আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার :
চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ‘লাইফ লাইন’ নামে পরিচিত প্রধান প্রাকৃতিক প্রশ্রবণ, বগাছড়ি খাল জবর দখল হয়ে যাচ্ছে। গত ৩ দশকে দখলবাজির শিকার হয়ে এ খালটি তার অস্তিত্বের অর্ধেকের বেশি হারিয়ে ফেলেছে। এখন নতুন করে খালের জমি জবর দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা গড়ে তুলছে বিরাট বহুতল মার্কেট।
রোববার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ডুলাহাজারার বগাছড়ি খালটিই ইউনিয়নের প্রধান প্রাকৃতিক প্র¯্রবণ। খালটি পাবর্ত্য এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগর চ্যানেলের সাথে মিশেছে। এক সময়কার স্রোতস্বিনী ও চওড়া খালটি এখন দখল ও দূষণের কবলে ধুঁকছে অস্তিত্ব সংকটে।
সরকারী রেকর্ডে এ খালের প্রশস্থতা ১০৩ ফুট, কিন্তু দখলের ফলে সংকীর্ণ হতে হতে এর প্রশস্থতা কোন কোন অংশে এখন অর্ধেকেরও নীচে এসে ঠেকেছে। তবু দখলবাজদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মোগল ঐতিহ্যের এই ‘জীবন্ত স্বত্ত্বা’টি। আর তা কেবল কক্সবাজার- চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডুলাহাজারা ব্রীজ পয়েন্টের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝা যায়। এখানে ব্রীজের অর্ধেকের বেশি খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট-বহুতল মার্কেট ভবন। দখলবাজরা প্রথমে বাজারের ময়লা ফেলে খাল ভরাট করে, এরপর সেখানে গড়ে তুলে পাকা ভবন। শুধু ব্রীজ পয়েন্ট নয়, পুরো বাজার জুড়েই খালের দক্ষিণ অংশে চলছে চরম দখলবাজি। সম্প্রতি বাজারের পশ্চিম অংশে নতুন করে খালের জমি দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে মাছের আড়তের নামে বহুতল মার্কেট ভবন। রোববার বিকালে ওই মার্কেটে কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিককে দোতালার ছাদের কাজ করতে দেখা যায়। প্রায় ১৭০ ফুট বাই ৫০ ফুট আয়তনের এ মার্কেটটি নির্মাণে স্থানীয় বাজার কমিটির সভাপতি মফিজউদ্দিন ও ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি কায়ছারউদ্দিন চৌধুরী নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা। আর মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই দুই ব্যক্তি ইতোমধ্যে ১১০ জন মাছ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে অগ্রিম নিয়েছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
ডুলাহাজারার স্থানীয় বাসিন্দা ও কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ মিরাজুল হক চৌধুরী বলেন- খালের জমির সাম্প্রতিক দখল বন্ধে এলাকাবাসী প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ধর্ণা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তা রোধ করতে পারছেন না।
তিনি জানান, মাস খানেক আগে একবার এসিল্যান্ড এসে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবারো নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ফলে আসছে বর্ষায় খালের ওপারে ভাঙনের কবলের পড়ে কয়েকশত বাড়িঘর খাণগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
একই আশংকা প্রকাশ করেন খালের উত্তরপাড়ের বাসিন্দা মিনহাজউদ্দিন, নজিবুল হোসাইন, মো. হোছন, মাস্টার ছগির আহমদ ও মো. কামাল।
তারা বলেন, খালের দক্ষিণ অংশ দখল হয়ে যাওয়ার কারণে উত্তর অংশ প্রতিবছর ভাঙনের কবলে পড়ছে। এতে বহু মানুষের বসতবাড়ি খালগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ডুলাহাজারা খালটি উত্তরপাড়ের বাসিন্দাদের বাপ দাদার খতিয়ানভ‚ক্ত জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ডুলাহাজারা বাজার কমিটির সভাপতি মফিজউদ্দিন খালের জমিতে মার্কেট নির্মাণের কথা অস্বীকার করে বলেন, আমরা স্থানীয় কায়ছারুল হক চৌধুরী, বাহারুল হক চৌধুরী ও আবু নাছের চৌধুরীর কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে সেখানে মাছের আড়ৎ নির্মাণ করছি। ওই জমি তাদের খতিয়ানভ‚ক্ত দাবী করে তারা আমাদের সাথে চুক্তিও করেছেন।
ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি কায়ছারউদ্দিন চৌধুরীও খালের জমিতে কোন মার্কেট হচ্ছে না বলে দাবী করেন। তিনি বলেন, ওই জমি আমাদের এবং তা এসিল্যান্ড এসে মাপঝোক করে চিহ্নিতও করে দিয়ে যান।
তবে ঘটনার ব্যাপারে চকরিয়ার সহকারী কমিশনার ভ‚মি (এসিল্যান্ড) মোহাম্মদ তানভীর হোসেন বলেন, খালের তীর দখল করে খালের রেকর্ডভ‚ক্ত জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রচেষ্টা প্রতিহত ও জবর দখলবাজদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। নতুন করে আবার চেষ্টা করলে তাও উচ্ছেদ করা হবে। তিনি কাউকে মার্কেট নির্মাণের জন্য জমি চিহ্নিত করে দেয়ার দাবী অমূলক বলে মন্তব্য করেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, কাউকে খালের জমি দখলের সুযোগ দেওয়া হবে না। খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •