তানভিরুল মিরাজ রিপন

 

‘ আমরা যদি না থাকতাম, তাহলে আপনাদের মা,বোন,স্ত্রী বোরখা পড়লেও ধর্ষনের শিকার হত।  আমরা জানি এ দেশে কত হিংস্র, বিকৃত মানুষ আছে। ‘

‘দেখেন আপা আমি যদি এই বাচ্চাদের না দেখি, ওদের খাওন পরন না জুটাইয়া দিই। ওরা কার কাছে যাবে? আমিই তো ১০ মাস দশদিন পেটে বহন করে জন্ম দিছি।  ওদের বাবার তো দায়িত্ব নেই।  পলায়ছে। ‘

বেশ্যা,গনিকা,সেবাদাসী,যৌনদাসী, মাগী যা বলেন না সকল ঘৃনা, সকল নিষেধাজ্ঞা মানিয়ে আমাদের সমাজের সবচেয়ে পুরানো ব্যবসায়ীদের নাম এখন ‘যৌনকর্মী’। শব্দটা একেবারেই নতুন। ওপরের দুটো কথা দু-বিশিষ্ট নারীর কাছেই শোনা। জলি ম্যাডাম যৌনপল্লী নিয়ে গবেষণা করার সময় বেশ্যা পাড়ার এক মহিলাই তাকে প্রথম কথাটি বলেছিলেন। দ্বিতীয় কথাটির তথ্যসূত্র কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

বেশ্যাবৃত্তি পৃথিবীর আদিম একটি ব্যবসা। যা শুরুর লগ্ন থেকে এখনও একই গতিতে চলমান। বাংলাদেশের রেল স্টেশন, সমুদ্র কেন্দ্রীক শহর,পর্যটন স্থান,বাস কাউন্টার,মার্কেট, পার্কগুলোকে ঘিরে অসংখ্য ভাসমান যৌনকর্মী আছে। বাংলাদেশ সংবিধান যৌন ব্যবসার কোনো অনুমতি না দিলেও হাইকোর্ট ২০০০ সালে যৌন ব্যবসার অনুমতি দেয় মাগীদের। বাংলাদেশে ১৪টি প্রসিদ্ধ যৌনপল্লী আছে। যেগুলো দেশের বিভিন্ন বয়সী গ্রাহকদের যৌন চাহিদা মেটাচ্ছে। যদিও অনেক কম তাদের সংখ্যা চাহিদা ও কাস্টমারের তুলনায়। তবে স্বাস্থ্যসম্মত কি না এটিও তো প্রশ্ন। দৌলতদিয়া যেখানে প্রায় ৪৫০০ যৌনকর্মী আছে আনুমানিক ৪০০ জন সর্দারনীর অধীনে।টাঙ্গাইলের কান্দাপাড়া যৌনপল্লী। যেটি ২০১৪ সালে উচ্ছেদের নামে ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিলো। এখন এনজিওর সহযোগিতায় আবার গড়ে ওঠেছে। নারায়নগঞ্জের টানবাজার যৌনপল্লীতে কাজ করতো প্রায় পাঁচ হাজার মত যৌনকর্মী। যেটি ১৯৯৯ সালে সালে উচ্ছেদ করে দিয়েছিল। তবে এখনও আছে যৌনকর্মীরা অন্যভাবে, অন্যসাজে দেহ ব্যবসা করছে দিব্যি। ময়মনসিংহের গাঙ্গিনীপাড়ায় কাজ করে ১০০০ মতো যৌনকর্মী। ফরিদপুরের রথখোলা, সিলেটের সন্ধ্যাবাজার,কক্সবাজারের লালদিঘী,কলাতলি,সমিতিপাড়ায় অসংখ্য যৌনকর্মী আছে যারা দেশের যৌন চাহিদার তৃষ্ণায় কাতর তাদের অভাব পূরন করছে। যদি বলি বানী-সান্তা যে গ্রামের সবাই যৌনকর্মী, চট্টগ্রামের সদরঘাটের ‘সাহেবপাড়া’ যেটির ইতিহাসও চারশ বছরের পুরানো। এসব যৌনপল্লীর কাস্টমার কারা? এ যৌনকর্মীরা কি একেবারেই নতুন? মোঘল হেরম,রাজাদের দরবার ঘর,জমিদারের অন্ধকার ঘর, রাজনর্তকী শব্দগুলো এ দেশের মানুষের কাছে খুবই নতুন নাকি?আজকেও যারা যৌনপল্লীতে যাচ্ছে তারা প্রত্যেকে ধর্মানুরাগী, ধর্মানুসারী কোনো না কোনো পবিত্রমতের। সে পবিত্রমতের অনুসারীদেরই চাহিদা মেটায় যৌনকর্মীরা।

একটু বিশ্রী আলাপ করি। কারন আমাদের এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও নারীকে ভোগবাদী পণ্যে হিসেবে তৈরী করা সমাজের কিছু ঘৃন্য চিন্তাকে স্পষ্ট করা উচিত। না লিখলে যে হয় না। আমাদের সমাজে হিজড়ারা নিগৃহীত। যাদের কোনো সমাজ হয় না। ঘর হয় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ‘আনন জামান’র গবেষণা পত্র ‘শিখন্ডী কথা’র সবশেষের সংলাপ ছিল, ‘হে সৃষ্টিকর্তা আমাকে কেনো পুরুষ বা নারী হয়ে জন্মদিলে না। কি পাপ আমি করেছি। ‘ অথবা তামান্না সেতুর সবচে বড় কাউন্টার হল ‘ঈশ্বরেরও পুরুষ বা নারীরূপ নেই। লিঙ্গ নেই। ‘ সমাজের হিজড়া হলে শতকথা শুনতে হয়। নানারকম নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়। হিজড়া হওয়া যেনো একটি অভিশাপ। তারা মারা গেলে কোনোরকম জানাজার নিয়ম হয় না।রাতের গভীরে তাদের পুঁতে দিয়ে চলে আসে অন্যসঙ্গীরা। স্বাভাবিক জীবন তাদের দেয় না সমাজ। অন্তত মৃত্যর পরবর্তী অধিকারও দেয় না। এখানেই ধর্মের সাথে মানবতার,মানবাধিকারের দ্বন্দ। কোথাও স্পষ্ট নেই হিজড়ার শেষকৃত্য কোন নিয়মে হবে। সমাজের হর্তাকর্তারা মানা করে দেয় তারা যেনো কোনো কবরস্থানে দাফন করানোর সুযোগ না পায়। যে মানুষগুলো দিনরাত এক করে প্রমান করতে চায় যে ধর্ম হল মানবতার। তারা কেনো অনুসরন করে না সে নিয়ম? হিজড়া হলে একেবারেই জঘন্য মৃত্যুযাত্রা হয়। বোঝতে কঠিন হচ্ছে না যে সেক্স ওয়ালারা এখানে দাপট বেশি রাখে। সেক্ষেত্রে এ সমাজের সবচেয়ে দাপুটে মানুষগুলো হবে যৌনকর্মীরা। অন্তত অসৎ সমাজপতি নয়, শট রাজনৈতিক নেতাও নয়। গতর খাটিয়ে ঠিক হকটা কাস্টমারকে দিয়েই উপার্জন করে।

১২ ফেব্রুয়ারী বিবিসি বাংলার এক রিপোর্টের মাধ্যমে জানতে পারলাম যে এক হুজুর, রাজবাড়ির দৌলতদিয়ার এক যৌনকর্মীর জানাজা পড়িয়েছে। এ নিয়ে তুলকালাম কান্ড চলছে দেশ জুড়ে। যৌন-কর্মী কর্ম করে খায় তারা। এটি একটি পেশা। পেশা সবসময়ই পবিত্র। ধর্ম যেহেতু সকলের জন্য। সেহেতু আমাদের ভাবতে হবে, খোঁজতে হবে। ধর্ম আসলে কার জন্য? আর পতিতালয়ে বা যায় কারা? দ্বন্দ বা সংঘর্ষ নয়। বরং শান্তি খোঁজতে হবে। মৃত্যুর একটি স্বাভাবিক ও মানুষিক অধিকার সমেত যাত্রা আছে। যে মৌলভী এই প্রথা ভেঙেছে সে ধর্মকে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছে।

আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান,সময়,নিউজ২৪ এর যে গল্প নিষিদ্ধ, হরিশংকর জলদাসের ‘কসবি’ পড়ে আমিও জানতে পারি যে যৌনপেশা কি টিকে আছে?থাকবে? কারা টিকিয়ে রেখেছে? সেক্স বিজনেস রাষ্ট্রীয় রাজস্বখাতকেও সমৃদ্ধ করছে। এটিরও একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিকোণ আছে। বাংলাদেশের যৌনকর্মীরা নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারে না। তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও আছে। সব প্রতিকূল পরিবেশে সে জায়গাগুলো থেকে সমাজের উঁচুস্তরের মানুষগুলো তৈরী হচ্ছে। তারা এগিয়ে আসছে। যৌনপেশা ঘৃনার নয়। আমি যখন জরিপ করতে গিয়ে কথা বলেছিলাম যৌনকর্মীদের সাথে সুলতানা আমাকে বলেছিলো, ‘শরীর দিয়েই খাই, ভিক্ষাতো করি না।’

এক সময় দাফন করানোর লোক পাওয়া যেতো না। মাটিতে পুঁতারও অধিকার ছিল না। সমুদ্র ভাসানোর সুযোগ ছিলো না। অথচ সব ধর্মই বলে মানুষ ও মানবতার জন্য ধর্মের সৃষ্টি। পেশা কোনোটাই খাটো নয়। কাস্টমার যারা তারাও ধর্মানুসারী। সবারই মৃত্যুর পরবর্তী স্বাভাবিক যাত্রার অধিকার। সবই সেক্স কন্ট্রোল করে। যৌনতা ঘৃনীত কোনো পেশা নয়। এখন ধর্মকে পজিটিভ ও সকল মানুষের করে তুলার সময়। স্রষ্টা সকলের। সহজিয়া নিয়মও সকলের জন্য।

রাজনীতি বিশ্লেষক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
cbn