দিনুর আলম

আজকাল মহাত্মা হুমায়ুন আজাদকে বেশ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বললে ঠিক নিজেকে শান্ত করতে পারছিনা, বলতে হয় আমার উপর ভর করেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি বেঁচে থাকলে আমরা আরও বেশি ক্ষুরধার লেখনী পেতাম।এমন কিছু শব্দবোমা পেতাম যে শব্দবোমা নষ্টদের নষ্ট চিন্তাকে ধুলায় উড়িয়ে দিত। কিন্তু নষ্টদের মূলোৎপাটন হতোনা, যেমনটি হয়নি তাঁর আমলেও। সমাজ যুগ যুগ ধরে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দু ধরণের শাষক দ্বারা শাসিত হয়, উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্ট। বঙ্গ দেশের সমাজ বাস্তবতায় আমরা প্রথম ধাঁচের শাসক পেয়েছি কেবল হাতেগোনা।
কথায় আছে সারবস্তু হামেশা ঊন হয়।

” সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।”

কবির ভবিষ্যদ্বাণী বিফলে যায়নি বরং অবিকল ফলেছে। নষ্টদের অধিকার থেকে কিছুই রেহায় পায়নি।
আর আমরা? আমজনতা, কি করেছি আমরা? কি করেছি সেই সওয়ালের জবাব হচ্ছে আমাদের কী করার ই ছিল বা আছে?
সমালোচনা,প্রতিবাদ, বিপ্লব, উৎকৃষ্ট শাসক নির্বাচন? কোন মহৎ কর্মটি করে উতরে দেওয়ার সুযোগ আছে আমাদের?
উত্তরঃ- এক মিনিট ভাবুন
(নিজ থেকে পেয়ে যাবেন আশা করি।)

একটি উদীয়মান রাষ্ট্রের সবকিছু যখন নষ্ট রাজনীতিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তুলে দেওয়া হয় দেশী-বিদেশী বেনিয়া,ফড়িয়া, মুনাফালোভীদের হাতে, যখন একটি রাষ্ট্রের জাতীয় অর্থনীতির চাকা ঘুরায় কতিপয় ব্যবসায়ী গ্রুপ তখন সে রাষ্ট্রের অর্থনীতি কেবল কতিপয়তন্ত্রের পকেটে ঘুরপাক খায়।

যখন একটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় গদীতে বসে এবং দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে তখন সে রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার কবর না হয়ে পারেনা।
সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের গবেষণা পত্র ৯৮ ভাগ কেনো ১০০ ভাগ নকল হওয়া যুক্তিসংগত।
সে সব প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক কর্মীদের কোমরে যুদ্ধাস্ত্র থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়, সে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ পুকুরে কি সাগরে পড়াও বেমানান নয়।

একটি রাষ্ট্রের শিল্পকলা যখন তথাকথিত শিক্ষিত নষ্ট রাজনীতিকের হাতের মুঠোয় চলে যায় সে দেশে উগ্রবাদী চেতনা লালিত হওয়ার পথ সুগম হয়। শিল্পকলা তো আর নিয়ত বাহাস করার বিষয় নয়।

একটি রাষ্ট্রের ক্রীড়াজগৎ যখন নষ্ট রাজনীতিকের অধীনে পরিচালিত হয় তখন সে রাষ্ট্রের উঠতি প্রজন্ম মাদক সেবনে উৎসাহী হওয়া অদ্ভুত কিছু নয়।

একটি রাষ্ট্রের কবি ও লেখকরা যখন তাদের লিখায় ক্ষমতাবানদের স্তুতি গেয়ে ক্রমাগত লিখে যায় তখন সে রাষ্ট্রে সাহিত্য বলতে অপসাহিত্য রচিত হয়।
আগেকার যুগের কবিরা মহাকাব্য লিখার শুরুতে বিদ্যাদেবীর আরাধনা কামনা করতো আর এ যুগে ক্ষমতাবানের নিলর্জ্জ প্রশংসা করতে হয়। ওসব কবিদের লিখিত বইয়ের পৃষ্ঠায় কালো অক্ষরের বদলে নর্দমার কিট কিলবিল করতে দেখে সুবোধ পাঠক

এভাবে খেলার মাঠ থেকে আরম্ভ করে শিক্ষা, শিল্প -সাহিত্য, সভ্যতা সবকিছু ধ্বংস করে আপনারা বলেন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবেন
অথচ মাদকের ঢেরা পরিচালনা করছে ক্ষমতাবানেরা।

শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে আপনারা দেশে ধর্ষণ কমানোর জন্য পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার লাইসেন্স চান অথচ মানবিক শিক্ষা সুপরিকল্পিত ভাবে নির্বাসিত। শিক্ষা হচ্ছে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম এই মন্ত্র সুচতুরভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের মগজে। মানবিক শিক্ষায় আয় নাই, ভাত নাই। শিক্ষা হতে হবে যুগোপযোগী, বৃত্তিমূলক, আর? ফ্রিল্যান্সিং করে অধিক আয় করা যায় । সুতরাং ওই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একজন মানবিক মানুষ গড়ার বদলে একজন বৈষয়িকমনা মানুষ গড়ছে।
আর ফলাফল? সেটা দৃষ্টিবানরা তো দেখছে এছাড়া জন্মান্ধরাও আঁচ করতে পারছে বৈকি।

একটি রাষ্ট্রের জনগণ যখন প্রতিনিয়ত মিথ্যে প্রতিশ্রুতি পায়, যখন রাজনীতিকেরা বেদবাক্যের মতো মিথ্যের ফুলঝুরি ছড়ায় তখন সে রাষ্ট্রের জনগণ ওই নষ্ট রাজনীতিকদের আর বিশ্বাস করতে পারেনা।

“সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবো কোথা?”
আপনি ব্যথা কমানোর ওষুধ খোঁজবেন ভালো কথা তার আগে ব্যথা সৃষ্টির কারন খোঁজে বের করুন। নাহয় সীমাহীন ব্যথায় প্রাণ বিয়োগ হতে সময় লাগবেনা।
কোনো রাষ্ট্রের আমজনতা দেশের সম্পদ কুক্ষিগত রেখেছে এমনটা এই অধমের জানা নেই। সচক্ষে যা পর্যবেক্ষণ করেছি তা হচ্ছে দেশের অগণিত নদী ভরাট করে জমি বানিয়েছে ক্ষমতাবানেরা, কাবিখা’র টাকা মেরে খেয়েছে ক্ষমতাবানেরা, ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করেছে ক্ষমতাবানেরা, বিদেশে সেকেন্ড হোম বানিয়েছে ক্ষমতাবানেরা। আর আমজনতা? কেবল পেয়েছে অপবাদ।

যখন বাপ দাদার ভিটেমাটি দখল দিতে হয় বেনিয়াতন্ত্রকে, যখন কৃষকের চাষের জমিটিতে কতিপয়তন্ত্রের ভোগ বিলাসের দালান উঠে, যখন রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধাবিত হয় কতিপয় গ্রুপের ক্যাশবাক্সে, যখন ঘরের ছেলে চিরতরে আর ঘরে ফিরেনা, যখন বিচারালয়ের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে হয়রান হয় মিছে মামলার আসামী তখন সে রাষ্ট্রের জনগণ বিষণ্ণ হলেও ক্ষমতাবানরা গোস্সা হয়।
এতকিছুর পরও “রাজার হস্তে কাঙালের ধন চুরি না বলে “মহারাজার হাতে ভিখিরির ধন ডাকাতি” বললে কতিপয়তন্ত্র, নষ্ট রাজনীতিকেরা কি গোস্সার বদলে প্রতিশোধ নিতে তেড়ে আসবেন? হ্যাঁ সে তো এসেছে বহুবার, আসবেই।

আপনারাই বলুন এভাবে সবকিছু নষ্ট করার পর আপনাদের প্রতি বিশ্বাস কিভাবে অটুট রাখবে আমজনতা? বন্যা কবলিত জনপদের তীরবর্তী মানুষ সাগরকে আর কতক্ষণ বা বিশ্বাস করতে পারে?

কবি বলেছিলেন ” পাকিস্তানিদের আমি অবিশ্বাস করি যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে তখনও।”

কিন্তু আপনারা কি কখনও গোলাপ নিয়ে আসবেন? আমার মনে হয় না। আপনারা আসবেন বড় বড় সেতু নিয়ে, ব্রান্ডের পানীয় নিয়ে, আপনারা আসবেন আমার চাষের জমিটি নিয়ে সেখানে ভদ্র নোকের জন্য দালান নিয়ে, আপনারা আসবেন হ্যামিলনের বাঁশি নিয়ে আমার আগামির প্রজন্মকে নষ্টের সাগরে ডুবানোর জন্য। আমি/ আমরা কি আপনাদের আর বিশ্বাস করতে পারবো?
আমি ক্ষমতাবানদের, নষ্ট রাজনীতিকের দৃষ্টির বাইরের মানুষ, আমার লেখনী এখনো এত ক্ষুরধার হয়নি যে তাদের গলাকাটা যাবে।
তারপরও আমার এই লিখা যদি আপনাদের পীড়া দেয়, আপনাদের নষ্টামির খোলস সরিয়ে দেয় তাহলে আমাকে ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারেন। আপনাদের ওই সার্কাসে আমার বিচার করতে পারেন। আমাকে দয়া করে দিতে পারেন পাত্রভরা হেমলক। দ্বিধাহীন চিত্তে পান করে পেয়ালা খালি করবো, চলে যাবো নষ্টদের সংসার ছেড়ে। আর নাম লিখাবো
জ্ঞানের পিতার শিষ্যের সারিতে।

লেখক : দিনুর আলম ,বিএসএস অনার্স, এমএসএস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)।

শিক্ষার্থী ,কক্সবাজার আইন কলেজ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •