ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিখ্যাত কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর, মৎস্য বন্দর এবং পর্যটন কেন্দ্র। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার সদর দপ্তর। এই কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দযের্যর জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত, যা ১২২ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস থেকে জানা যায় নবম শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে ১৬১৬ সালে মুঘল অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত কক্সবাজার-সহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ী রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং এখানেই ক্যাম্প স্থাপনের আদেশ দেন। তার যাত্রাবহরের প্রায় একহাজার পালঙ্কী কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামের স্থানে অবস্থান নেয়। ডুলহাজারা অর্থ হাজার পালঙ্কী। মুঘলদের পরে ত্রিপুরা এবং আরকান তার পর পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই কক্সবাজারের প্রাচীন নাম পালংকী। একসময় এটি প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। প্যানোয়া শব্দটির অর্থ হলুদ ফুল। অতীতে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকাগুলো এই হলুদ ফুলে ঝকমক করত। ইংরেজ অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এখানে একটি বাজার স্থাপন করেন। আর এই কক্স সাহেবের বাজার থেকে কক্সবাজার নামের উৎপত্তি। বর্তমানে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি দেশের সর্ব-দক্ষিণের জেলা শহর। বিশ্বের এই দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ। মেরিন ড্রাইভ ধরে ভ্রমণ যেন হার মানিয়ে দেয় যেকোনো ভিডিও গেমকে। কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগর ও পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার সড়কটি। এরই পাশে গড়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ক্যাম্প; কুতুপালং। এই রোহিঙ্গা সংকটকে বলা হচ্ছে এই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো মানবিক সংকট। এরকম নানা কারণে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবন্ধ হয়েছে কক্সবাজারে। এছাড়াও এখানে রয়েছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনসহ প্রধান ৭টি দ্বীপ। আর সাগর-পাহাড় কেন্দ্রীক নানা আয়োজন। বিশেষ করে সার্ফিং, প্যারাসাইলিং, স্কুভা ডাইভিং এর মতো অ্যাডভ্যাঞ্জার একেবারেই ভিন্নতর। বর্তমানে কক্সবাজারের জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লক্ষাধিক। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৯৫০ জন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী-কক্সবাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১টি, মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১টি, স্নাতকোত্তর কলেজ ২ টি, কামিল মাদ্রাসা ৪ টি, ডিগ্রি কলেজ ১১টি, ফাজিল মাদ্রাসা ১২ টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ১৯ টি, আলিম মাদ্রাসা ১৯টি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ১টি। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৪০ টি, দাখিল মাদ্রাসা ১০৪ টি, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫২টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭০১টি। জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেখলেই সহজে বুঝা যায়, জনসংখ্যার তুলনায় উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নগণ্য। এই এলাকার শিক্ষার্থীদেরকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি জমাতে হয় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই কক্সবাজার বাংলাদেশের জন্য আল­াহর এক বিশেষ নিয়ামত। এই কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের অনেক মেগা পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে মেগা পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশের অনেক প্রকল্প দৃশ্যমান। একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামও রয়েছে এই জেলায়। বিদ্যমান আকাশপথের পাশাপাশি শীঘ্রই চালু হচ্ছে মিটারগেজ রেলপথ। রপ্তানিযোগ্য হোয়াইট গোল্ড খ্যাত চিংড়ি, লবণ, সামুদ্রিক মাছ, মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ, শামুক, রাবার বাগান, বনজ সম্পদ ইত্যাদিতে ভরপুর অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময়। কিন্তু এই কক্সবাজার শহরে এতকিছু থাকার পরও এইখানে নেই একটি সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়। যা বাস্তব সত্য কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান নায়ক বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল প্রত্যেক জেলা শহরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। সেই লক্ষে তিনি কাজও করে গেছেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা পেয়েছিলাম। বাঙালির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি অবশ্যই সে কারণে। তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন, নতুন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণ করতে চাইলেন চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা আশ্রয় করে। ‘সোনার বাংলা’ গড়ার মানসে একসঙ্গে শুর“ করলেন একাধিক সুদূরপ্রসারী কর্মযজ্ঞ। অবিশ্বাস্য রকম স্বল্প সময়ে সম্পন্নও করলেন সেসব। এক বছরের কম সময়ে রচিত ও অনুমোদিত হলো দেশের সংবিধান, দুই বছরের মধ্যে প্রকাশিত হলো অর্থনৈতিক পথনির্দেশক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট। শিক্ষা একটি জাতি গঠনের প্রধান উপাদান। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিতে এবং পারে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে। সেদিক থেকে পরিসংখ্যান দেখলে সাম্প্রতিক কালে আমাদের এগিয়ে থাকারই কথা, কেননা বিগত প্রায় ১০ বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পাসের হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সহজেই প্রতীয়মান হয় জাতি হিসেবে আমরা শিক্ষিত হচ্ছি। কিন্তু এই জেলা শহরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় এই এলাকার জনগণ যেমন হতাশ, তেমনি আশাহত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষে দীর্ঘ দিন ধরে এই নিয়ে অনেক দাবী দাওয়া উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন মহলে এই নিয়ে দেন দরবারও কম হয়নি। সর্বশেষ এই এলাকার কিছু ছাত্র সমাজ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় একমত স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সর্বস্তরের প্রতিনিধিরা। গত ১৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মহান সংসদে দাঁড়িয়ে কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী তোলেন কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জাফর আলম। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাষনের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবী উত্থাপন করেন। এছাড়াও কক্সবাজার- ৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের নেতৃত্বে ঈদগাহ নেতাদের স্বাক্ষাতকালে মাননীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল কক্সবাজার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট। এরই প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার শহরে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্র“তি দেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মহিবুল হাসান নওফেলকে দায়িত্ব দেন। এই উদ্যোগ কক্সবাজারবাসীর জন্য বিরাট মাইলফলক এবং কক্সবাজারবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় হলো সমাজের আরোগ্য নিকেতন। আর সমাজে ছড়িয়ে পড়া অসংগতিগুলো এবং উচ্চ শিক্ষার প্রতিবন্ধকতর প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা রাখতে একটি বিমুর্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়াও সভ্যতার একটি বড় দায়িত্ব পালনে ব্যক্তির বিকাশের পথ মসৃন করে। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষার জন আকাঙ্খা পূর্ণ করে। কেননা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাবে আমাদের উচ্চ শিক্ষা লাভ নানান কারণে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বর্তমানে আমাদের কক্সবাজার এই বন্ধ্যাত্ব গুছানোর পথে। আমি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী গ্রামের সন্তান হিসেবে আজ গর্বিত। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মুজিব বর্ষে আমাদের কক্সবাজার জেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমার ও কক্সবাজারবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাই এবং আশারাখি অচিরেই বাস্তবায়িত হবে কক্সবাজারবাসীর স্বপ্নের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। মুজিব বর্ষে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট এবং কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •