শাহীন মাহমুদ রাসেল:
কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ও আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার দেড় শত একর ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়। ভাটার আগুনে পুড়ছে কৃষি জমির প্রাণ। কমে যাচ্ছে চাষাবাদযোগ্য জমি।

নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসা করে আসছে। ফলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাক্টর বা ট্রলি দিয়ে ভাটায় মাটি নেয়ায় নষ্ট হচ্ছে গ্রামীন কাঁচা-পাকা সড়ক। এতে জনগণসহ স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একাধিক জমির মালিক অভিযোগ করে বলেন, ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি। সে মাটি অবাধে কেটে নেয়া হচ্ছে ফসলি জমি থেকে। জোয়ারিয়ানালা মৌলভী পাড়ার শাহ আলম, সওদাগর পাড়ার জসিম, রামুর মনজুর ও আব্দুল্লাহ কোম্পানিসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ফসলি কৃষি জমির মাটি জোরপূর্বক কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে।।

এই স্বার্থান্বেষী চক্র কৃষি জমির মালিকদের আর্থিক সুবিধার টোপ দিয়ে ভুল বুঝিয়ে অনুমোদন ছাড়াই এসব মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। স্থায়ী ক্ষতির কথা না জেনে সহজ সরল কৃষকেরা নগদ লাভের আশায় জমির মাটি বিক্রি করছেন। ফলে শত শত বিঘা কৃষি জমি উর্বরতা হারিয়ে জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে। পরিবেশের উপর পড়ছে বিরুপ প্রভাব। এ সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু মাটি ব্যবসায়ী মোটা অংকের মুনাফা অর্জন করছে।

তারা আরও অভিযোগ করে জানান, স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিভিন্ন এলাকার ফসলি কৃষি জমির মাটি কিছু জমির মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করে ও কিছু জমি ক্রয় না করে জোরপূর্বক কেটে নিয়ে এই মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছে। প্রতিদিনই ফসলি জমির মাটি প্রায় ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত গর্ত করে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যে জমির মাটি এত গর্ত করে কাটছে এর ফলে পাশের জমির মাটি এমনিতেই ভেঙে সেই গর্তে পড়ে যাচ্ছে। তাই পার্শ্ববর্তী জমির মালিকরা তাদের জমির মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনভাবে ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী জমিও অনাবাদি হয়ে পড়ছে। এসব উর্বরা জমিতে পেয়াজ, রসুুন, ধনিয়া, আলু, বেগুন, সবজি, ভুট্টা, মরিচ, ধান ও পাটসহ সব ধরনের ফসল ফলানো যায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, জোয়ারিয়ানালার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে বিকেএসপির অপরপাশে ফসলি জমির টপসয়েল কেটে শত শত ট্রাক ও ট্রলিতে ভর্তি করা হচ্ছে। দিনে দুপুরে মাটি কাটার মহোৎসব চললেও যেন দেখার কেউ নেই।

দিন-রাত ট্রাক্টর, ট্রলি ও ট্রাক দিয়ে মাটি বহনের কারণে গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়কগুলো ডেবে ও ভেঙ্গে যাচ্ছে। এছাড়া এসব মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে পাকা ও কাঁচা রাস্তাগুলো কেটে নষ্ট করা হচ্ছে। ফলে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সরকারি লাখ লাখ টাকায় নির্মিত রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট।

জানা যায়, উপজেলায় ২০ থেকে ২৫ টি ইটভাটা রয়েছে। চালুর অপেক্ষায় আছে আরো কয়েকটি। প্রতিটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে ফসলি জমি ও জনবহুল এলাকায়। নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব বৈধ-অবৈধ ইটভাটার মালিকেরা একের পর এক ফসলি জমির প্রাণ ধ্বংস করছে। তাছাড়া ইটভাটার নির্গত কালো ধোঁয়ায় আশপাশের গাছপালা, ফসলাদি নষ্ট ও বিভিন্ন রোগবালাইসহ পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাক চালক বলেন, মৌলভী পাড়ার শাহ আলম, রামুর মনজুর আলম, আব্দুল্লাহ কোম্পানি ও সওদাগর পাড়ার জসিম আমাদেরকে এখানে কাজে এনেছেন। ঊনাদের কথা মতো মাটি কাটছি।

একই গ্রামের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জমির মালিক বলেন, ওই চকে দু’বছর আগে ১৬ ফুট গভীর করে ২ বিঘা জমির মাটি দশ লাখ টাকায বিক্রি করেছেন। এছাড়া ফসলি জমির ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত উপরিভাগের মাটি বিঘা প্রতি ৪০-৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাটি ক্রয় সিন্ডিকেটটা সুযোগ বুঝে অনেক সময় চুক্তির বাইরে ও বেশি করে মাটি কেটে নিচ্ছে।

মাটি ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, জমির মালিকেরা নিজের জমি থেকে ইটভাটায় মাটি বিক্রি করছেন। তবে এই ব্যবসা আমার না আব্দুল্লাহ কোম্পানির। আমি তাদের কাজ দেখাশুনা করতেছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবু মাসুদ সিদ্দিকী বলেন, ফসলি জমি থেকে টপসয়েল কেটে নেয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি। এ উপজেলায় অল্প সময়ের ব্যবধানে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে।

এব্যপারে রামু উপজেলার ইউএনও প্রণয় চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মিটিং আছেন জানিয়ে এসিল্যান্ডের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে এসিল্যান্ড (ভূমি) চাই থোয়াইহলা চৌধুরী বলেন, আমাদের কাছে মাটি অপসারণের জন্য একটি আবেদন দিয়েছে তারা। যদি মাটি অপসরণের কথা বলে যদি ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে নেওয়া হয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •