ইমাম খাইর, সিবিএন:
আইনের কঠোরতা ও প্রশাসনের কড়াকড়ির মাঝেও থেমে নেই মানবপাচার। কৌশল ও ঘাট পাল্টিয়ে পাচার কাজ অব্যাহত রেখেছে দালালচক্র। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের স্বপ্ন জাগিয়ে সাগর পথে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন দেশে। দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকা পাচারকারীরা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেন্টমার্টিনের ৬ জনের একটি দালালচক্রের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে ২ জনের নাম ধরে বিস্তারিত তথ্যের অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাচারের কাজে জড়িত রয়েছে কিছু রোহিঙ্গা মাঝি। স্থানীয় চিহ্নিত দালালচক্রের মাধ্যমে ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে যায় নির্ধারিত জায়গায়। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা যুবতিদের বিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে।
এদিকে, বঙ্গোপসাগর দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ভোরে সেন্টমার্টিনের অদূরে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৫ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ১ শিশু ও ১৪ জন নারী। ৬৫ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রলারে ১২৫ জন ছিলো। তারা সবাই রোহিঙ্গা। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখনও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে ২টি হেলিকপ্টার গিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিয়ে করতে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল রোহিঙ্গা যুবতি ইছমত আরা:
বাংলাদেশে বিয়ে করতে দেড়-দু’লাখ টাকার দরকার। কিন্তু এত টাকা পাবো কোথায়। মা নেই, বাবা নেই। মালয়েশিয়াতে পরিচিত অনেকে আছে। ভেবেছিলাম, ওখানে গিয়ে তাদের কাউকে বিয়ে করে ফেলবো। কাজ নয়, বিয়ে করতেই মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম।’ ট্রলারডুবি থেকে বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা নারী ইছমত আরা এমনটাই বলল।
টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ট্রলারে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিল ইছমত আরা। কিন্তু সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের কাছে পৌঁছালে তাদের ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ১৫ জনের প্রাণহানি হলেও তিনি বেঁচে যান। সৌকতসহ ৬৫ জনকে উদ্ধার করে নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা সেন্টমার্টিন জেটিতে নিয়ে আসেন। তবে, অনেক রোহিঙ্গা তরুনীর বিয়ে ক্যাম্পে থাকতেই সম্পন্ন হয়। পরে সুবিধা মতো সময়ে দালালদের হাত ধরে তাদের স্বামীর নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া হয়।
উদ্ধারপ্রাপ্তদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এস এম জাহিদুল ইসলাম জানান, ট্রলারটিতে থাকা অধিকাংশ মানুষই টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা। এরা সবাই দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল, বলেন লে. কমান্ডার ইসলাম। তিনি আরো জানান, নিমজ্জিত ট্রলারটির ভেতরে আরো মানুষ থেকে থাকতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
লে. কমান্ডার ইসলাম বলেন, স্থানীয়দের ফোন পেয়ে তিনি নৌবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পেট্রোল বোটে করে সেখানে যান। গিয়ে তিনি দেখেন, একটি দেশীয় ট্রলার আধা নিমজ্জিত অবস্থায় আছে। বহু মানুষ ট্রলারটি ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। আর আশপাশে মৃতদেহ ভাসছে। বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার খবর প্রায়ই আসে। এভাবে সাগরপাড়ি দিতে গিয়ে বহু নৌকাডুবির ঘটনা ও বহু হতাহতের ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার বহু চেষ্টা নস্যাৎ করেছে, বহু রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পেও ফিরিয়ে এনেছে, যাদের মধ্যে বরাবরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশুর উপস্থিতি ছিল।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জাহিদুল ইসলাম বলছেন, জীবিত উদ্ধারপ্রাপ্তদের তারা কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে নিয়ে যান। তারা এদের সাথে কথা বলে দুজন দালালের তথ্যও পেয়েছেন। তাদেরকে খোঁজা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এ নিয়েও তদন্ত চলছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ট্রলারটি ডুবে যায়। অবৈধভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ৬৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রলারে শতাধিক যাত্রী ছিল। এখনও সাগরে ভাসমান লাশ দেখা যাচ্ছে। উদ্ধার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘সাগর পথে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতর সংখ্যা বাড়তে পারে। উদ্ধার কাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি জানান, এখনও অর্ধশতাধিকের বেশি লোক নিখোঁজ রয়েছে।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রলার ডুবির ঘটনা শুনেছি। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
উদ্ধার করা কয়েকজন রোহিঙ্গা জানিয়েছে, দালালদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির থেকে বের হয়ে তারা মালয়েশিয়া যাচ্ছিলো। সোমবার রাতে টেকনাফ উপকূল দিয়ে দুটি ট্রলার রওনা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে সাগরের পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। এতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •