সিবিএন ডেস্ক:
দেশে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মাত্র ১০ জন রোগী শনাক্ত হলেও জনমনে আতঙ্ক কাটছে না। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন সত্যিই কি দেশে মাত্র ১০ জনই আক্রান্ত, সামাজিকভাবে কি রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে নাকি পড়েনি?

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হটলাইনে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজারেরও বেশি কল আসছে। কলের সিংহভাগই করোনা সম্পর্কিত। প্রবাসফেরত বা তাদের সংস্পর্শে আসা অনেকেরই অভিযোগ, অনেক চেষ্টা করেও হটলাইনে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন না।

আইইডিসিআরের হটলাইনে করোনা সম্পর্কিত হাজার হাজার কল এলেও প্রতিষ্ঠানটির বায়ো সেফটি ল্যাবরেটরিতে প্রবাসফেরত ও তাদের সংস্পর্শে আসা করোনা সন্দেহে মাত্র ২৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, করোনা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক কিট না থাকায় কিটের যৌক্তিক ব্যবহারের দোহাই দিয়ে ভাইরাসটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রবাসফেরত ও তাদের স্বজনের বাইরে কারও নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে সামাজিকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে নাকি এখনও ছড়ায়নি তা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক চলছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা মঙ্গলবার করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, করোনা এখনও সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। এ পর্যন্ত যে ১০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে তারা প্রবাসফেরত যাত্রী কিংবা তাদের সংস্পর্শে আসা পরিবারের সদস্য। পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় পারিবারিকভাবে সেলফ কোয়ারেন্টাইন পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বলছেন, সরকারের প্রস্তুতি থাকায় করোনা দেশে ছড়িয়ে পড়েনি আর ছড়িয়ে পড়লেও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা সরকারের রয়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্যানুসারে গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত বিমান, স্থল, সমুদ্র পথে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত চীন, ইতালি ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা রয়েছেন। গত ১৫ দিনে ফিরেছেন ২ লাখেরও বেশি যাত্রী।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, সর্বশেষ দুই সপ্তাহে বিদেশফেরত দুই লাখেরও বেশি যাত্রী কে কোন দেশ থেকে কোন ফ্লাইটে এসেছেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা অধিদফতরের হাতে নেই। সর্বশেষ তথ্যানুসারে সর্বসাকুল্যে সাড়ে তিন সহস্রাধিক বিদেশফেরত যাত্রী বর্তমানে নিজ নিজ বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। হাজার হাজার বিদেশফেরত যাত্রীর মাধ্যমে পরিবারের বাইরে প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে ভয়াবহ এ ছোঁয়াচে রোগটি সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিদেশফেরত যাত্রী ছাড়া খুবসংখ্যক মানুষেরই করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকার সপ্তাহখানেক আগে থেকে বিদেশফেরত যাত্রীদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করছেন। সরকার বার বার নিয়ম মেনে দুই সপ্তাহ বাড়ির একটি ঘরে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকতে বললেও অনেকেই তা মানছেন না। অনেকেই নিজেদের সুস্থ মনে করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

রোগতত্ত্ববিদরা বলেন, প্রবাস থেকে যারা ফিরেছেন তাদের শরীরে ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে করোনার লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বিদেশফেরত যাত্রীদের মধ্যে কারও শরীরে করোনা থাকলে তাদের মাধ্যমে রোগটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ বিবেচনায় সমাজে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে কি না তা পদ্ধতিগতভাবে জানার জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি সরকার।

সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইসিডিডিআর,বি তত্ত্বাবধানে রাজধানীসহ সারাদেশের ১৯টি সরকারি হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিল্যান্স সাইট রয়েছে। এ ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারে আগত রোগীদের মধ্যে যারা সাধারণ জ্বর নিয়ে আসেন তাদের মধ্যে দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে ফ্লু পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সামাজিকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে কি না খতিয়ে দেখতে ইনফ্লুয়েঞ্জা সাইটগুলোতে যারা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে আসছেন তাদের করোনা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, তাদের কাছে করোনাভাইরাস পরীক্ষার দুই হাজারেরও কম কিট রয়েছে। এ কারণে তারা চাইলেই ব্যাপকভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষা করতে পারছেন না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ও আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার দাবি করেন, মেডিকেল কলেজগুলো থেকে নিউমোনিয়ার স্বল্পসংখ্যক রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হলেও কারও দেহে করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •