ইমাম খাইর, সিবিএন:
দেশে সামুদ্রিক শৈবাল বিভিন্নভাবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের কাজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নিয়োজিত আছেন, যা তাদের পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই অধিকসংখ্যক কৃষক সম্ভাবনাময় এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ২৫০ জন কৃষক সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদনে জড়িত থাকলেও তাদের জীবনমান অত্যন্ত নিম্নমানের। সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদনে জড়িত সকল কৃষকগণের জন্য উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সুবিশাল সমুদ্র সৈকত এবং উপকূলীয় অঞ্চলের উপযোগী পরিবেশ পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সামুদ্রিক শৈবাল কে উপকূলীয় অঞ্চলের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল একটি আদর্শ কৃষি ফসল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উক্ত ফসলের সাশ্রয়ী মূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ মানব ও পশুখাদ্য পোশাক শিল্প ও ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল ইত্যাদি দেশের উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সরকারের সমুদ্র অর্থনীতি ব্লু ইকোনমি সংক্রান্ত কার্যক্রমের সামুদ্রিক শৈবালকে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশাল সমুদ্র উপকূলের মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে এটি। সামুদ্রিক শৈবাল স্বাস্থ্য পরিচর্যায় কোন প্রকার ঔষধ বা কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না বলে এটি কম ব্যয়বহুল ও পরিবেশ বান্ধব।
এদিকে, রপ্তানীযোগ্য সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কক্সবাজারে আয়োজন করা হচ্ছে দিনব্যাপী সেমিনার, মাঠ দিবস ও মেলা। হোটেল সীগালে ২৯ ফেব্রুয়ারী সকালে অনুষ্ঠিতব্য দিনব্যাপী এ আয়োজনে এ সেমিনারে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সম্ভাবনা, উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের গবেষণা নীতি নির্ধারক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের রপ্তানিকারক বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও কৃষকগণ তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করবেন, যা পরবর্তীতে এ খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য সহায়ক হবে। সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত কিছু সংখ্যক কৃষককে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হবে।
এরপর দুপুর দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত নুনিয়াছড়া উপকূলে মাঠ দিবসের আয়োজন করা হয়েছে। মাঠ দিবস এর আওতায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ পরিদর্শনের পাশাপাশি শৈবাল চাষী গবেষক ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শেষভাগে অভিজাত হোটেলে বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সামগ্রিক বিষয়ে একটি মেলা হবে।
সামুদ্রিক শৈাবলের বিস্তারিত জানাতে শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারী) বিকালে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ‘মিট দ্যা প্রেস’ আয়োজন করা হয়।
এতে বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন -বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও এসএমএপি প্রকল্পের পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন খান, যুগ্ম পরিচালক ও এসএমএপি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. রায়হানুল ইসলাম, এসএমএপি প্রকল্পের পরামর্শক ড. এম জয়নুল আবেদীন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন -বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আক্কাস আলী, ড. ফেরদৌসী ইসলাম, ড. মো. ফারুক হোসেন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক মিতেয়া খানম, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহাবুবর রহমান, ইউনিয়ন ব্যাংক কক্সবাজার শাখা ব্যবস্থাপক ও এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল আজিজ।
সংবাদ সম্মেলনে সামুদ্রিক শৈবালের চাষাবাদ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াকরণ, রপ্তানী ইত্যাদি বিষয়ে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজারের একমাত্র উদ্যোক্তা ওমর হাসান।
তিনি জানিয়েছেন, নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৮ সাল থেকে কক্সবাজার জেলার ১৫টি স্থানে সামুদ্রিক শৈবালের চাষাবাদ কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩শ চাষী রয়েছে। এই খাতকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নেন। কুরিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়ায় সামুদ্রিক শৈবাল রপ্তানী হচ্ছে। এ পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ৪ লাখ ৪২৭৫ কেজি সামুদ্রিক শৈবাল সংগ্রহ করেন।
সরকারিভাবে যথাযথ পৃষ্টপোষকতা পেলে এই খাত দেশের অন্যতম রপ্তানী খাত হিসেবে পরিণত হতে পারে বলেও জানান ওমর হাসান।
সামুদ্রিক শৈবাল খাতকে ব্যাপক বিস্তৃত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকল্পের অধীনে গত ৫ বছরে ১১টি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে শস্য, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং প্রাণীসম্পদ এ তিনটি খাতে ১,৭৫৪.১৮ কোটি টাকা জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি প্রকল্পের অধীনে ৩.৫ লক্ষাধিক কৃষককে টিএসএস বা কারিগরী সহায়তা সেবা প্রদান করা হয়েছে।
দেশে সামুদ্রিক শৈবাল বিভিন্নভাবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের কাজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নিয়োজিত আছেন। তাদের পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই অধিকসংখ্যক সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ২৫০ জন কৃষক সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদনে জড়িত থাকলেও তাদের জীবনমান অত্যন্ত নিম্নমানের। সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদনে জড়িত সকল কৃষকগণ এর জন্য উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা অতীব জরুরী।
বাংলাদেশের সুবিশাল সমুদ্র সৈকত এবং উকূলীয় অঞ্চলের উপযোগী পরিবেশ পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের সমুদ্র অর্থনীতি ব্লু ইকোনমি সংক্রান্ত কার্যক্রমের সামুদ্রিক শৈবালকে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশাল সমুদ্র উপকূলের মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে এটি।
সামুদ্রিক শৈবাল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদ। বিশ্বব্যাপী শৈবাল থেকে খাদ্যপণ্য, ঔষধিপণ্য, প্রসাধনী পণ্য, সার, বায়ো ফুয়েল ও পরিবেশ দূষণরোধক পণ্য উৎপাদন করছে। লবণাক্ত, আধা লবণাক্ত পানির পরিবেশে এটি জন্মে এবং সহজে চাষাবাদ করা যায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •