মুহাম্মদ আতিকুল ইসলাম

সাংবাদিকতাকে আমরা একটা আধুনিক পেশা হিসেবেই মূল্যায়ন করি: যা প্রধানত ইহজাগতিকতা নিয়েই বৃত্তায়িত হয়,নেই কোন তার পারলৌকিক সংশ্লিষ্টতা। কিন্তু সবাইকে অবাক করার বিষয় হলো, এই সাংবাদিকতার মূল রচিয়তা হলেন আমাদের ধর্ম বিধাতা।সাংবাদিকতা, শুধুমাত্র ইহলৌকিক পেশা নয়,এটা ধর্মীয় পেশাও। তাই শুধু খ্যাতি অর্জন ও টাকা কামাইয়ের পেশা নয়,বরং এটা পরকালের চিরস্থায়ী উচ্চ মাকাম জান্নাতুল ফেরদাঊস লাভেরও মাধ্যম যদি হয় আপনার কলম নৈতিকতা ও মানবতার পক্ষে: অতএব এটা ঐশী পুরস্কার লাভের পেশা কারণ এটা নবীদের ও পেশা।

পবিত্র কোরআনে ত্রিশ পারার প্রথম সুরার নাম হলো “সূরাতুন নাবা” আর আরবিতে সংবাদকে বলা হয়’ নাবা’ সুতরাং সূরাতুন নাবা’ বা সংবাদের সূরা। এ শব্দ থেকেই এসেছে ‘নবী, যার মানে হলো সংবাদ বাহক বা ‘সংবাদদাতা’ আর’সংবাদদাতা’ তাদেরকেই বলে যারা সাংবাদিকতা করেন। আল্লাহ পাক মানুষের মধ্যে থেকে যোগ্যতা সম্পন্ন লোকদেরকেই নির্বাচন করেছিলেন সংবাদদাতা হবার জন্য এবং এদের নাম দিয়েছেন নবী বা রাসুল।রাসুল শব্দটার সাথে ও সংবাদ বহনের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।মহান আল্লাহর প্রেরিত নবী -রাসুলরা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োজিত মূখপাত্র ও সংবাদদাতা। সংবাদ দেয়া ও সংবাদ প্রচার করা তাদের পেশা ছিলো না। এটা তাদের নেশা ও মিশন। আধুনিক যুগের সাংবাদিকরা হয়ত বেতন -ভাতার বিনিময়ে (তা দুষের নয়) বা খ্যাতি অর্জনের জন্য সাংবাদিকতাকে করেন।কিন্তু মহান আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা কারো কাছ থেকে,খ্যাতি বা টাকার জন্য এই পেশায় আসেন নি।বেতন -খ্যাতি দূরের কথা তা কামনাও করেন নি।নবীরা কাউকে কিছু খাওয়ালে তখন বলতেন :- “আমরা তো আপনাদেরকে খাওয়াই মহান আল্লাহ কে খুশি করার জন্য। আপনাদের কাছ থেকে এর জন্য কোন প্রতিদান বা ধন্যবাদ ও আশা করি না “(সূরা ইনসান:৯)তবে নবীদের সাংবাদিকতার বিষয়, ধরন ও পদ্ধতি ছিলো আলাদা।সেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংবাদ ছিলো।কিন্তু সবই ছিলো সত্য,নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য। সেই সংবাদগুলো পরিবেশনার ছিলো গভীর মর্ম ও উদ্দেশ্য। তার ভাষা ও ব্যঞ্জনা ছিলো ইতিবাচক ও গঠনমূলক। তাদের সংবাদে ছিলো নতুনত্ত্ব, বৈচিত্র ও ভারসাম্য। তা ছিলো জীবনের একেবারে বাস্তব ও নিটুট চিত্র। পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা: যে সংবাদ আমাদের কাছে এনেছেন তা গভীর ও নিরপেক্ষ মন নিয়ে পড়লে দেখা যাবে যে,সেখানে এই দুনিয়ার সকল বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।তবে তা অত্যান্ত পরিচ্ছন্ন ও পরিপক্ব। আজকের সংবাদপত্রের পাতায় কোন প্রেমের কাহিনী পড়ে দেখুন আর সূরা ইউসুফের প্রেমের গল্প পড়ে দেখুন।বিস্ময়করভাবে,মহান আল্লাহ সেখানে এমনভাবে যৌনতার বিবরণ দিয়েছেন যে ঘটনার মূল আবেদন একেবারেই চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছে,কোন প্রকার প্রকাশ্য নগ্নতার আচড় ছাড়াই।

এসব কিছু বিবেচনা করে আধুনিক যুগের ইসলামী স্কলার সাংবাদিকতা ও মিডিয়ায় কাজ করাকে ফরজ বলে অভিহিত করেছেন।বুখারী শরীফে রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন:- যে “আমার কাছ থেকে একটা কথা শিখলেও তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দাও”।সাংবাদিকতা ও মিড়িয়া হলো সে দায়িত্ব পালন করার অন্যতম মাধ্যম। যদি ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে লেখালেখির তেমন প্রচলন ছিলো না,তবুও রাসুলুল্লাহ সা:কলম ও জিহবার যুদ্ধকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন।তিনি তাঁর সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদেরকে সাহিত্যের মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরকে অন্যদের কাছে তুলে ধরার উৎসাহ দিয়েছেন।

যেহেতু সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা, তাই এই পেশায় নিয়োজিতদের অশেষ সাওয়াব লাভের সুযোগ আছে। লেখকের কলমের একটু খোচায় যদি কেউ আলোর সন্ধান পান, তাহলে লেখকও সেই আলোর জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন।
এই পেশা নবীদের পেশা। তবে, তা যদি হয়:-
১. বিশ্বচরাচরের মালিক ও পালনকর্তা মহান আল্লাহর একত্ববাদের স্বপক্ষে।
২.নৈতিকতা ও মানবতার পক্ষে।
৩.সত্য ও তথ্যের সাথে নিখুঁত।
৪.ইনসাফ, সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তিতে।
৫.পেশাগত দক্ষতায় ভরপুর
৬.দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে
মনে রাখতে হবে,দায়িত্বশীল ও সৎ সাংবাদিকতা সমাজকে সংশোধন করে ও উন্নত করে। কিন্তু এই পেশা যদি মিথ্যা ও বানোয়াট বার মাসের গল্প বা ভন্ডামিতে আক্রান্ত হয় তাহলে তা সমাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সৎ সাংবাদিকতা করে জান্নাতে যাওয়া যেমন সহজ,অসৎ সাংবাদিকতা করে জাহান্নামে যাওয়া আরো সহজ -যদি আমাদের সাংবাদিক সমাজ তা অনুধাবন করতেন!!!

 

লেখক:- গবেষক,সেক্রেটারি : পেকুয়া উপজেলা আল-কোরআন ফাউন্ডেশন:-প্রধান পরিচালক,মারকাজুল উম্মাহ মাদরাসা,পেকুয়া, কক্সবাজার ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •