মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার জেলা পুলিশের ব্যবস্থাপনায় সোমবার ৩ ফেব্রুয়ারী বিকেল ৩ টায় টেকনাফ সরকারি কলেজ মাঠে ২১ জন ইয়াবাকারবারী, মাস্টার হুন্ডি-বিকাশ কারবারি প্রচুর অস্ত্র ও ইয়াবা নিয়ে আত্মসমর্পণ করছে। বিশ্বস্ত সুত্র সিবিএন-কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সুত্রমতে, অনুষ্ঠানে টেকনাফ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের এর উদ্যোগে ২০২০ সালের জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে আইজিপি ব্যাজ প্রাপ্ত পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম, বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (সেবা) পদক প্রাপ্ত কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম (বার), আইজিপি ব্যাজ প্রাপ্ত কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোঃ ইকবাল হোসাইন, মহেশখালী থানার ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধর ও টেকনাফ মডেল থানার এএসআই সনজিব দত্তকে সম্মাননা প্রদান করা হবে।

দ্বিতীয় দফায় ইয়াবাকারবারীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল, স্টেজ, লাইটিং, নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরীর কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ভিভিআইপি, আমন্ত্রিত অতিথি সহ প্রায় ৫ শ’ মানুষ অনায়সে সেখানে বসার মতো করে প্যান্ডেলটি নির্মাণ করা হয়েছে। আগত অতিথিদের নিরাপত্তা, অভ্যর্থনা, প্রটোকল, ইয়াবাকারবারীদের জমায়েত, তাদের ইয়াবা, অস্ত্র, গোলাবারুদ জমা করা, যাতায়াত সুবিধা, পার্কিং, প্যান্ডেল, মঞ্চ তৈরি, নিরাপত্তা বেষ্টনী, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান ইত্যাদি সার্বিক বিষয় মাথায় রেখে রেকি ও ম্যাপ মতো সবকিছু পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানস্থল ইতিমধ্যে পরিদর্শন করেছেন।

একইসাথে মধ্যস্থতাকারীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসা ২১ জন ইয়াবাকারবারী ও মাস্টার হুন্ডি-বিকাশ ব্যবাসায়ী ইয়াবা ও অস্ত্র সহ সোমবার আত্মসমর্পণের পর কারাগারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কক্সবাজার শহরের পুলিশ লাইনের আশেপাশের এলাকায় মধ্যস্থতাকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ২১ জন ইয়াবাকারবারীকে সোমবার ৩ ফেব্রুয়ারী সকালেই সড়কপথে টেকনাফ নিয়ে যাওয়া হবে। আত্মসমর্পণ করতে মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসার সংখ্যা আপাতত ২১ জন হলেও সোমবার সকাল পর্যন্ত আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকায় এ সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না বলে মন্তব্য করেছেন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের শৃংখলার প্রয়োজনে সোমবার সকালের পরে আর কোন আত্মসমর্পণকারী মধ্যস্থতাকারীর নিয়ন্ত্রণে আনা হবেনা বলে সিবিএন-কে সুত্রটি জানিয়েছেন।

অপর একটি সুত্র সিবিএন-কে জানান, ২০১৯ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারী আত্মসমর্পণকৃত ১০২ জন ইয়াবাকারবারী আত্মসমর্পণের শর্ত মতে সরকারের কাছ কোন অনুকম্পা না পাওয়ায় অনেকে প্রস্তুতি থাকা সত্বেও আত্মসমর্পণ করতে এবার অনীহা প্রকাশ করছে। তবে, মধ্যস্থতাকারীর হেফাজতে আসা ২১ জন আত্মসমর্পণকারীর প্রোফাইল ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগ, পুলিশ সদর দপ্তর, চট্টগ্রাম ডিআইজি’র কার্যালয় সহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে বলে সুত্রটি সিবিএন-কে নিশ্চিত করেছেন।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ আয়োজিত এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের শিরোনাম দেওয়া কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম (বার) অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমান, কমিউনিটি পুলিশিং এর কক্সবাজার জেলা সভাপতি, সিনিয়র সাংবাদিক এডভোকেট তোফায়েল আহমদ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন।

অনুষ্ঠানে যোগদিতে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম রোববার ৩ ফেব্রুয়ারী সকালে কক্সবাজার পৌঁছাবেন বলে সুত্রটি সিবিএন-কে জানিয়েছেন।

আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদেরকে প্রনোদনা দেওয়া হতে পারে বলে একটি সুত্রটি সিবিএন-কে জানিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণের পর মাদক ও অস্ত্র আইনে টেকনাফ মডেল থানায় পৃথক ২ টি জিআর মামলা দায়ের করে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে একইদিন সন্ধ্যায় কারাগারে পাঠানো হবে। তবে এ মামলা থেকে আত্মসমর্পণকারীরা সহজে মুক্তি পেতে মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষ আত্মসমর্পণকারীদের সহযোগিতা করবে।

এর আগে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফের শীর্ষ ১০২ ইয়াবাকারবারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি ও পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো। তাদের মধ্যে কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চার ভাইও ছিল। এটি হবে টেকনাফে ইয়াবাকারবারীদের ২য় দফায় আত্মসমর্পণ। সেবারের মাদক কারবারী আত্মসমর্পণ করা ছিলো এ দেশের জন্য একটা ইতিহাস ও রেকর্ড। এই ১০২ ইয়াবাকরবারীর মধ্যে একজন কারাগারে মারা যায়। বাকি ১০১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযুক্তপত্র (চার্জশীট) দাখিল করে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশ।

সুত্র মতে, ইয়াবাকারবারিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হলেও মাদক বিরোধী নিয়মিত অভিযানে কোনও শিথিলতা আসবে না। বরং আরো তীব্রতর করা হবে। আত্মসমর্পণের আওতায় না এসে ইয়াবাকারবারিরা কৌশলে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ইয়াবাকারবারি, ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৫৬ জন রোহিঙ্গাসহ ২০৯ জন ইয়াবাকারবারি ও ডাকাত-সন্ত্রাসী নিহত হয় কক্সবাজার জেলায়। পাশাপাশি গত বছর ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৭০ পিস ইয়াবাসহ ২ হাজার ৩৩৮ জনকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে ২০১৯ সালের মতো ২০২০ সালেও জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম (বার) দ্বিতীয় বারের মতো বিপিএম (সেবা) পদক পেয়েছেন। সর্বোচ্চ অস্ত্র ও মাদক দ্রব্য উদ্ধারকারী জেলা হিসাবেও পেয়েছেন ২ টি আইজিপি পদক ও সম্মাননা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •