ইমাম খাইর, সিবিএন
লবণ উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কক্সবাজার উপকূলের অন্তত ৪০ হাজার প্রান্তিক চাষি। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লবণ উৎপাদন, বিপণনের সঙ্গে যুক্ত অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ। লবণচাষিদের অভিযোগ, আমদানির কারণেই কমে গেছে লবণের দাম। এ ক্ষোভ থেকে অনেক চাষি লবণ মাঠ ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিসিকের সুত্র মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত গত তিনমাসে জেলায় লবণ উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৭৫৭ মে. টন। যা গত মৌসুমের এই সময়ের তুলনায় কম। গত মৌসুমের এ সময়ে লবণ উৎপাদন হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিকটন।
লবণ উৎপাদন কম হওয়ার কারণ হিসেবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিদের হতাশাকে দায়ী করা হচ্ছে।
এদিকে, লবণের মূল্য বৃদ্ধি ও লবণ চাষীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিসিক কক্সবাজারের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান ৮টি প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।
প্রস্তাবনাটি প্রধান মন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবনাসমূহ হলো-
০১। লবণ চাষীদের লবণের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য মণপ্রতি লবণের মূল্য কমপক্ষে ৩০০ টাকা নির্ধারণ
০২। জাতীয় লবণনীতি-২০১৬ এর আলোকে সরাসরি মাঠ পর্যায় হতে ন্যায্যমূল্যে ১ লক্ষ মে: টন লবণ ক্রয়ের ঘোষণা প্রদান করে বাফার স্টকের ব্যবস্থা করার জন্য বাজেট ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ
০৩। সরকারের বিভিন্ন প্রনোদনার জন্য লবণ চাষীদের নিবন্ধনের পদক্ষেপ গ্রহণ
০৪। লবণ চাষীদের দাদন ব্যবসায়ীদের হাত হতে রক্ষাকল্পে সহজ শর্তে, কম ও সরল সুদে ঋণ প্রদানের ঘোষনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা
০৫। লবণ চাষীরা যাতে সরাসরি বড় বড় মিল মালিকদের নিকট লবণ বিক্রি করতে পারে সে জন্য কক্সবাজারে লবণ মেলার আয়োজন করা। যেখানে মিল মালিকগণ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক লবণ চাষীদের নিকট হতে নায্যমূল্যে লবণ ক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হবেনএবং মিল মালিকগণ নগদমূল্য প্রদানপূর্বক লবণ ক্রয়
০৬। বাংলাদেশে যে সকল কস্টিক সোডার কারখানা রয়েছে সে সকল কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে সোডিয়াম ক্লোরাইডের চাহিদা নিরুপন করে সোডিয়াম ক্লোরাইডের আমদানি নিয়ন্ত্রণ
০৭। দেশীয় উৎপাদিত লবণের গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে প্রান্তিক লবণচাষীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে উন্নতমানের অধিক পরিমানেলবণ উৎপাদনে উৎসাহিতকরণ
০৮। আমদানীর প্রয়োজন হলে সকল প্রকার লবণ একই কোডের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ভ্যাট/ট্যাক্স এর আওতা বৃদ্ধি করে আমদানীর ব্যবস্থা গ্রহন করা, যাতে দেশীয় শিল্প রক্ষা করা যায়।
বিসিকের পরিচালক (উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) বরাবর পাঠানো প্রস্তাবনায় ডিজিএম মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান আরো জানান, ২০১৮-১৯ মৌসুমে ২৯,২৮৭ জন লবণচাষী ৬০,৫৯৬ একর জমিতে ১৬.৫৭ লক্ষ মে:টন লবণের চাহিদার বিপরীতে ১৮.২৪ লক্ষ মে:টন লবণ উৎপাদন করেছে। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ১.৬৭ লক্ষ মে:টন বেশী। মাঠ পর্যায়ে ক্রুড লবণের মুল্য কমে যাওয়ায় কয়েক লক্ষ মে:টন লবণ মজুদ রয়ে যায়। ফলে চলতি মৌসুমে লবণ চাষীরা লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারায়। এমতাবস্থায়, লবণের মুল্য বৃদ্ধি পাবে মর্মে মাঠপর্যায়ে চাষীদের আশ্বস্ত করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাইছার ইদ্রিস বলেন, কোন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লবণ ক্রয় করলে চাষিদের প্রকৃত দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরাসরি সরকারী প্রতিনিধিরা লবণ কিনলে সরকার নির্ধারিত দাম পাবে বলে মনে করছে চাষিরা।
আর, সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী ১ লাখ মে. টন লবণের বাফার স্টক গড়ে তুলার অহবান জানান সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী।
তিনি বলেন, সরকারীভাবে মাঠ পর্যায়ের চাষাদের কাছ থেকে লবণ ক্রয় করার কথা শুনেছিলাম। দেখা যাক কি হয়।
তবে, কোন সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিলে প্রান্তিক চাষিরা প্রকৃত দাম পাবে কিনা- সন্দেহ সবার।
আনোয়ার পাশা চৌধুরী বলেন, সংকটের অজুহাত তুলে অসাধু একটি চক্র বিদেশ থেকে লবণ এনে দেশীয় লবণশিল্পকে ধ্বংস করছে। এর ফলে সম্ভাবনাময় লবণশিল্পটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় ৬০ হাজার ৫৯৬ একর জমিতে লবণ উৎপাদিত হয়। এখানকার অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লবণের ওপর নির্ভরশীল। গত মৌসুমে ১৬ দশমিক ৫৭ লাখ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে লবণের উৎপাদন ছিল ১৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। নভেম্বর থেকে মধ্য মে পর্যন্ত ছয় মাস লবণ উৎপাদিত হয়।
২০১৯-২০ মৌসুমে দেশে লবণের চাহিদা ১৮.৪৯ লক্ষ মে. টন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮.৫০ মে. টন।
জেলায় বর্তমানে মাঠে লবণ উৎপাদনে জড়িত ৪৪ হাজারের বেশি চাষি পরিবার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •