মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাচ্ছিলাম হঠাত্‍ পথ আগলে দাঁড়ালো রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর ও জব্বার …..!!!

# রফিক : — কোথাও যাচ্ছ নাকি?

# আমি : — জ্বী, শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাচ্ছি।

# সালাম : — শুধু ফুল দিয়ে কি হবে?

# আমি বললাম — না, মানে আপনাদের
স্মরণ করা হলো। এতে আপনাদের শহীদি আত্মা শান্তি পাবে।

# বরকত : — হা হা হা, পবিত্র কোরআন হাদিসের কোথাও কি লেখা আছে, নির্দেশনা আছে, শহীদ মিনারে ফুল দিলে কি আত্মার শান্তি হয়? অন্য কোন পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থে কি এ ধরনের কোন কিছু বলা হয়েছে? তারপরও ফুল পবিত্র ও ভালোবাসার প্রতীক। সে হিসাবে আমাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও ভালোবাসা জানাতে দেশের কৃষ্টি ও সভ্যতার অংশ হিসাবে শহীদ মিনারে তোমরা শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতে পারো। কিন্তু কখনো কি তোমরা আমাদের কবর জিয়ারত করেছো? দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছো? দেশের মন্দির, গীর্জা সহ অন্যান্য উপাসনালয়ে আমাদের আত্মার শান্তি কামনা করে কখনো কি কেউ প্রার্থনা করেছে?

# আমি বললাম : — জ্বী, না, মানে…

# রফিক : — হুমম, প্রতি বছর কত কোটি টাকার ফুল দিয়ে এভাবে আমাদের প্রতি অর্থহীন শ্রদ্ধা জানাও?

# আমি : — জ্বী, হাজার কোটি টাকার উপরে হবে।

# জব্বার : — আচ্ছা আমার মা যে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে, কেউ কি তখন খোঁজ খবর নিয়েছিলো ?
অথবা, ফুল ক্রয়ের অর্থ একটু কমিয়ে এর কিছু টাকা দিয়ে অনেক হত দারিদ্রদের অভাব মোচন করতে পারতো, আমাদের পরকালীন শান্তি ও ছদকায়ে জারিয়া মনে করে। তা-কি কখনো ভেবে দেখেছো..? ছদকায়ে জারিয়া হিসাবে কল্যনকর কোন কাজ সম্পাদন অথবা কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছো…?

# সালাম : — আমার আত্মীয় স্বজনরা যে রিকশা চালিয়ে, দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কি কোন খোঁজ খবর রাখে কেউ?

# আমি : — ভাই, আসলে জীবন তো দিছেন আপনারা। আপনাদের আত্মীয় স্বজন তো দেয় নাই। তাদের খোঁজ খবর নেয়ার দরকার কি?

# বরকত : — যুদ্ধ তো করেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে আজ তোমরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস প্রশ্বাস নিতো পারছো। তাদের স্বজনদের আমরা শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। কিন্তু নগন্য কিছু কোটা সুবিধা দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেন বিতর্কিত করছো। এটা তো দেশের নাগরিকেরা মোটেও স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না। দেশের সম্মানিত নাগরিকেরা এটাকে মনে করছেন, তাদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ। এভাবে আমাদের অহংকার, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযুদ্ধাদের কেনো ছোট করছো এসব করে।

# শফিউর : কই, এতদিনে তো ঢাকার আজিমপুরে কবরস্থানে রফিক সহ আমাদের অনেকের কবরটা পর্যন্ত তোমরা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারোনি। রফিকের জরাজীর্ণ বসতভিটা তো তোমাদের কখনো চোখে পড়েনা। ভাষা দিবস অথবা অন্যান্য জাতীয় দিবসে আমাদের জীবিত আত্মীয় স্বজনদের সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন শুভেচ্ছা জানানোর ব্যবস্থা হয়না।

# জব্বার : — এসব বাদ দাও তো শফিউর ! ওদেরকে বেশি উস্কে দিয়ো না। বেশি উস্কালে হয়ত আমাদের নিয়ে অযথা কথাবার্তা বলে আমাদেরকে অহেতুক বিতর্কিত করার অপচেষ্টা শুরু করবে।

(মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বাসায় ফিরে আসলাম।)

চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসলো। তারা যদি আজ বেঁচে থাকতেন। এভাবেই হয়তো পথ আগলে প্রশ্নগুলো আমাদের কাছে ছুঁড়ে দিতেন। একবার ঠান্ডা মস্তিষ্কে ভাবুন তো, কি করেছি আমরা তাদের জন্যে…? যারা মায়ের ভাষার জন্য, এই দেশটার জন্য, স্বাধীনতার জন্য জীবনটা বিলিয়ে দিলো অকাতরে। আমরা কি তাঁদের প্রাপ্য সম্মান এতদিনে আদৌ তাদের দিতে পেরেছি কিনা..?

জ্বী, ৫ টাকার ফুল আজকে ৫০ টাকায় কিনছেন। কিন্তু দিন শেষে ফুল গুলো কই যাচ্ছে? তাতে কী আমাদের শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেওয়া হচ্ছে..? নাকি অপচয়ই শ্রেয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে দেশ কিনা দিন দিন উন্নত দেশ হিসেবে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এসডিজি অর্জনে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে নিরন্তর কাজ করছে। আমাদের উচিত, সেই ভাষা শহীদদের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য এমন কিছু করা। যাতে আমার ভাষা সৈনিক ভাইদের আত্মা শান্তি পায়। পরকালে তাঁরা উত্তম শহীদের মর্যাদায় গণ্য হয়। তাঁদের জন্য দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষ্টির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নৈতিকতা ও নিজ নিজ ধর্মীয় অনুভূতি ও দৃষ্টিকোন থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন সহ এমন কিছু করি, যে কাজে শহীদদের আত্মা প্রকৃতপক্ষে শান্তি পায়, পরকালে শহীদদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, পরবর্তী প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস জানে ও দেশপ্রেমে উৎসাহিত হয়।

তাঁরা যেন পরপার থেকেও একজন আরেকজনকে বলতে পারে, দেখ ভাই, যাদের জন্য আমরা জীবন বিলিয়ে দিলাম, যাদের জন্য বুকের তাজা রক্ত ঝরালাম। এতো বছর পরেও তারা আমাদেরকে ভুলে নাই। তাদের জন্য পরপারে আমাদের পরম শান্তির নীড়ে স্থান হয়েছে। ভালোবাসা অবিরাম, হে আমার ভাষা সৈনিক ভাইয়েরা। আল্লাহতায়লা যেনো আপনাদের জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান নসিব করেন। এ কামনায় করছি। এটাই হোক ২০২০ সালে ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পূর্তির সঠিক উপলব্ধি।

(এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা। নিবন্ধটি একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত, এজন্য পোর্টাল কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই দায়ী নয়।)

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •