মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী 

আমার পরম শ্রদ্ধেয় আনোয়ার স্যার। পুরো নাম-এ.এম.এম আনোয়ার শাহ। এই গুনী ও সফল শিক্ষকের গর্বিত পিতা ছিলেন-মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি ছিলেন, একজন প্রসিদ্ধ আলেম। উপ মহাদেশের শ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতের দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ (রহ.)। একই প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। পরে হাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসার মোহাদ্দেস ও ফকিহ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘ সময়। মাতা ছিলেন কক্সবাজার পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী হাফেজ পরিবারের সদস্য গোল আফরোজ। গোল আফরোজ পিতার বাড়িতেই প্রয়োজনীয় দ্বীনি ও প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। আলেম পিতা ও দ্বীনদার, পরহেজগার ও পর্দানশীল মাতার ঔরসেই ১৯৩৬ সালে এ.এম.এম আনোয়ার শাহ জন্মগ্রহণ করেন।

এ ক্ষণজন্মা পুরুষটি তাঁর মাতা-পিতা থেকেই প্রাক প্রাথমিক ও প্রাক দ্বীনি শিক্ষার তালিম নেন। পরে রামু খিজারী বার্মিজ এটাস্ট প্রাইমারি স্কুল থেকে সেরা হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৫২ সালে দাখিল, ১৯৫৬ সালে আলিম, ১৯৫৮ সালে ফাজিল ও ১৯৬০ সালে কামিল পাশ করেন তিনি। প্রতিটি পরীক্ষায় বিস্ময়কর প্রতিভাসম্পন্ন এ.এম.এম আনোয়ার শাহ মেধা তালিকায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তিনি যখন ফাজিলের পরীক্ষার্থী তখন একই সাথে তিনি এসএসসি-পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৬০ সালে এসএসসি, ১৯৬২ সালে এইসএসসি ও ১৯৬৬ সালে চট্রগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী হাজি মোহাম্মদ মোহসীন কলেজ হতে ডিগ্রি পাশ করনে কৃতিত্বের সাথে।

আমার স্যার এ.এম.এম আনোয়ার শাহ যখন ১৯৫২ সালে দাখিলে পড়ছেন, তখন ঢাকা থেকে খবর এলো রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সেখানে ১৪৪ ভঙ্গ হয়েছে। পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিকুর শহীদ হয়েছে। তখনকার টগবগে তরুণ ছাত্র এ.এম.এম আনোয়ার শাহ সহপাঠীদের সংগঠিত করে মিছিল, মিটিং করতে থাকেন। টেলিগ্রামের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের খবর আদান প্রদান করে চলমান ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশেনা নিতে থাকেন।

১৯৬১ সালে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এ.এম.এম আনোয়ার শাহ পিতার মতো মহান শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি কক্সবাজার সহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা করেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন দেশপ্রেমের তাড়নায় এ.এম.এম আনোয়ার শাহ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন।

শিক্ষা পাগল এ.এম.এম আনোয়ার শাহ ১৯৭২ সালের জেলা সদরের সবচেয়ে প্রাচীন বিদ্যাপীঠ কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে হেড মাওলানা হিসাবে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। একটানা ২৯ বছর এ প্রতিষ্ঠানে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে এ.এম.এম আনোয়ার শাহ অবসরোত্তর ছুটিতে যান।

অবিরাম শিক্ষার আলো ছড়ানো এ মানুষটি ১৯৬৭ সালে গোলাম শরীফ মাস্টার ও হাজেরা বেগমের কন্যা শামসুন্নাহার বেগমকে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে বেচে নেন। ১৯৯৮ সালের ৮ আগস্ট শামসুন্নাহার বেগমের ইন্তেকালের পর রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেইন্দা নিবাসী বিশিষ্ট আলেম মাওলানা ইলিয়াসের কন্যা আরেফা খানমকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে বিয়ে করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে এ.এম.এম আনোয়ার শাহ ৫ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের সফল ও গর্বিত জনক। তাঁর প্রথম পুত্র আ.ম.ম জহির উদ্দিন রামু সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক। দ্বিতীয় পুত্র মাওলানা রফিক রামু উপজেলার মেরুংলোয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার সুপার। তৃতীয় পুত্র ডা.এ.জেড.এম সেলিম নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, চতুর্থ পুত্র হাফেজ দেলোয়ার সাউথ ইস্ট ব্যাংকের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পঞ্চম পুত্র এ.এম.এম তৈয়ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে চাকুরীরত। কন্যা মোতাহেরা বেগমের স্বামী বাংলাদেশ ইসলামি ব্যাংকের সদর দপ্তরে উর্ধ্বতন কর্মকতা পদে চাকুরীরত।

মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশনেয়া প্রকৃত অর্থে প্রগতিশীল মানুষ এ.এম.এম আনোয়ার শাহ শুধু নিজের সন্তানদের মানুষ করতে চেষ্টা করেননি। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি যেখানে পেরেছেন-শিক্ষা, ধর্মীয়, সামাজিক ও কল্যানকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সাহসের বাতিঘর এ.এম.এম আনোয়ার শাহ। যে প্রতিষ্ঠান গুলো এখন সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে সর্বত্র আলো চড়াচ্ছে নির। আমার স্যার এ.এম.এম আনোয়ার শাহ রামু উপজেলার গর্জনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন একই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালনা কমিটি একজন গর্বিত সদস্য। তিনি রামু উপজেলার কলঘর আবু বকর ছিদ্দিক বালিকা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চাকমারকুলের কলঘর বাজার পরিচালনা কমিটিরও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন সুচারুভাবে। কলবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বিশ্বস্ততার সাথে। রামুর পশ্চিম চাকমারকুল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মতোওয়াল্লী ছিলেন। সফল উদ্যোক্তা ও আস্থার প্রতীক এ.এম.এম আনোয়ার শাহ চাকমারকুল আবদুল্লাহপুর জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন সময়ে তিনি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। এসব প্রতিষ্ঠান সমুহ এখন মহিরুহ হয়ে প্রায় সর্বক্ষেত্রে সফল এ.এম.এম আনোয়ার শাহ নামক গুনী মানুষটিকে স্মরণ করছে অনবরত।

সজ্জন, অমায়িক ও শান্তিপ্রিয় বিশাল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সুপুরুষ এ.এম.এম আনোয়ার শাহ এলাকা ও পরিবারের সদস্যদের প্রায় সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে ৮৪ বছর বয়সে গত ৮ ফেব্রুয়ারী, ১৩ জমাদিউস সানি, ২৫ মাঘ, শনিবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। এই জান্নাতী বান্দার নামাজে জানাজা একইদিন মাগরিবের নামাজের পর পশ্চিম চাকমারকুল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মাঠে মরহুমের সুযোগ্য সন্তান ও রামু রহমানিয়া মাদ্রাসার সুপার মাওলানা রফিকের ইমামতিতে সম্পন্ন করে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। মেধাবী ও অনুসরণীয় এ.এম.এম আনোয়ার শাহ’র জানাজায় স্বল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মুসল্লীর উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও সমাজের রেখে যাওয়া তাঁর বিশাল অবদান। পরম করুনাময় আল্লাহতায়লার দরবারে এই মহান শিক্ষকের একজন নগন্য ছাত্র হিসাবে ফরিয়াদ করছি, আল্লাহ ছোবহানাহুতায়লা যেন, আমার পরম শ্রদ্ধেয় স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌসের স্থায়ী বাসিন্দা করে দেন। আমিন, চুম্মা আমিন।

 

(লেখক : সাবেক ছাত্র, কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •