সিবিএন ডেস্ক:
অনেকটা গোপনে হাইকোর্টে থেকে মাদক ও অস্ত্রের দুই মামলায় জামিন নেন বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম। তার জামিনের আদেশের প্রায় একমাস পর বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে আসায় নড়েচড়ে বসে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। মূলত নাম বিভ্রাটকে কেন্দ্র করেই জি কে শামীম আদালত থেকে জামিন পান বলে যুক্তি তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ।

নিকেতনের নিজ কার্যালয় থেকে বিদেশি মদ, অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন জি কে শামীম। এ ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে শামীমের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অস্ত্র, অর্থপাচার ও মাদক আইনে মামলা করে।

এর মধ্যে অস্ত্র ও মাদক মামলায় হাইকোর্টের পৃথক দুইটি বেঞ্চে শামীমের জামিনের বিষয়ে আবেদন করা হয়। এরপর গত ৪ ও ৬ ফেব্রুয়ারি দুই মামলায় শামীমকে জামিন দেন হাইকোর্ট। অস্ত্র মামলায় তাকে ৬ মাসের জামিন দেন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম মুজিবুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। এছাড়াও জি কে শামীমকে মাদক মামলায় এক বছরের জামিন দেন বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি বিশ্বদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চ। কিন্তু মানি লন্ডারিংসহ আরও দু’টি মামলা থাকায় জামিনে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়নি জি কে শামীমের।

এদিকে জামিনের বিষয়টি অনেকটাই গোপনে হওয়ায় প্রায় এক মাস ধরে এ বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ওই জামিনের বিষয়ে আদালতে লিখিত আদেশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোর্টের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এ বিষয়ে কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। ফলে জি কে শামীমের জামিন পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

গণমাধ্যমে জি কে শামীমের জামিনের বিষয়টি উঠে আসার পরদিন (৮ মার্চ) জামিনের আদেশ রিকল করেন হাইকোর্ট। দিনের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অস্ত্র মামলায় দেওয়া জামিন আদেশ রিকল করেন বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মজিবুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি আটর্নি জেনারেল ফজলুর রহমান খান আদালতকে বলেন, আসামির নাম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম। কিন্তু কার্যতালিকায় (সুপ্রিম কোর্টের) আছে এস এম গোলাম। এভাবেই তথ্য গোপন করা হয়েছে। আর আমাদের কোনও কপি (জামিন আবেদনের) দেওয়া হয়নি।

তখন আদালত বলেন, আমরা কার্যতালিকায় দেখছি, আবেদনকারীর নামে বিভ্রাট আছে। তাই আমরা আগের আদেশ রিকল করছি। এরপর আদালত অস্ত্র মামলায় জি কে শামীমের জামিন বাতিল করেন সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ।

এরপর জানতে চাওয়া হলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফজলুর রহমান খান বলেন, তথ্য গোপন করে অস্ত্র মামলায় জি কে শামীম জামিন নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের কপি রাষ্ট্রপক্ষকে দেওয়ার কথা। তারা তা দেয়নি। আবার মামলার এজাহারেও শামীমের নাম ওরফে জি কে শামীম লেখা হয়নি। আবার আদালতের কার্যতালিকাতেও জি কে শামীমের নাম স্পষ্ট করে লেখা হয়নি। জামিনের আবেদনে নাম আছে এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম। কিন্তু কার্যতালিকায় লেখা হয়েছে এস এম গোলাম।

এদিকে জি কে শামীমকে এক বছরের জামিন দেওয়া আদেশটিও রিকল করেন বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি বিশ্বদেব চক্রবর্তীর হাইকোর্ট বেঞ্চ। এখানেই শুনানিকালে জি কে শামীমের নাম বিভ্রাটের বিষয়টি তুলে ধরেন এই কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌস রুপা। শুনানি শেষে মাদক মামলাতেও শামীমের জামিন বাতিল করেন হাইকোর্ট।

তবে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ জি কে শামীমের আইনজীবী ড. মমতাজউদ্দিন মেহেদী। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, জি কে শামীম হওয়ার কারণেই আজ তার জামিন প্রত্যাহার করা হয়েছে। আইনের যে ধারায় মামলা হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি ৬ মাস হওয়ার কথা। অথচ জি কে শামীম ইতিমধ্যে ৪ মাসের বেশি কারাভোগ করেছেন। এরকম মামলায় যে কোনও ব্যক্তিরই জামিন হয়ে থাকে।

জি কে শামীমের জামিনের বিষয়ে যুক্তি দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, আদালত বিচার করবে অপরাধের, অপরাধীর নয়। যে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তা লাইসেন্স করা। এটা মামলার এজাহারেই বলা হয়েছে। জামিন শুনানিকালে আদালত আইনের বই দেখেই জামিন দিয়েছেন। শুধুমাত্র জি কে শামীম হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রপক্ষের মাথাব্যথা। তাই তার জামিন নিয়ে এতো কথা বলছে।

এদিকে জি কে শামীমের জামিনের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনে স্পষ্ট বলা আছে, জামিনের ব্যাপারে দুই পক্ষকে শুনতে হবে। এখানে যদি সেটার ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আর যদি ব্যত্যয় না হয়ে থাকে, ডেপুটি অ্যাটর্নি যে বলেছিলেন তিনি জানতেন না, সেটার তদন্ত করা হবে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •