১০ শহীদের রক্তের উপর ১৪ ফেব্রুয়ারী!

এইচ এম নজরুল ইসলাম
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা দ্য ভ্যালেন্টাইনস ডে। এ দিনে সারা বিশ্বে একযোগে উদযাপিত হবে ভালবাসা দিবস। দিবসটিকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্ব হয়ে উঠে উন্মাতাল। অত্যাধুনিক ফ্যাশনের উপহারে ছেয়ে গেছে হাটবাজার। পর্যটন শহর গুলোকে সাজানো হয়েছে নতুন সাজে। পার্কগুলোকে তৈরি করা হল যুবক-যুবতীর চাহিদামাফিক। সারা দিন চলবে হৈচৈ, উন্মাদনা। প্রেমিক যুগলের চোখে মুখে থাকবে যৌন উত্তেজনা। তারা একযোগে রাস্তায় নেমে প্রিয়জনের জন্য ছড়িয়ে দিবে ভালবাসার সব রং। এ দিনে তরুণ-তরুণীর বেহাল দশা দেখে শয়তানও লজ্জিত হবে। আর এগুলো সব হবে সভ্যতার নামে, সংস্কৃতির নামে। তবে ভালোবাসার রং কী? প্রশ্ন একটি, উত্তর ভিন্ন ভিন্ন। রক্তের স্রোত বুট, টিয়ারশেল আর গুলির তীব্র ঝাঁজালো বারুদের গন্ধ এমন ভাবে ভালোবেসে সবাইকে ঋণী করা সেই দিনটি হল আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি!
প্রিয় পাঠক, বেশ কয়েক বছর ধরে আজকের বিশেষ দিনটি নিয়ে লিখে যাচ্ছি। আর প্রতি বারেই ব্যক্তির প্রেমকে আড়াল করেছি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কারনে অনেকেই বলে আমার বহু প্রেমিকা! বলার একটাই একসময় আমার ফেসবুক জুড়ে থাকত চন্দ্রমুখী, পার্বতী, বালিকা, সমুদ্র কন্যা চারু নামে বহু রূপবতীদের নাম আসলে ওরা কে? যাদের নিয়ে আমি বার বার রচনা তৈরি করে চলছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে! অনেকেই এবারের ভালোবাসা দিবসের বিশেষ লিখাটি যেন তাদের নিয়ে লিখি তার জন্য অনুরোধ করেছেন। তাই লিখার শুরুতেই দেশপ্রেম থেকে তাদের নিয়ে শুরু করলাম, কারন আমি যতই চন্দ্রমুখী, পার্বতী, বালিকা,চারু সমুদ্র কন্যার প্রেমিক হয়না কেন, আমার সব প্রেম ভালোবাসা দেশকে নিয়ে,আমার মা মাটিকে নিয়ে।
সবাই যখন জানতে চায় ওরা কারা ? কে সেই রহস্যময় রমণী! তাই এবারের বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের লিখাটিতে আমার আলোচিত নাম গুলো দিয়ে শুরু করি।
পাঠক জীবনের অন্য সবকিছুর কারণ ব্যাখ্যা করতে পারলেও, কেন ভালোবেসেছি বলতে পারব না। প্রেম কী, ভালোবাসাকে কীভাবে মূল্যায়ন করি এধরনের প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক নয়। প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে কোন প্রকার প্রশ্ন যেমন করা যায় না তেমনি কোন উত্তরও দেওয়া যায় না। এটা এমন একটি বিষয় যা নিয়ে কথা বলে শেষ করা যাবেনা।
ভালোলাগা আর ভালোবাসা নিয়ে কিছু গল্প, শুরুতেই বলছি প্রেম ভালোবাসার মূল্যায়ন করার মতো গল্পকার আমি নয়! তবে যাদের দেখে না দেখে প্রেম নামক শব্দটি নিজের মাঝে প্রতিস্থাপন করেছি তাদের বহু নামে বহুরূপে দেখি সেই বালিকাদের নামই চন্দ্রমুখী, সাগরকন্যা,পার্বতী, চারু। বলতে গেলে প্রিয় মুখ গুলোকে বহু নামে ডাকি।
তবে আমি তাদের একজন হলেও আমার মনে হয় অন্ধকার কিন্তু রঙ্গিন আলো, কালো রঙ্গের আলো হলেও চোখ ধাঁধানো সেই রং ! তখন হয়তো আমার মতো অনেকেই নীল আকাশের দিকে থাকিয়ে ভাবে কি হত যদি পাখি হতাম! পুরো আকাশটা হত আমার একার বহুদূর উড়ে যেতে যেতে পথ হারিয়ে ফেলতাম। হয়তো এসব আমার কিছু অপ্রকাশিত আবেগ!
মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে দেই নিজেই, প্রিয়তমা জান তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করি আকাশের সাথে আর ঐসব ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষ গুলোর সাথে কারন কেন জানি মনে হয় তাদের মাঝে লুকিয়ে আছে আমার ভালবাসার মানুষটি।
হয়তো তাই নির্জনে বসে ভালবাসার কবিতা লিখতে ছুটে চলি তবে কিছু শেষ হয় কিছু শেষ হয় না। ঠিক তখনই চোখের সামনে বেশে উঠে, অধিকার বঞ্চিত মানুষ গুলোর মুখ।
চারু তোমার মাঝে আমার ভালোবাসা উজাড় করতে গিয়ে সেই ভালোবাসা প্রতিবাদের ভাষায় বিস্ফোরিত হয় যায়, সৌন্দর্যের রাজধানী প্রিয় কক্সবাজার যখন রোহিঙ্গা আর তাদের আশ্রয়দাতাদের ধারা ধর্ষিত হতে দেখে!
উন্নয়নের নামে পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস আর অসহায় মানুষ গুলোকে উদ্বাস্তু হতে দেখে। আমার কাছে ভালোবাসা বলতে শুধু তুমি নামক শব্দের কাছে কখনো বন্ধি ছিলনা। বহুপ্রেমের রঙিন স্বাক্ষী হয়ে থাকার সুযোগ হলেও প্রেমিকা হিসেবে আমার কাছে দেশটাই সেরা ছিল সবসময়।
তবুও বলছি শুন এই ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেওয়া শাহবাগ গণজাগণ চত্বরে চলা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করা সেই যুবক-যুবতিদের দেশপ্রেমের ইতিহাস রচনা হয়েছিল। সেইদিন তারুণ্যের ভালবাসা দেখেছি দেশপ্রেমের প্রতি সবকটি হাত ঐক্যবদ্ধ। দেখেছি সবকটি হাত ছিল প্রতিবাদী। রোদে পুড়েছে,রাত জেগে ৭১ এর ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান তুলেছে, জাগরণের গান গেয়েছে, মিছিল করছে এইসবই দেশের জন্য, প্রিয় মাতৃভূমিকে ভালবাসেন বলেই দেশপ্রেমের আন্দোলনে নিজেদেরকে সপে দিয়েছিল।
অথচ এসব দেশপ্রেমের অগ্নি সংগ্রামকে ভুলে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি তথাকথিক ভ্যালেন্টাইন নামক অপসংস্কৃতিতে!
আজ আবারও মনে হচ্ছে চোখদুটো খুলতে হবে,আনন্দের নীল পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো যাবেনা আর। আমি আর তুমির মত চরম স্বার্থপর, সমাজ বিচ্ছিন্ন চেতনা যুব সমাজের মধ্যে চাপিয়ে দিতে পেরেছে। প্রেম ভালবাসার মত স্বাভাবিক সম্পর্ককে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে পরিণত করে আফিম নেশার মত বুঁদ করে ফেলেছে। ভোগবাদ আর তাদের আদর্শ। এ ব্যক্তিগত ভালবাসার একপিঠে কাম, আরেক পিঠে কর্পোরেট কালচারের উস্কানি।
অথচ তুমি আজ বলছ বলনা একবার ভ্যালেন্টাইনস ডে, নয়তো বা চিৎকার করে বল আই লাভ ইউ! ওরে পাগলী এবাবে কি ভালোবাসা হয়?
তুমি একবারও কি জানতে চেয়েছিলে আজকের এই দিনে কি হয়েছিল তোমার এই পোড়া শহরে?
জানি তোমার বা তোমাদের এসব জানার কোন আগ্রহ নেই, কি হবে এত ইতিহাস জেনে!
তবুও ইতিহাস পার্যালোচনা করলে দেখতে চাই আজকে এই দিনটি রক্তাক্তের, এদিনে ১৯৮৩ সালে ঢাকায় ঝরেছিল শিক্ষার্থীদের রক্ত। এ জন্য এ দিনটিকে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় আন্দোলন ও আত্মাহুতির নজির ছিল এই ১৪ ফেব্রæয়ারি। তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের পরের বছরই মজিদ খান প্রণীত শিক্ষানীতির বিরোধিতা করেন শিক্ষার্থীরা। এসএসসি কোর্স ১২ বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও শিক্ষার ব্যয়ভার যারা ৫০ শতাংশ বহন করতে পারবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হলেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার মতো কথাও বলা হয়েছিল এ শিক্ষানীতিতে।
১৯৮২ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় সমস্ত ছাত্র সংগঠনগুলো।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, কালক্রমে যেটি গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।
সেদিন শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। উত্তেজনার একপর্যায়ে ছাত্রনেতারা ব্যারিকেডের কাঁটাতারের ওপরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেন। তখন কোনো রকম উসকানি ছাড়াই রায়ট কার ঢুকিয়ে গরম পানি ছিটাতে শুরু করে পুলিশ। এরপর লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার চেষ্টা করে। তা করতে ব্যর্থ হয়ে নির্বিচারে গুলি শুরু করর স্বৈরাচার সরকারের পেটুয়া বাহিনীর সদস্যরা। এতে প্রথমেই গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে গেলে পুলিশ বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। ওইদিনই শিশু একাডেমিতে যোগ দিতে আসা দীপালী নামের এক শিশু গুলিতে নিহত হয়। পুলিশের দীপালীর মরদেহ গুম করে ফেলে। তাছাড়া আরো অনেককেই গুম করা হয় বলে স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনে জাফর, কাঞ্চনসহ মোট ১০ জন শহীদের হদিস পাওয়া যায়।
এর পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান কাঞ্চন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেনো বেগবান না হয় সেজন্য স্বৈরাচার শাসকের বিরুদ্ধে আরও অনেক লাশ গুম করে ফেলার অভিযোগ ওঠে।
তখন ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসেবে এখনকার মতো পালন করা হতো না। ১৯৮৩ সালের সেই দিনটি ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একটি চরম মুহূর্ত।
নষ্টদের হাতে চলে যাচ্ছে ফ্রেরুয়ারি ! ৫২ একুশ থেকে তিরাশির ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের ফেরার জায়গা শেখায়। যেই ফেব্রুয়ারিতে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা বুকের রক্ত দিয়ে আমার মুখের ভাষাকে রক্ষা করেছিল,আর আমাদের মর্যদার আসনে বসিয়েছে। এত রক্তের দামে কোন জাতি ভাষা কিনেনি ! কোন জাতি ভাষাকে এত ভালবাসেনি। অথচ ‘ক’ বছর ধরে ভ্যালেন্টইন নাম দিয়ে ভালবাসা দিবস নামে আলাদা একটি দিবস পালন করে যাচ্ছে আমাদের এ প্রজন্ম।
আমরা কি একবারও মনে করেছি কি আজ ঋতুরাজ বসন্তে প্রথম দিন। ফুল ফুটবার পুলকিত হওয়ার এই দিনে বন বনান্তে কাননে পারিজাতের রক্তের কোলাহলে ভরে উঠছে চারিদিক।
জন্মলগ্ন থেকে দৌড়ে চলেছি হঠাৎ মনে হল পেছনে তাকাই তাই একটু তাকিয়েছিলাম ! তাকিয়ে হতবাগ হয়ে রই, আমি কোথায় আর আমার সেই ইতিহাস নির্মানের অতিক্রান্ত পথটা কোথায় । তুমি তোমরা আমাদের এই সুনালী ইতিহাস থেকে এত দূরে কেন । তবে আমি বার বার ছুয়ে দেখবার চেষ্টা করি ফেলে আশা ইতিহাস গুলো।
চারু তোমাকে এখনো বলা হল না আমি কিন্তু প্রেম করতে চাই না চাই প্রেমিক হতে ! যেই প্রেমিক স্বাধীন এই দেশকে ভালবাসবে।
পরিশেষে বলবো, রক্তস্মাত একুশের শব্দগুলো কথা বলুক, ইতিহাস নাড়া দিক তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে। ছুঁয়ে যাক সকল মানুষের বিবেক। এই প্রজন্ম ফিরে পাক গণমানুষের আস্থা ! আর প্রতিটি মুহুত্ব প্রতিধ্বনিত হউক একুশের চেতনা।

লেখক:
সভাপতি, রিপোর্টার্স ইউনিটি কক্সবাজার ও নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আপন কণ্ঠ

সর্বশেষ সংবাদ

চকরিয়ায় স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র গণআন্দোলনের অগ্রনায়ক শহীদ দৌলত খাঁন

বাঙালিকেই প্রথম বাংলা ভাষা ও একটি দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু: ড. অনুপম সেন

সবার সহযোগিতা আর ব্যবহারে বাংলা ভাষা প্রাণ পাবে: বিভাগীয় কমিশনার

নগরীতে মেশিন বিস্ফোরিত হয়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট দগ্ধ

মহিলাটির সন্ধান দিন

মুজিব শতবর্ষে দাঙ্গাবাজ মোদির আগমণ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে কুঠারাঘাত করবে

জেলা বারের নির্বাচন কাল, লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি

দিল্লিতে মুসলিম গণহত্যার প্রতিবাদে কক্সবাজারে হেফাজতের বিক্ষোভ শনিবার

এডভোকেট বাবু বিভূতি শর্মার প্রয়াণে শোক

ঈদগাঁও বাজারের নির্বাচন সম্পন্ন

কক্সবাজারের সামুদ্রিক শৈবাল রপ্তানী হচ্ছে কুরিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায়

কাঠের সেতু খোলা-বাঁধায় জীবন চলে লক্ষাধিক মানুষের

রামুর কাউয়ারখোপের সাবেক চেয়ারম্যান হানিফ মাষ্টার আর নেই

নূরুল হুদা চৌধুরীর মৃত্যুতে জেলা বিএনপির শোক

বেগম জিয়া এখন হাঁটতে পারেন না, দাঁড়াতে পারেন না

সত্যপ্রিয়মহাথের’র জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কাল

বেনাপোলে ৪৭ বোতল ভারতীয় ফেন্সিডিল উদ্ধার

নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবি স্কুলের ১৪ শিক্ষার্থীর বৃত্তি লাভ

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম কক্সবাজারে

শনিবার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন : জয়ের ব্যাপারে সকলে আশাবাদী