যতা সম্পর্কে অসংখ্য প্রমাণাদী কুরআন ও হাদীসে বিদ্যমান।

পাঁচ. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ পূর্বক আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে অটল থাকা : মি’রাজ মুমিনদেরকে মৌলিকভাবে এই শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালন করতে গিয়ে ঘাত-প্রতিঘাত, দুঃখ-দূর্দশা, নির্যাতন-নিপীড়ন আসবেই। মুমিনরা যদি এগুলোতে ধৈর্য্য ও সাহসিকতার পরাকষ্টা প্রদর্শন করতে পারে, তাহলেই সফলতা ও সার্থকতা অর্জিত হবে। আল্লাহর রহমতের বারিধারা তাদের উপর বর্ষিত হবে। মক্কা ও তায়েফ এর ময়দানে নির্যাতিত হওয়ার পর বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মি’রাজের মাধ্যমে মহিমান্বিত করার ঐতিহাসিক ঘটনা এর প্রকৃষ্ট নজির।

করণীয় : ঐতিহাসিক মি’রাজের ঘটনা দ্বারা জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব ও জান্নাতের সুফল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপনে ব্রতী হওয়াই ঈমানের দাবী। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ মুসলিম উম্মাহ মি’রাজকে পত্রিকা-বইয়ের পাতা ও সাময়িক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এর মুল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ফলে মানব জীবনের সর্বস্তরে বিরাজ করছে, অস্থিরতা ও অশান্তির বন্যা। আসুন! আমরা মি’রাজের প্রকৃত শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে সর্বক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রতিফলনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ মুসলমান হিসেবে জীবন-যাপন করি।

 

লেখক-
খতীব:
শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ, কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •