এম.মনছুর আলম, চকরিয়া
এ অনিদ্য সুন্দর পৃথিবীতে কারো বেঁচে নেই বাবা, আর কারো নেই মা, আবার কারো বাবা-মাকে ছেঁড়ে অন্যের সাথে সংসার পেতেছে। অভাবী সংসারে সেই হতভাগী মায়ের ক্ষমতাও নেই, সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবে। লেখাপড়ার খরচ যোগাবে। বড় হয়ে যাতে সন্তান নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। লেখাপড়া চালানো দুরের কথা, সংসারে ছোট্ট ছোট্ট শিশু সন্তানদের মুখে দুমোটে খাবার তুলে দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন অনেকের পরিবার। অগত্য এসব পরিবারের অনাথ শিশুদের ঠাই এখন পার্বত্য জেলা বান্দরবনের লামার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা এলাকায় গড়ে তোলা জীনামেজু অনাথ আশ্রমে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুগের পর যুগ শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর ও অবহেলিত রয়েছে পাহাড়ি জনপদের বিভিন্ন এলাকা। বিষয়টি মাথা নিয়ে ১৯৯৪ সালে এ আশ্রমটি ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের বনফুল ত্রিশ ডেবা এলাকায় প্রবাদ প্রতিম মহাপুরুষ জীনামেজু (ভান্তে) ভিক্ষুর অক্লান্ত পরিশ্রমে বান্দরবনের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা এলাকায় গড়ে তোলা হয় আশ্রমটি। সেই থেকে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনপদের বিশাল জনগোষ্ঠীর গরিব, অনাথ ও মেধাবী শিক্ষার্থীর মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতে চলছে জীনামেজু অনাথ আশ্রমটি। বর্তমানে আশ্রমটি বান্দরবান জেলায় শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে।
জীনামেজু অনাথ আশ্রমের অধ্যক্ষ উ নন্দমালা থের বলেন, প্রতিষ্ঠাতা জীনামেজু ভিক্ষু অনেক সাধনা ও কাঠখড় পুড়িয়ে চকরিয়া-লামা-আলিকদম সড়কের পাশে ইয়াংছার কুমারিতে পাহাড় চূড়ায় মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেন। প্রথমে সরকার থেকে কিছু জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে ১৯৯৪ সালে আশ্রটি যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণতা লাভ করে ১৯৯৯ সালে।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনাথ আশ্রমে শতাধিক গরিব ও অনাথ শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীরা পাশের ইয়াংছা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ইয়াংছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও লামা মাতামুহুরী কলেজে পড়ছেন। বর্তমানে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও সমাজসেবা বিভাগের তরফে সরকারিভাবে অনুদান পাওয়া যায় অর্ধেক শিক্ষার্থীর জন্য। এছাড়াও বান্দরবান জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন শুভাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুদানে চলে এ প্রতিষ্ঠানটি ।
তবে সরকারি বেসরকারী উদ্যোগের সহযোগিতা অনাথ আশ্রমের প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপ্রতুল। তারপরও প্রাপ্ত অনুদানে চলছে শিক্ষার্থীদের ৩ বেলা খাবার, কাপড়-চোপড়, বই, খাতা, শিক্ষা উপকরণ ঔষধ, প্রাইভেট শিক্ষদের বেতন ইত্যাদি। এভাবে আশ্রমটি চালাতে অনেক কষ্ট সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জীনামেজু অনাথ আশ্রমের অধ্যক্ষ উ নন্দমালা থের বলেন, আশ্রমের দ্বিতল যে মূল ভবনটি রয়েছে তা অনুদান হিসাবে দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে বীর বাহাদুর এমপি। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে ৪ কক্ষ বিশিষ্ট অনাথ আশ্রমের একটি ছাত্রাবাস। এটি উদ্বোধন করেন পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি। এদিন অনুষ্ঠানে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা, জেলা প্রশাসক মোঃ দাউদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জেরিন আখতারসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড়ের ওপর বিশাল জায়গায় প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে আশ্রমটি অবস্থিত। বিকাল বেলায় দেখা গেছে, আশ্রমের ভেতর ৮-১০ জন করে শিক্ষার্থী দল বেঁধে বেঞ্চে বসে পড়ছে। দুইজন প্রাইভেট শিক্ষক তাদের পড়াচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর। প্রত্যেকের জন্য রুমে রুমে রয়েছে আলাদা কাঠ ও বাঁশের সংমিশ্রণে চৌকি।
অনাথ আশ্রমের এক শিশু শিক্ষার্থী জানান, এখানে এসেছি মা-বাবাকে হারিয়ে। তবে আশ্রমের সেবা ও ভালো শিক্ষা পেয়ে আমি খুশি। অতীতের সব দুঃখ ভুলে গেছি। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা হোস্টেল ব্যবস্থা। আলাদা রান্না ঘর ও ডাইনিং হলও রয়েছে। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা জীনামিজু ভিক্ষু বলেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে আশ্রমে প্রার্থনা হল, মেডিটেশন সেন্টার, বুদ্ধিষ্ট মিউজিয়াম হল, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারসহ লাইব্রেরি। আশাকরি অনাথ শিশুদের কল্যাণে সবাই পাশে থাকবে। এগিয়ে আসবে।

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •