নিজস্ব প্রতিবেদক:

সম্প্রতি মহেশখালী পৌরসভার সংঘটিত আলোচিত শাহরিয়ার মোঃ শামসুদ্দীন হত্যাকান্ড নিয়ে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। আপন ভাই ও তাদের স্ত্রীরা সংঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শাহরিয়ার মোঃ শামসুদ্দীনকে দিনদুপুরে হত্যা করেছিলো। মায়ের সম্পত্তি রক্ষা করতে প্রতিবাদ করায় তাকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। ওই হামলার ঘটনায় তার মা বৃদ্ধা দিলদার বেগমও (৬৫) মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলে -এমন অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে নিজের নাড়িছেঁড়া কনিষ্ঠ পুত্রকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছে শাহরিয়ার মোঃ শামসুদ্দীনের অসহায় মা দিলদার বেগম। তিনি পুত্রশোকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত কান্নার সাগরে ভেসে চলেছেন। তার আহাজারিতে এখনো ভারি হয়ে আছে পরিবেশ। বুকের ধনের হত্যাকারীদের নিজের অন্য চার ছেলেসহ জড়িত অন্যান্যদের দৃৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেই তিনি শান্ত হবে বলে জানালেন বৃদ্ধা দিলদার বেগম। না হলে তিনি তিনি মরেও শান্তি পাবেন না বলে বিলাপ করে করে এই প্রতিবেদককে জানান।
বৃদ্ধা দিলদার বেগম জানান, তার স্বামী ২০০৯ সালে মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার আগে সম্পতি ভাগবাটোয়ার ব্যাপারে অসিয়ত করে যান। ভিটা ছাড়া বাকি সব সম্পত্তিতে মেয়েদেরও আইনত ভাগের অংশ দেয়া জন্য বলে যান। কিন্তু সে মতো ভাগবাটোয়ারা মানেনি শামসুদ্দিন ছাড়া বাকি চার ভাই। তাদের ইচ্ছা মতো ভিটাসহ সব সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা হয়। সে মতে পাঁচ ভাই, তিনবোন এবং মা দিলদার বেগম ভিটার অংশ পান। কিন্তু অবস্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে অবিবাহিত ছোট ছেলে শামসুদ্দিন এবং মাকে ঠকায় অন্যরা। তারপরও শান্তি বজায় রাখার জন্য তা মেনে নেয় মা ও শামসুদ্দিন। এর মধ্যে নিজের চিকিৎসা এবং হজে¦ যাওয়ার জন্য ভিটার নিজের অংশ বিক্রির উদ্যোগ নেয় মা দিলদার বেগম। এই জন্য তিনি ছেলেদের ভিটাটি কিনতে বলেন। ছেলেরা কিনলে তিনি দামেও ছাড় দেবেন বলে জানান। কিন্তু অনৈতিক উদ্দেশ্য তারা কিনতে চায়নি। বাধ্য হয়ে মা তার অংশ ভিটার বাইরে বিক্রি করতে চায়। এই নিয়ে ক্ষেপে যায় বড় চার ছেলে। এর মধ্যে বড় ছেলে জসিম উদ্দীন ও তার স্ত্রী আজিজুন্নাহারের ইন্ধনে মহিউদ্দীন সাগর, মঈন উদ্দীন মামুন, জিয়া উদ্দীন ভুইয়া মিলে শামসুদ্দিনকে হত্যা করে গত ২০ জানুয়ারি। বাইরের আরো কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই হত্যা ইন্ধন জুগিয়েছে- এমন অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য মতে, ছেলেরা ভিটা না কিনতে বাইরের লোকদেরও বাধা দেয়। এক পর্যায়ে মায়ের ভিটায় যাওয়ার পথ দখল তৃতীয় ছেলে মঈন উদ্দীন মামুন। তিনি মায়ের পথ দখল করে দেয়াল নির্মাণ করার চেষ্টা করে। এতে বাধা দেন মা দিলদার বেগম। ঘটনার দিন (২০ জানুয়ারি) এই নিয়ে মাকে হামলার করে ছেলে ও তাদের স্ত্রীরা। এক পর্যায়ে তারা মায়ের ঘরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বাড়ি বের হলে মাকে বেলছা দিয়ে আঘাত মাটিতে ফেলে দেয়। মাকে বাঁচাতে তখন বাড়িতে থেকে বের হয় শামসুদ্দিন। তিনি বের হওয়ার সাথে সাথেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাই ও তাদের স্ত্রীরা। তারা ছুরি, রড, লাঠি মারাত্মকভাবে আঘাত করে শামসুদ্দিনকে। এতে গুরুতর জখম হয়ে ১০ মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি।

দিলদার বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার বড় চার ছেলের কেউ আমাকে খবর রাখেনি। ছোটছেলে শামসুদ্দিন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে পাওয়া সামান্য আয় দিয়ে আমার খাবার ও চিকিৎসা চালিয়ে আসছিলো। শামসুদ্দিনকেও কোনোদিন আদর যত্ন বা কোনো কিছু দেয়নি তারা। উল্টো অন্য তারা (চার ছেলে) আমার সম্পত্তি ভোগ দখল করার অপচেষ্টা করেছে। আমাকে এবং আমার ভিটা রক্ষা করতে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছোট ছেলে শামসুদ্দিনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা। মৃত্যুর আগেও বিভিন্ন সময় বড় ছেলে জসিমের স্ত্রীর তার বাপের বাড়ির আত্মীয়-স্বজন দিয়ে বিভিন্ন সময় শাহরিয়ার মোঃ শামসুদ্দিনকে হুমকি দিতো।

তিনি আরো বলেন, আমার পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছে। আমার পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। আমার বেঁচে থাকা আর কোনো অবলম্বন রইল না। এখন বাকি জীবনটা হয়তো না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় পার করতে হবে। আপন ভাই হয়ে তারা যেভাবে আমার সন্তানকে হত্যা করেছে তা ক্ষমার যোগ্য না। আমি তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবো না। শুধু তাই নয়; আমি তাদের কঠিন শাস্তি চাই। আমি জীবিত অবস্থায় তাদের বিচারটা দেখে যেতে চাই। না হয় মরেও আমার আত্মা শান্তি পাবে না।
থানা সূত্রে জানা গেছে, শাহরিয়ার মোঃ শামসুদ্দিন হত্যার ঘটনায় মহিউদ্দীন সাগর, মঈন উদ্দীন ও জিয়া উদ্দীনকে আটক করা হয়েছে। মামলা কার্যক্রম চলছে।

মামলা বাদি মা দিলদার বেগম বলেন, সালিশকারদের গাফিলতির কারণে আমার ছেলে মরতে হয়েছে। তারা নিজেরা নিরপেক্ষ বিচার করলে অঘটন ঘটতো না। আর এখন মামলা এবং সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রভাবশালী একটি মহলা বাধা সৃষ্টির করছে। আমি পুলিশের কাছে আহ্বান করছি বাকি আসামীদের গ্রেফতার করে সবাইকে রিমান্ডে নেয়া হোক। সবার কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

এলাকার লোকজন জানান, শামসুদ্দিন ছিলেন একজন সহজ-সরল, ভদ্র, নম্র ছেলে। সেখানে এলকার বিধর্মীসহ সব স্তরের লোকজনকে তাকে খুব ভালো বাসতো। তার মৃত্যু পুরো এলাকার মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেছে। বিধর্মীরা পর্যন্ত তার জন্য অঝোর কান্না করেছে। শামসুদ্দিন হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন এলাকাবাসীও।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •