বিশ্বজুড়ে এক মহা আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশেও ঢুকে পড়েছে এই ভাইরাসটি। গত রোববার তিনজনের করোনা ভাইরাস সনাক্ত করা হয়েছে। যদিও তার মধ্যে দুইজন ইতালি ফেরত। তবে ভাইরাসটি ঢুকে পড়ায় বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তবে আতঙ্কিত হওয়া মতো নয়। ইতিমধ্যে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুতি নিয়েছে। কক্সবাজারে হোপ ফাউন্ডেশনও করোনা ভাইরাস নিয়ে সজাগ এবং নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস নিয়ে তারা কার্যক্রম শুরু করেছে। ঘনত্বাকারে বাস করায় রোহিঙ্গারা বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের কারণে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় লোকজন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সে কারণে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত হোপ ফিল্ড হসপিটালে (ক্যাম্প-৪) করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে করোনা ভাইরাস এবং নিজেদের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন, হোপ ফিল্ড হসপিটালের চীফ মেডিকেল অফিসার মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কক্সবাজার নিউজ ডটকম-সিবিএন’র চীফ রিপোর্টার শাহেদ মিজান

সিবিএন: করোনা ভাইরাস এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে বলুন।

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। ১০০টির বেশি দেশে এটি আক্রমণ করেছে। মৃত্যুও হচ্ছে। বাংলাদেশেও যথেষ্ট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনজন রোগী সনাক্ত হওয়ায় ঝুঁকিটা বেশ বেড়েছে। নানা কারণে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক ঝুঁকি রয়েছে আরো বেশি। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়মিত বিদেশীদের বিচরণ রয়েছে এবং অধিক ঘনত্বাকারে বসবাস।

সিবিএন: রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা কেমন ঝুঁকিতে রয়েছে?

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: করোনা একটি অত্যন্ত খারাপ সংক্রমিত ব্যাধী। কোনো কারণে যদি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এটি ছড়ায় তাহলে তা মহামারী ধারণ করবে! তাতে সেখানকার স্থানীয় লোকজনও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হবে। কেননা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় লোকজন এখন একইসাথে উঠাবসা করছে। বিশেষ করে বাজার করতে গিয়ে এই উঠাবসা হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যদি একজনের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয় তাহলে তা দ্রুত সবার মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা ঘনবসতি, অপরিস্কার এবং অজ্ঞতার কারণে তা মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তাই আমরা বলবো যারা বিদেশ থেকে আসবেন চেকআপ করেই যেন তাদের ক্যাম্পে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।

সিবিএন: রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করা সংস্থা ও সরকারের করণীয় সম্পর্কে বলুন।

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা দাতা সংস্থাগুলো ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ঘন বসতির কারণে সেখানে করোনা আক্রমণ করলে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এই প্রকোপ স্থানীয় কমিনিউটিতে ছড়িয়ে পড়বে। করোনা একটি অত্যন্ত খারাপ সংক্রমিত ব্যাধী। কোনো কারনে যদি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এটি ছড়ায় তাহলে তা মহামারী ধারণ করবে! তাতে সেখানকার স্থানীয় লোকজনও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হবে। কেননা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় লোকজন এখন একইসাথে উঠাবসা করছে। বিশেষ করে বাজার করতে গিয়ে এই উঠাবসা হচ্ছে।

সিবিএন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা বিদেশীদের নিয়ে কি উদ্যোগ নেয়া যায়?

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: বিদেশীরাতো কক্সবাজারে সরাসরি আসে না। ঢাকা হয়ে আসে। আমার অভিমত, সেখানে তাদেরকে নিবিড় নিরীক্ষা করে যেন ঢুকতে দেয়া হোক। ভালোভাবে পরীক্ষা ছাড়া যেন ঢুকতে না দেয়া হয়। পাশাপাশি কক্সবাজারে অবস্থান করলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়।

সিবিএন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর প্রতি আপনার বার্তা কি?

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: ক্যাম্পে কাজ করা প্রতিটি স্বাস্থ্য সংস্থাকে করোনা ভাইরাস নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। একই সাথে জেলা-উপজেলার প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আলাদা করে কয়েকটি বেড রাখতে পারি। কেননা প্রতিরোধ করাটাই হলো আসল জিনিস। সেক্ষেত্রে আমরা সর্দি-কাশি ও জ্বর হলেও তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উদ্ধুদ্ধ করতে পারি। করোনা ভাইরাসের বর্তমান প্রেক্ষাপটটা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে আতঙ্কিত হলে চলবে না। এখন সচেতনতাই বাড়ানোই বড় ব্যাপার। সাথে প্রতিরোধের ব্যাপারটা সামনে রাখতে হবে। কারণ ইতিমধ্যে ভাইরাসটি ঢুকে পড়েছে। তাই ঝুঁকিটা বেশ বেড়েছে।

সিবিএন: করোনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বলুন।

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণকে এই রোগ নিয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এই রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধসহ সার্বিক করণীয় সম্পর্কে জানাতে হবে। সাথে আমরা যারা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে জড়িত তাদেরও সচেতন ও সুরক্ষিত থাকতে হবে। জ্বর, কাশি হলে সতর্ক হতে হবে। এই জন্য আমরা উপদেশ দেবো যেখানে-সেখানে যেন কাশি না দেয়া হয়। কাশির জন্য টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করা, বাহুর ভাজে কাশি দেয়া, দিনে কমপক্ষে পাঁচ/ছয়বার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। খাওয়ার আগে এবং বাতরুম থেকে বের হয়ে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। অপরিস্কার হাতে মুখে দেয়া যাবে না। এই বার্তা দিয়ে আমরা লোকজনকে সাবধান করতে পারি।

সিবিএন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হোপ ফিল্ড হসপিটালের প্রস্তুতি কেমন?

ডা. মোঃ ইসমাঈল ইদ্রিস: এই আমাদের ফিল্ড হসপিটালে চিকিৎসা নিতে যেসব রোহিঙ্গা আসে প্রতিনিয়ত তাদেরকে আমরা করোনা সম্পর্কে বলছি। শুধু তাই নয়; আমরা এখনই এই নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এর অংশ হিসেবে আমাদের ফিল্ড হাসপাতালে চারটা বেড আলাদা করে রেখেছি। সন্দেহজনক লক্ষণ হলে যেন তাদের আলাদা করে রাখতে পারি। তবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের যেটা চ্যালেঞ্জ তা হলো- তাদেরকে কোনো কিছু বুঝানো এবং এটা করিয়ে নেয়া কঠিন। তারপরও তারা এখন আগের চেয়ে অনেকটা বুঝতে শিখছে ব্যাপারগুলো।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কক্সবাজারে স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক ভূমিকায় কাজ করছে হোপ ফাউন্ডেশন। কক্সবাজারের কৃতিসন্তান আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক ইফতিখার মাহমুদ মিনানের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি আজ মহীরূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে হোপ ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় রামুর চেইন্দায় অবস্থিত হোপ হসপিটাল দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের লোকজনকে স্বল্প ও বিনা ফিতে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও একই নিয়মে জেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি বার্থসেন্টার ও মেডিকেল সেন্টার পরিচালনা করছে হোপ ফাউন্ডেশন। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও বিশাল ‘ফিল্ড হসপিটাল’ স্থাপন করে রোহিঙ্গাদের মানবিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি মানবতার তরে দাতব্য সেবা দিয়ে ইতোমধ্যে সরকারসহ সর্বমহলে বেশ সুনাম ও পরিচিতি অর্জন করেছে হোপ ফাউন্ডেশন। এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশের জরুরী সংকটে উপযোগী বিষয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় হোপ ফাউন্ডেশন। তার জন্য গড়ে তোলা হয়ে ‘হার্ট’ নামে একটি জরুরী দল। এছাড়াও নানা সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচী নিয়মিত আয়োজন করে থাকে হোপ ফাউন্ডেশন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •