আতিকুর রহমান মানিক
পাতাঝরার রুক্ষ শীত বিদায় নিচ্ছে। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তায় ফাল্গুনের প্রথম দিন আজ। সবুজ বসন্তের প্রারম্ভিক এ দিনটিই আবার সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস৷ ২০০৯ সালে বসন্তের এ দিনেই অভিযাত্রা শুরু করেছিল কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)।
তখন থেকে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘদিন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আজ যুগপূর্তির দ্বারপ্রান্তে পাঠকপ্রিয় সিবিএন।
আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির এ যুুুগে দেশে ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে থাকা কক্সবাজার জেলাবাসীর ভার্চুয়াল ঠিকানায় পরিণত হয়েছে কক্সবাজার নিউজ ডটকম।
এক দশক আগের কথা। আমার মত নিতান্ত অদক্ষ ও নগন্য এক সংবাদকর্মীকে সূযোগ দিয়েছিলেন সহৃদয় সব্যসাচী সম্পাদক অধ্যাপক আকতার চৌধুরী। যার ফলশ্রুতিতে ২০১০ সাল থেকে আমার আনাড়ি হাতের লেখা নিউজগুলো শোভা পাচ্ছিল পাঠকপ্রিয় এ পোর্টালে। সিবিএন এ লেখালেখির সুবাদে বিগত একদশক ধরে জমা হয়েছে হাজারো সুখস্মৃতি। এরই কিছু জাবর কাটার জন্য এ ক্ষুদ্র এ লেখা।
২০১৬ সালের ১৭ মে। সুদুর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এক নিম্নচাপের উপস্হিতি রাডারে ধরা পড়ল। একদিন পার না হতেই নিম্নচাপটি প্রবল ঘূর্নিঝড়ে রূপান্তরিত হলে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্হা ও আবহাওয়াবিদরা এর নাম দিলেন “রোয়ানু”। কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এ সংক্রান্ত প্রথম নিউজটি করেছিলাম। “ধেয়ে আসছে রোয়ানু” শিরোনামে উপরোক্ত নিউজ ১৮ মে সন্ধ্যা ৬.১৯ মিনিটে কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন) এ প্রকাশিত হল।তখনো কক্সবাজার উপকূল থেকে ১,৫৫০ কিলোমিটার দুরে ছিল এর অবস্হান। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪৪ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার বেগে ৬০ কিলোমিটারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এরপরদিন ১৯ মে বিকাল ৪.৪৫ মিনিটে “প্রবল শক্তিতে এগুচ্ছে রোয়ানু ; কক্সবাজারে ৪ নং সতর্কতা সংকেত” শিরোনামে ২য় নিউজটি সিবিএন এ আপলোড হল। দেশ-বিদেশের পাঠকরা এবার হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। ক্লিক আর ক্লিক !
এদিকে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে ঘূর্ণিঝড়টি। একই দিন রাত সাড়ে ১১ টায় “শক্তি সঞ্চয় করে এগুচ্ছে ঘূর্নিঝড় রোয়ানু” শিরোনামে আরেকটি নিউজ প্রকাশিত হলে সর্বশ্রেণীর পাঠকদের সাড়া ছিল লক্ষ্য করার মত।
এর পরদিন ২০ মে পবিত্র শবে বরাত। এদিকে জনমনে প্রবল উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ততক্ষনে আরো কাছে চলে এসেছিল ঘূর্ণিঝড়টি। ঘূর্ণিঝড় ও সম্ভাব্য দূর্যোগ পরিস্হিতি মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে জেলা প্রশাসন।
“কক্সবাজারের আরো নিকটে রোয়ানু ; দূর্যোগ মোকাবেলায় কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল” শিরোনামে আরেকটি নিউজ সিবিএন এ সকাল ১১ টা ৫১ মিনিটে প্রকাশিত হল।
ততক্ষণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য উপাত্ত ও ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত এক-একটা নিউজ সিবিএন এ আপডেট হচ্ছে আর ক্লিক বাড়ছে। পাঠকদের আগ্রহ দেখে আমাকেও কেমন যেন নেশায় পেয়ে বসল। এদিকে সিবিএন সম্পাদক ফোন করে বলে দিয়েছিলেন ঘূর্ণিঝড়ের আপডেট নিউজগুলো করতে।
এরপর দুপুর ২:৩৯ মিনিটে “জেলা প্রশাসনের জরুরী বৈঠক ; প্রস্তুত ৫১৬ আশ্রয় কেন্দ্র, ১৬৫ টন চাল মজুদ”, ও সন্ধ্যা ৭:৪৯ মিনিটে “শনিবার অতিক্রম করতে পারে রোয়ানু ; সাথে জলোচ্ছাস”, শিরোনামে আরো দুটি নিউজ আপলোড হলে গায়ের উপর এসে পড়া ঘূর্নিঝড়ের বিপদ সম্পর্কে সবাই আাঁচ করতে পারল। ততক্ষনে ৬ নং বিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে। আবহাওয়ার সর্বশেষ আপডেট, প্রশাসনের প্রস্তুতি ও আনুসাঙ্গিক সব বিষয় নিয়ে এক একটা নিউজ আপলোড হচ্ছে আর দেশ-বিদেশ থেকে ফোনে ম্যাসেঞ্জারে-ইমুতে অনবরত কল্ আসছে। সবাই চরম উদ্বিগ্ন।
এরপর এল সেই ২১ মে। থমথমে আতংকের সেই রাতে সরারাত সম্পাদক অাকতার চৌধুরী নিউজরুমে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। আবহাওয়া অফিসের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখে আমি নিউজগুলো রেডি করছিলাম আর সম্পাদক আপডেট দিচ্ছিলেন। এ যেন ঝড়ো গতিতে ঝড়ের সংবাদ। এমনি সময়ে কক্সবাজার শহরে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল।
রাত ০১: ০৫ মিনিটে “দ্বারপ্রান্তে রোয়ানু ; প্রশাসনের সর্বাত্নক প্রস্তুতি” শিরেনামে আরেকটি নিউজ সিবিএন এ ভেসে উঠল। জনগনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া ও দূর্যোগ মোলাবেলায় সচেতন করতে রেড ক্রিসেন্ট, মেডিকেল টীম, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং শুরু করল। দমকা হাওয়া শুরু হয়েছে কক্সবাজার শহরজুড়ে। ল্যাপটপ-মোবাইলে চার্জও কমে আসছে।
ততক্ষণে বিভীষিকার রাত পেরিয়ে মেঘলা ভোরের আবছা আলো ফুটছিল। এদিকে মাত্র সাত ঘন্টায় ৯৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ততক্ষণে উপকূলে আছড়ে পড়ছে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়টি। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার জনগন, জেলা প্রশাসন ও আবহাওয়া অফিস থেকে সর্বশেষ আপডেট নিয়ে ১০:১২ মিনিটে “কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করছে রোয়ানু” শীর্ষক নিউজটি সিবিএন এ আপলোড হল।
এরপর সম্পাদকের ল্যাপটপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর আপডেট দেয়া সম্ভব হল না। এদিকে নিউজ আপডেট না পেয়ে সম্পাদকের মোবাইলে দেশ-বিদেশ থেকে অনবরত ফোন আর ফোন। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কাহিল সবাই ঘূর্ণিঝড়ের অবস্হা জানতে উদগ্রীব। আসলে সে দিনই বুঝা গিয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাংলাভাষীদের কাছে সিবিএন কতটুকু জনপ্রিয়।
রোয়ানোর নিউজ আপডেট রাখতে সার্বক্ষনিক তথ্য সহায়তা পেয়েছিলাম কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তৎকালীন সহকারী আবহাওয়াবিদ নাজমুল ভাই ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের থেকে। পাঠকদের আগ্রহ দেখে সেদিন সিবিএন সম্পাদক অধ্যাপক আকতার চৌধুরী যেন একপ্রকার মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আমিও কেমন যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। না হলে সারারাত জেগে কেউ নিউজ লেখে ও আপডেট করে ? ঘূর্ণিঝড় যত দ্রুত এগিয়ে আসছিল, সর্বশেষ নিউজ আপডেট তার চেয়েও ঝড়ো গতিতে প্রকাশিত হচ্ছিল।
এরকম আরো অনেক সুখস্মৃতি জমা হয়ে আছে। সময় সুযোগ হলে কোনদিন আবারো স্মৃতির ডালি নিয়ে হাজিরা দেব সহৃদয় পাঠকদের দরবারে। ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে সিবিএন আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে আপডেট নিউজের জন্য পাঠকরা আজ সিবিএন এর উপর নির্ভরশীল। স্হানীয় পত্রিকাগুলো অনেকাংশে নিউজের জন্য এই পোর্টালের উপরই নির্ভরশীল। তবে নিউজের ক্রেডিটে সিবিএন এর নাম দিতে কেন জানি প্রচন্ড নারাজ তাঁরা। তাই আমরাও মাঝে মধ্যে কৌশল অবলম্বন করি। নিউজের সোর্স উল্লেখ করার সময় “সিবিএন’কে জানান” উল্লেখ করি। আর অন্ধভাবে কপি করার সময় অবধারিতভাবেই সিবিএন এর স্বীকৃতিটুকু তাঁরা নিজের অজান্তেই দিয়ে দেন।সুতরাং পরের দিন পত্রিকার পাতায়ও “সিবিএন’কে জানান” শোভা পায়! এ যেন “সেরের উপর সোয়া সের”।
এক সময় প্রচুর নিউজ করতাম। কারেন্ট, এক্সক্লুসিভ, কলাম, ফিচার ও আর্টিকল কতকিছু। কিন্তু এখন ব্যস্ততার বৃত্তে বন্দী হওয়ার কারনে আগের মত আর নিউজে সময় দেয়া যায়না। এর পাশাপাশি রয়েছে নিত্যনতুন আইনের খড়গ। তাই কিছু লিখার আগে রীতিমত গবেষনার মতই হিসেব-নিকেশ করে দেখতে হয়, নিজের পায়ে হেঁটে গর্তে পড়তে যাচ্ছি কিনা। তবু চেষ্টা করি প্রিয় সিবিএন এর সাথে আপডেটেট থাকতে।
সম্পাদকের পাশাপাশি আন্তরালে থেকে সিবিএনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তুখোড় মেধাবী বার্তা সম্পাদক ইমাম খাইর। আরো রয়েছে অনুজপ্রতিম চীফ রিপোর্টার শাহেদ মিজান।
অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পরিক্রমা পেরিয়ে আজ সফলতা ও পূর্ণতার মধ্যগগনে কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)। যুগসন্ধিক্ষন ও আনন্দের এ দিনে অনেক খন্ডস্মৃতিই মনে পড়ছে। কিন্তু লেখাটা বেঢপ দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় ইতি টানতে বাধ্য হচ্ছি।
স্মৃতির ডালি নিয়ে ভবিষ্যতে যে কোনদিন আবারো হাজির হব সহৃদয় পাঠকদের কাছে, কথা দিলাম।
সংবাদদাতা, লেখক, বিজ্ঞাপন দাতা ও সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে থাকা পাঠকদের সাথে নিয়ে আরো এগিয়ে যাবে প্রিয় কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)।

“মন দেয়া নেয়া অনেক করেছি
মরেছি হাজার মরণে
নূপুরের মত বেজেছি চরণে চরণে”।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি “উদাসী” কবিতার এ দুটি লাইনের প্রতিধ্বনির মতই বিজ্ঞাপন দাতা, সংবাদদাতা, পাঠককূল ও সিবিএন’র পারস্পরিক মন দেয়া নেয়া অব্যাহত থাকুক অনাদীকাল ধরে।
ফাল্গুনী শুভেচ্ছা সবাইকে।

লেখক
সংবাদকর্মী ও ফিশারিজ কনসালটেন্ট।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •