বাংলা ট্রিবিউন
করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার খবর রীতিমতো আতঙ্কিত করেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদেরও। গণমাধ্যম ও সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে করোনার খবর বেশ মনোযোগের সঙ্গেই শুনছেন দেশবাসী। তবে গত সপ্তাহে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর পর রাজধানীর ওষুধের দোকানগুলোতে ভিড় বেড়ে যায় ক্রেতাদের।যিনি জীবনেও স্যানিটাইজার ব্যবহার করেননি তিনিও ওষুধের দোকান ও শপিংমলগুলো গিয়ে জীবানুনাশকটির সন্ধান করতে থাকেন। ফলে সেদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজার থেকে নিঃশেষ হয়ে যায় স্যানিটাইজার এবং মাস্ক। তবে অব্যাহতহারে প্রবাসীদের দেশে ফেরা এবং কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশ না মেনে তাদের অবাধ চলাফেরার কারণে এই রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে কিনা সেই উৎকণ্ঠা এখন সর্বত্র। ইতোমধ্যেই ইংল্যান্ড ও তুরস্ক বাদে ইউরোপের বাকি দেশগুলো থেকে প্রবাসীসহ সব যাত্রীর দেশে আসা যাওয়া ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাতিল করা এবং একই তারিখ পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করায় এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও। সরকার আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিলেও হুজুগে পাগল এক শ্রেণির মানুষ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষিতে সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশংকায় সংরক্ষণের জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে খাদ্যপণ্য কিনছেন। রাজধানীর সুপার শপগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় দেখা যাচ্ছে। ক্রেতা সামাল দিতে এসব সুপার শপের কর্মচারিরা হিমশিম খাচ্ছেন। খুচরা বাজারগুলোতেও একই অবস্থা। কেউ কেউ কিনছেন শিশু খাদ্য, ও শিশুদের ডায়াপার। রাজধানীর একাধিক পাড়া, মহল্লা ও বাজারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আতঙ্কিত হয়ে সংরক্ষণের উদ্দেশে বাড়তি কেনাকাটা একেবারেই অহেতুক কাজ। বাজারে সব পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। ভয়ের কোনও কারণ নেই।

করোনার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও ফ্লাইট আসা-যাওয়া বন্ধ করেছে। স্থলবন্দরগুলোতে আমদানি-রফতানি বন্ধের উপক্রম। বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি তুলনায় কমে গেছে বলে জানা গেছে।

সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, করোনার প্রভাবে স্থলবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে, বিমান রুট বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যপণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। অপরদিকে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই সাধারণ মানুষ সাধ্য অনুযায়ী পণ্য কিনছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরকম সংকটের কোনও শঙ্কা নেই। বাজারে পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। প্রয়োজনে এমন পরিস্থিতিতে টিসিবিকে কাজে লাগানো হবে। সেভাবে প্রস্তুতিও রয়েছে।

রাজধানীর একাধিক পাড়া মহল্লা ও বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ মানুষ চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, লবণ কিনছেন বেশি। একইসঙ্গে কিনছেন জীবাণুনাশক ও শিশুদের ডায়াপার।

রাজধানীর সুপার শপ ‘স্বপ্ন’র কর্মচারী আতিকুর রহমান জানান, গত কয়েকদিন ধরেই পণ্য কিনতে ক্রেতারা ভিড় করছেন। তারা চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য কিনছেন বেশি। আগে প্রসাধনী ও বিলাসী পণ্যগুলোর বিক্রি বেশি হলেও এখন বেশি বিক্রি হচ্ছে চাল, ডাল, আটা, শুকনা মরিচ, লবণ, গুড়ো দুধ, শিশুখাদ্য, ডায়াপার, জীবাণুনাশক ওষুধ।

এদিকে, এর সুযোগ নিয়ে স্বপ্ন সুপার শপে বেশ কিছু পণ্যের দাম গত সোমবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কিছু ক্রেতা। খিলক্ষেত লেকসিটি সংলগ্ন স্বপ্ন সুপার শপে গত রবিবার (১৫ মার্চ) বাজার করেন সাবরিনা মুস্তারী নামে এক শিক্ষক। সেদিন ওই শপে পেঁয়াজ ৪২ টাকা, মিনিকেট স্ট্যান্ডার্ড চাল ৪২ টাকা,আলু ১৭ টাকা কেজি দরে কিনলেও পরদিন আবারও প্রয়োজন হওয়ায় তিনি এসে দেখতে পান পেঁয়াজের দাম ৫২ টাকা,মিনিকেট স্ট্যান্ডার্ড চাল ৪৩ টাকা,আলু ১৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে স্বপ্ন। প্রসঙ্গত:রবিবার সরকার ইউরোপের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে এবং সোমবার সকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ঘোষণা করে।

এর কারণ জানতে চাইলে ওই সুপারশপের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,স্বপ্ন সাধারণত রবিবারের পর থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পণ্যের দাম আপডেট করে না। তবে এবার সোমবার কেন পণ্যের দাম আপডেট করা হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। পণ্যের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়ে গেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

এদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারেও বেড়ে গেছে মানুষের কেনাকাটা। রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাজারের সততা স্টোরের মালিক মোহম্মদ সেলিম হোসেন জানান, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আটা, লবণ, শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে বেশি। গত দুদিন ধরে ক্রেতাদের মধ্যে বেশি করে এসব পণ্য কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, পাইকারি বাজার থেকে পণ্য পেতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। পণ্য সংকটের কোনও আলামত বা সংবাদ পাইনি।

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভালো রয়েছে। সংকটের কোনও সম্ভাবনা নেই। আপাতত পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ারও কোনও কারণ নেই। খুচরা বাজারের পণ্য সরবরাহ বা পণ্যের মূল্য পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা কোনও মন্তব্য করতে পারবো না।

এদিকে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, ক্রেতারা আতঙ্কিত হয়ে চাহিদার অতিরিক্ত পণ্য না কিনলে কোনও পণ্যের দাম বাড়বে না। করোনার প্রভাবে বাজারে কোনও পণ্য সংকটের সুযোগ নেই। আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য সরবরাহ করছি। ডিলারদের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ রয়েছে। এরপরেও বলতে পারি পরিস্থিতি যাই হোক, পণ্য সংকট হবে না।

এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহ পর্যবেক্ষণ করছে। এই মুহূর্তে বাজারে কোনও পণ্যের সংকট নাই। আগামী এপ্রিল মাস থেকেই রোজা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সে জন্য টিসিবিকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সেসব পণ্য বাজারে ছাড়া হবে। আমরা ভোক্তাদের বিনীত অনুরোধ করছি, কোনোভাবেই আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি পণ্য কিনে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করবেন না। এখনও পরিস্থিতি খুব ভালো অবস্থায় আছে। ভয়ের কারণ নেই। বাজারে কোনও পণ্য সংকট হবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •