বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক মহা আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশেও রোববার তিনজন রোাগী সনাক্ত হয়েছে। যদিও তারা ইটালি ফেরত।  এতে আতঙ্ক  ছড়িয়েছে। তবে সরকার প্রস্তুত রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় হোপ ফাউন্ডেশনও করোনা ভাইরাস নিয়ে সজাগ রয়েছে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস নিয়ে তারা কার্যক্রম শুরু করেছে। বিশেষ করে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছে। করোনার অপ্রত্যাশিত আক্রমণ থেকে বাঁচতে করণীয় সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে কাজ করছে এই সংস্থাটি। এক সাক্ষাতকারে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জনসাধারণের প্রতি বিস্তারিত বার্তা জানিয়েছেন হোপ হসপিটালের চীফ মেডিকেল অফিসার মোঃ শহীদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কক্সবাজার নিউজ ডটকম- সিবিএন এর চীফ রিপোর্টার শাহেদ মিজান

সিবিএন: করোনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলুন।

ডা. শহীদুল ইসলাম: চীনের উহান প্রদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে করোনা ভাইরাস বর্তমানে ৮০টি বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাস বর্তমানে বেশ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য এখনো মহামারী ঘোষণা করেনি। কিন্তু বিশ্ব প্রেক্ষাপটে গুরুতর হিসেবে বিবেচিত করা হচ্ছে।

সিবিএন: বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসের কেমন ঝুঁকিতে রয়েছে?

ডা. শহীদুল ইসলাম: উন্নত দেশগুলোতে করোনার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে ভারত, পাকিস্তান নেপালেও এই রোগ দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশেও তিন রোগী সনাক্ত হয়েছে। যদিও তারা ইতালি ফেরত। যেহেতু বাংলাদেশে করোনা ঢুকে পড়েছে। তাতে এই রোগের ঝুঁকি বেশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ঘনবসতির দেশ। তাই সবাইকে খুব সতর্ক হতে হবে। না হলে বড় বিপদ হতে পারে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

সিবিএন: এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী হতে পারে?

ডা. শহীদুল ইসলাম: রোগটা যাতে সংক্রমণ হতে না পারে সে দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। তার জন্য বিদেশ থেকে আসা মানুষগুলোকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এটিই হবে প্রধান কাজ। পাশাপাশি সব সময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। কাশির সময় সতর্ক হতে হবে। খোলাভাবে কাশি দেয়া যাবে না। বাহুতে অথবা টিস্যু দিয়ে কাশি দিয়ে কাশির পর ভালোভাবে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত হাত ধুতে হবে। খাবার আগে, বাথরুম ব্যবহারের পরে অবশ্যই হাত হাত ধুতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। জনসমাগম স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বাইর না হওয়া ভালো। জ্বর-কাশি হলে পরীক্ষা করা হতে হবে এবং মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে। নাকে হাত দেয়ার পর মুখে ও চোখে হাত দেয়া যাবে না। হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন না হলে বাইরে না যাওয়া ভালো হবে। যেহেতু এই রোগের এখনো ওষুধ আবিস্কার হয়নি তাই সতকর্তাই সর্বোত্তম উপায়!

সিবিএন: করোনা ভাইরাস এবং কক্সবাজার সম্পর্কে বলুন।

ডা. শহীদুল ইসলাম: করোনা ভাইরাস এবং কক্সবাজার- এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কেননা রোহিঙ্গাদের সেবায় জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু সংস্থা নিয়োজিত হয়েছে। এসব সংস্থায় কাজ করছে বহু সংখ্যক বিদেশি। তারা যাওয়া-আসা করছে। এই কারণে কক্সবাজারই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব বিদেশীদের বিমান বন্দরেই কয়েকবার চেকআপ করা দরকার। সম্ভব হলে কক্সবাজারে প্রবেশের সময়ও চেকআপ করা দরকার।

সিবিএন: করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রশাসনিক করণীয় সম্পর্কে বলুন।

ডা. শহীদুল ইসলাম: সরকার ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এই মুহূর্তে প্রধান করণীয়, বিদেশ থেকে আসাদের নিবীড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই দেশে প্রবেশ করানো। পাশপাশি স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি হাতে রাখতে হবে এবং জনসচেনতা বাড়াতে হবে। এই জন্য মসজিমের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক এবং স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলোতে এই রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সিবিএন: করোনা প্রতিরোধে হোপ হসপিটালের উদ্যোগ সম্পর্কে বলুন।

ডা. শহীদুল ইসলাম: আমাদের হসপিটালে যেসব রোগি আসছে এবং রোগির সাথে যারা আসছেন তাদেরকে আমরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি। করোনা ভাইরাস কি, লক্ষণ কি এবং লক্ষণ পাওয়া গেলে কী করণীয়- সে সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি। একই সাথে আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মচারীরাও সজাগ রয়েছি। এছাড়া কমিউনিটিতে হোপ ফাউন্ডেশনের একটা বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আমাদের বার্থসেন্টার, মেডিকেল সেন্টারগুলোতেও আসা রোগি ও স্বজন এবং আমদের মেডিকেল ক্যাম্পগুলোতে রোগি এবং সাধারণ লোকজনকে করোনা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।

সিবিএন: একজন চিকিৎসক হিসেবে জনসাধারণের প্রতি আপনার বার্তা কি?

ডা. শহীদুল ইসলাম: যাদের জ্বর এবং হাঁচি-কাশি হয় বা থাকে তারা যেন মাস্ক ব্যবহার এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলে। যেন ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেন অন্য কেউ ব্যবহার না করে। জ্বর এবং হাঁচি-কাশি প্রবল উপসর্গ দেখা দিলে বাড়ির বের হবেন না। সব সময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবেন। সাধারণত বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। ছোটবেলা থেকে ইনফেকশনের সাথে বেড়ে উঠায় এই ক্ষমতাটা বেশি। আমরা ডেঙ্গু মোকাবেলা করেছি। সুতরাং এটা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।

সিবিএন: করোনা প্রতিরোধে সরকারিভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কি সহযোগিতা দরকার?

ডা. শহীদুল ইসলাম: সরকারিভাবে সহযোগিতা ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য আলাদা কর্ণারের ব্যবস্থা করা। বেসরকার হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট। এছাড়া সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যগুলোকে নিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে সমন্বিত কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কক্সবাজারে স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক ভূমিকায় কাজ করছে হোপ ফাউন্ডেশন। কক্সবাজারের কৃতিসন্তান আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক ইফতিখার মাহমুদ মিনানের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি আজ মহীরূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে হোপ ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় রামুর চেইন্দায় অবস্থিত হোপ হসপিটাল দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের লোকজনকে স্বল্প ও বিনা ফিতে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও একই নিয়মে জেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি বার্থসেন্টার ও মেডিকেল সেন্টার পরিচালনা করছে হোপ ফাউন্ডেশন। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও বিশাল ‘ফিল্ড হসপিটাল’ স্থাপন করে রোহিঙ্গাদের মানবিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি মানবতার তরে দাতব্য সেবা দিয়ে ইতোমধ্যে সরকারসহ সর্বমহলে বেশ সুনাম ও পরিচিতি অর্জন করেছে হোপ ফাউন্ডেশন। এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশের জরুরী সংকটে উপযোগী বিষয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় হোপ ফাউন্ডেশন। তার জন্য গড়ে তোলা হয়ে ‘হার্ট’ নামে একটি জরুরী দল। এছাড়াও নানা সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচী নিয়মিত আয়োজন করে থাকে হোপ ফাউন্ডেশন।